Ajker Patrika

বাছুরের চামড়া থেকে আভিজাত্যের প্রতীক, কঙ্গনার ব্যাগের নেপথ্য বাস্তবতা

ফিচার ডেস্ক 
বাছুরের চামড়া থেকে আভিজাত্যের প্রতীক, কঙ্গনার ব্যাগের নেপথ্য বাস্তবতা
সব মিলিয়ে কঙ্গনা রানাউতের পার্লামেন্ট লুকের আনুমানিক মূল্য ৫৬ লাখ রুপি। এর মধ্যে সবচেয়ে দামি জিনিস তাঁর হাতের ‘হার্মেস টোগো লেদার বার্কিন ব্যাগ’। যার দাম প্রায় ৩৫ লাখ রুপি। ছবি: সংগৃহীত

পার্লামেন্টে ছাতা মাথায় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন কঙ্গনা রনৌত। এক হাতে হাতে রোলেক্সের ঘড়ি ও বার্কিন ব্যাগ, অন্য হাতে ভারত মহাসাগরের সংস্কৃত নাম ‘রত্নাকর’ থেকে অনুপ্রাণিত নকশায় ‘গুড আর্থ’-এর একটি প্রিন্টের ছাতা। পরনে হালকা মনিপুরভিত্তিক ব্র্যান্ড এনইউপিআইয়ের তৈরি বেবি-ব্লু অ্যারি সিল্ক শাড়ি। না, কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়। বাস্তব জীবনে এভাবেই পার্লামেন্টে ঢুকতে গিয়ে ক্যামেরাবন্দী হয়েছেন ভারতীয় এই অভিনেত্রী। বলা হচ্ছে, সব মিলিয়ে এই পার্লামেন্ট লুকের আনুমানিক মূল্য ৫৬ লাখ রুপি। কঙ্গনা রানাউতের ব্যবহৃত সামগ্রীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দামি জিনিস হলো তাঁর হাতের ‘হার্মেস টোগো লেদার বার্কিন ব্যাগ’। যার দাম প্রায় ৩৫ লাখ রুপি।

বিমানে তৈরি হয়েছিল প্রথম নকশা

হার্মেস বার্কিন দীর্ঘদিন ধরে বিলাসবহুল হ্যান্ডব্যাগ সংগ্রাহকদের কাছে আভিজাত্যের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ অভিনেত্রী জেন বার্কিনের নামানুসারে তৈরি করা হয় এই ব্যাগ। ব্যাগটির নকশার সূচনা হয়েছিল ১৯৮৪ সালে প্যারিস থেকে লন্ডনগামী একটি ফ্লাইটে। হার্মেসের সিইও জ্যঁ-লুই দ্যুমার সঙ্গে সেখানে জেন বার্কিনের এক আকস্মিক সাক্ষাৎ হয়েছিল। জেন বার্কিন তখন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তিনি এমন কোনো হ্যান্ডব্যাগ খুঁজে পাচ্ছেন না, যা একই সঙ্গে ব্যবহারিক এবং মার্জিত। তখনই দ্যুমা একটি খসড়া স্কেচ আঁকেন। এটাই পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত বিলাসবহুল নকশায় পরিণত হয়। ১৯৮৫ সালে জেন বার্কিনের হাতে তুলে দেওয়া সেই প্রথম বার্কিন ব্যাগ এমন একটি ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যা চার দশকের বেশি সময় ধরে লাক্সারি সংগ্রহের পরিভাষাকে সংজ্ঞায়িত করে চলেছে।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে জেন বার্কিনের মূল ’অরিজিনাল বার্কিন’ ব্যাগটি ১০.১ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। ছবি: সোদেবিস
২০২৫ সালের জুলাই মাসে জেন বার্কিনের মূল ’অরিজিনাল বার্কিন’ ব্যাগটি ১০.১ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। ছবি: সোদেবিস

বার্কিন কেন সেরা

সূক্ষ্ম কারুকার্য, সীমিত উৎপাদন এবং চিরন্তন চাহিদার কারণে সেকেন্ডারি বা রিসেল বাজারে বার্কিন নিজস্ব এক অনন্য স্থান দখল করে নিয়েছে। তবে বিশেষ কিছু বার্কিন ব্যাগ নিয়মিতই তাদের মূল খুচরা মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়। সাধারণ লেদারের ক্ল্যাসিক বার্কিনগুলোর এখনো ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে বাজারের সর্বোচ্চ দাম সংরক্ষিত থাকে শুধু সেই সব ব্যাগের জন্য, যেগুলো অসাধারণ বিরলতা, বিরল উপকরণ, লিমিটেড-এডিশন নকশা কিংবা ঐতিহাসিক পটভূমির কারণে অনন্য। ২০২১ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে সংগ্রাহকদের অব্যাহত চাহিদার প্রতিফলনে ‘সোদেবিস’ ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের হার্মেস বার্কিন ব্যাগ বিক্রি করেছে। এই চাহিদা ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এক অভূতপূর্ব মাইলফলকে পৌঁছায়, যখন জেন বার্কিনের মূল ‘অরিজিনাল বার্কিন’ ব্যাগটি ১০ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। এটি নিলামের ইতিহাসে যেকোনো হ্যান্ডব্যাগের জন্য সর্বোচ্চ মূল্যের বিশ্ব রেকর্ড গড়ে এবং সেকেন্ডারি বাজারে একটি হ্যান্ডব্যাগ কতটা মূল্য পেতে পারে, তার ধারণাই বদলে দেয়। জেন বার্কিনের ঐতিহাসিক প্রোটোটাইপ এবং তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার করা ব্যাগ থেকে শুরু করে ডায়মন্ড হিমালয়া, ফোবার্গ এবং অন্যান্য অসাধারণ সৃষ্টির মাধ্যমে আজকের সবচেয়ে মূল্যবান বার্কিনগুলো প্রমাণ করে যে বিরলতা নানা রূপে আসতে পারে।

টোগো লেদার এক ধরনের প্রিমিয়াম এবং গ্রেইন্ড কাফস্কিন অর্থাৎ বাছুরের চামড়া। ছবি: সংগৃহীত
টোগো লেদার এক ধরনের প্রিমিয়াম এবং গ্রেইন্ড কাফস্কিন অর্থাৎ বাছুরের চামড়া। ছবি: সংগৃহীত

হার্মেস টোগো লেদার বার্কিন ব্যাগ

বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল ও জনপ্রিয় হাতব্যাগ হার্মেস টোগো লেদার বার্কিন; যা দেখা গেছে কঙ্গনা রনৌতের হাতে। অর্থাৎ হার্মেসের এই ব্যাগ টোগো লেদারের তৈরি। জানেন, কোথা থেকে আসে এই টোগো লেদার? এটি একধরনের প্রিমিয়াম এবং গ্রেইন্ড কাফস্কিন অর্থাৎ বাছুরের চামড়া। হার্মেসের ব্যাগ তৈরিতে এটি বহুল ব্যবহৃত ও জনপ্রিয়। টি মূলত জার্মানির বিখ্যাত ট্যানারি ‘ওয়াইনহাইমার লেডারে’ তৈরি। এর উপরিভাগে ছোট ছোট দানাদার টেক্সচার থাকে, যা সাধারণ আঁচড় বা দাগ আড়াল করতে সাহায্য করে। এর চামড়ায় প্রাকৃতিক কিছু রেখা বা দাগ থাকে, যা প্রতিটি টোগো লেদারের সামগ্রীকে অনন্য ও মৌলিক রূপ দেয়। এতে সহজে আঁচড় পড়ে না এবং দাগ ধরে না। হালকা বৃষ্টি বা পানিতে সহজে নষ্ট হয় না। তাই হয়তো কঙ্গনা এটিকে বেছে নিয়েছেন পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনে যাত্রাসঙ্গী হিসেবে। আবার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর টেক্সচার আরও সুন্দর ও নরম রূপ নেয়। এমনকি ব্যাগটির খুব বেশি রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনও হয় না।

নির্মমতা থেকে বিলাসিতা

সবচেয়ে নরম ও মূল্যবান ‘কাফস্কিন’ আসে সদ্যোজাত বা মাতৃগর্ভে থাকা বাছুরের থেকে। এটা অত্যন্ত নির্মম। কিন্তু অনেকে পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা এড়াতে ভেজিটেরিয়ান খাবার পছন্দ করলেও অনায়াসে চামড়ার পণ্য ব্যবহার করেন। যদিও লাক্সারি ব্র্যান্ডগুলো প্রায়ই দাবি করে যে তারা গোমাংস শিল্পের বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত হিসেবে সংগৃহীত চামড়া ব্যবহার করে, যাতে অপচয় কমানো যায়। তবে প্রাণী অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলোর মতে, অতি উচ্চমানের কাফস্কিনের জন্য বাছুরের আলাদা চাহিদা তৈরি হয়, যা এই শিল্পকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান রাখে। এ কারণেই বর্তমানে অনেক পরিবেশবাদী ও ভেগান ফ্যাশন-সচেতন মানুষ প্রাকৃতিক চামড়ার বদলে উদ্ভিজ্জ বা বিকল্প চামড়া ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। যেমন মাশরুম, আনারসের পাতা বা ক্যাকটাস দিয়ে তৈরি ভেগান লেদার। তবে ঐতিহ্যবাহী বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো এখনো স্থায়িত্ব ও প্রিমিয়াম ফিনিশিংয়ের অজুহাতে আসল টোগো বা কাফস্কিন লেদার ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সোদেবিস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত