Ajker Patrika

রান্নার সেরা সম্মান মিশেলিন স্টার যেভাবে এল

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
রান্নার সেরা সম্মান মিশেলিন স্টার যেভাবে এল
টায়ার বিক্রির কৌশল হিসেবে জন্ম নেওয়া একটি সাধারণ গাইডবই শতবর্ষ পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে অভিজাত রান্নার চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়ে উঠেছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি কোলাজ

খাবারের দুনিয়ায় একটা শব্দ সব সময় ঘুরেফিরে আসে। সেটি হলো মিশেলিন স্টার। রন্ধনশিল্পে ‘মিশেলিন স্টার’ পাওয়া মানে অস্কার পাওয়া। কিন্তু এই রাজকীয় আভিজাত্যের পেছনের কাহিনি জানলে যে কেউ হেসে ফেলবেন। আবার একে ঘিরে আছে রহস্যময় কিছু বিষয়, যা শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সবার কাছে রহস্যঘেরা। কিন্তু সব মিলিয়ে মিশেলিন স্টার পাওয়া রেস্তোরাঁ ও শেফদের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের বিষয়। জনপ্রিয় টিভি সিরিজ এমিলি ইন প্যারিস, দ্য বিয়ার কিংবা দ্য মেনুতে রেস্তোরাঁর এই কঠিন স্টার অর্জনের দৌড় দেখেছেন অনেকে। কিন্তু বাস্তব জীবন আরও রহস্যে ঘেরা। ১৯০০ সালে মিশেলিন টায়ার কোম্পানির ড্রাইভারদের জন্য তৈরি সাধারণ গাইডবুক থেকে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থার পরিদর্শক বা ইন্সপেক্টর কারা, তা সব সময় গোপন রাখা হয়। শেফদের না জানিয়েই সাধারণ গ্রাহকের ছদ্মবেশে তাঁরা খাবার খেয়ে মূল্যায়ন করেন।

কীভাবে এল মিশেলিন স্টার

ক্লেরমঁ-ফেরঁ শহরটি আজও মিশেলিনের প্রধান সদর দপ্তর হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ছবি: সংগৃহীত
ক্লেরমঁ-ফেরঁ শহরটি আজও মিশেলিনের প্রধান সদর দপ্তর হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ছবি: সংগৃহীত

এর ইতিহাস একেবারেই হাঁড়িপাতিল কিংবা রান্নাঘর থেকে আসেনি। এসেছে গাড়ির টায়ার বিক্রি করা এক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। ১৮৮৯ সালে আন্দ্রে এবং এদুয়ার মিশেলিন তাঁদের পরিবারের ডুবতে বসা ব্যবসাকে বাঁচাতে এই প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন। তবে মিশেলিন স্টারের গল্পটা ১৯০০ সালের। দুই ফরাসি ভাই ভাবলেন, কীভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের গাড়ির টায়ার বেশি বিক্রি করা যায়? বুদ্ধি বের হলো, মানুষকে বেশি বেশি গাড়ি চালিয়ে দূরে পাঠাতে হবে। এর কারণেই চাকা ক্ষয় হবে। আর তখনই তাঁরা চালকদের জন্য রাস্তাঘাট, গ্যাস স্টেশন আর হোটেলের তালিকা বানিয়ে তৈরি করে ফেলেন একটি ফ্রি গাইড বই। টায়ার কোম্পানিটি মূলত চেয়েছিল মানুষ বেশি করে গাড়ি চালিয়ে রাবার ক্ষয় করুক। কিন্তু আজ সেই কোম্পানির গাইড থেকে একটা স্টার পাওয়ার জন্য দুনিয়ার সেরা শেফদের হাত পুড়িয়ে চোখে পানি এনে নাকানিচুবানি খেতে হয়।

গাইডবুক থেকে বিশ্বসেরা স্টারের যাত্রা

১৯০০ সালে মিশেলিন টায়ার কোম্পানির ড্রাইভারদের জন্য তৈরি সাধারণ গাইডবুক। ছবি: সংগৃহীত
১৯০০ সালে মিশেলিন টায়ার কোম্পানির ড্রাইভারদের জন্য তৈরি সাধারণ গাইডবুক। ছবি: সংগৃহীত

বইটিতে দূরবর্তী সেরা রেস্তোরাঁগুলোর তালিকা এমনভাবে দেওয়া হতো, যাতে চালকেরা চমৎকার খাবারের খোঁজে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন। এই বিপণন কৌশলই ১৯২৬ সালে মিশেলিন স্টার রেটিং সিস্টেমে রূপ নেয়। ক্লেরমঁ-ফেরঁ শহরটি আজও মিশেলিনের সদর দপ্তর হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শহরের পরিকাঠামো, বিশেষ করে বিশ শতকের শুরুতে শ্রমিকদের জন্য তৈরি সিটিজ মিশেলিন বা ছোট বাড়িগুলো আজও প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে। ২০০৯ সালে এখানে এল অ্যাডভেঞ্চার মিশেলিন নামক একটি ইন্টারেকটিভ মিউজিয়াম চালু হয়। সেখানে টায়ার কোম্পানি থেকে শুরু করে ফাইন-ডাইনিংয়ের শীর্ষে পৌঁছানোর এই অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্প তুলে ধরে। রাস্তার ধুলোমাখা টায়ার বিক্রির কৌশল হিসেবে জন্ম নেওয়া একটি সাধারণ গাইডবুক এভাবেই শতবর্ষ পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে অভিজাত রান্নার চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়ে ওঠে।

শিল্পায়নের যুগে মিশেলিনের এই ইতিহাস তারই এক অনবদ্য রূপকথা।

কারা রায় দেন, তা থাকে অজানা

মিশেলিন টায়ার কোম্পানির ড্রাইভারদের জন্য তৈরি সাধারণ গাইডবুক থেকে শুরু হওয়া এই ব্যবস্থার পরিদর্শক বা ইন্সপেক্টর কারা, তা সব সময় গোপন রাখা হয়। শেফদের না জানিয়েই সাধারণ গ্রাহকের ছদ্মবেশে তাঁরা খাবার খেয়ে মূল্যায়ন করেন। অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে ছদ্মবেশী পরিদর্শকেরা বছরজুড়ে বিভিন্ন ঋতু ও সময়ে রেস্তোরাঁ পরিদর্শন করেন। এরপর সর্বসম্মতিক্রমে স্টার দেন। ১ স্টার মানে চমৎকার খাবার, ২ স্টার মানে অনন্য ব্যক্তিত্ব ও অনুপ্রেরণাদায়ী স্বাদ এবং ৩ স্টার হলো রন্ধনশিল্পের সর্বোচ্চ শিল্পকর্ম। এগুলো ছাড়াও সাশ্রয়ী মূল্যে দারুণ ও মানসম্মত খাবারের জন্য দেওয়া হয় বিব গুরমাঁ পুরস্কার। আর স্টার না পেলেও ভালো খাবারের জন্য গাইডে অন্তর্ভুক্ত করা হয় কিছু রেস্তোরাঁকে।

একসময় মিশেলিন স্টারের জন্য সাদা টেবিল ক্লথ, মৃদু ক্ল্যাসিক্যাল গান বা আভিজাত্যের বাঁধাধরা ‘কোড’ মানা বাধ্যতামূলক থাকলেও এখন এই ধারায় সেগুলো মানার বাধ্যবাধকতা নেই। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস
একসময় মিশেলিন স্টারের জন্য সাদা টেবিল ক্লথ, মৃদু ক্ল্যাসিক্যাল গান বা আভিজাত্যের বাঁধাধরা ‘কোড’ মানা বাধ্যতামূলক থাকলেও এখন এই ধারায় সেগুলো মানার বাধ্যবাধকতা নেই। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

একসময় মিশেলিন স্টারের জন্য সাদা টেবিল ক্লথ, মৃদু ক্ল্যাসিক্যাল গান বা আভিজাত্যের বাঁধাধরা ‘কোড’ মানা বাধ্যতামূলক বলে মনে করা হতো। কিন্তু আধুনিক সময়ে এই ধারায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ২১ বছর বয়সে কনিষ্ঠ ফরাসি শেফ হিসেবে মিশেলিন স্টার পাওয়া জুলিয়া সেদেফদজিয়ান কিংবা মাত্র ৩২ বছর বয়সের শেফ ম্যাক্সিম বুতিয়ের; উভয় তরুণ শেফই প্রমাণ করেছেন, আভিজাত্যের চেয়ে খাবারের স্বাদ ও কৌশলেই এখন আসল মনোযোগ। কারণ, রেস্তোরাঁতে টেবিল ক্লথ ছাড়া, ক্যাজুয়াল ড্রেস কোড ও আশির দশকের র‍্যাপ মিউজিক বাজিয়েও খোলার এক বছরের মাথায় স্টার অর্জন করেছে, এমন ঘটনাও বাস্তব।

থাকে তীব্র মানসিক চাপ

১৯৩৩ সালে ইতিহাসের প্রথম শেফ হিসেবে ইউজেনি ব্রাজিয়ার একই সঙ্গে দুটি রেস্তোরাঁয় ৬টি মিশেলিন স্টার পেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন। পল বোরেজের মতো কিংবদন্তি শেফদের গুরু হওয়া সত্ত্বেও প্রথাগত শিক্ষা না থাকা, প্যারিসের বাইরে থাকা এবং প্রচারবিমুখতার কারণে বিশ্বজুড়ে তিনি কিছুটা আড়ালেই থেকে যান। তাই এই আলো ঝলমলে সম্মানের পেছনে রয়েছে চরম মানসিক চাপ ও আত্মত্যাগ। দিনে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনে নানান ছাড় দিতে হয় শেফদের। আর স্টার পাওয়ার পর গ্রাহকদের প্রত্যাশার চাপও বেড়ে যায় বহুগুণ। শুধু স্টার পাওয়ার আনন্দই নয়, তা হারানোর ভয়ও শেফদের তাড়া করে বেড়ায়। ২০০৩ সালে ৩ স্টার শেফ বার্নার্ড লোইসোর আত্মহত্যা কিংবা ২০১৯ সালে স্টার হারানোর পর শেফ মার্ক ভেইরাতের গাইড থেকে নাম তুলে নেওয়ার দাবি প্রমাণ করে এই চাপের তীব্রতা। তবে বাস্তবতা এই যে কোথায় গাড়ি চালাবেন, তা দেখানোর গাইড থেকে শুরু হওয়া একটি ধারণাই আজ বিশ্বজুড়ে সেরা রন্ধনশিল্পের চূড়ান্ত মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি, মিশেলিন গাইড, ট্রাভেল+লিজার

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত