Ajker Patrika

ঘরে ভেসে বেড়াক সুগন্ধের রূপকথা

নাহিন আশরাফ 
ঘরে ভেসে বেড়াক সুগন্ধের রূপকথা

ঘরে ঢুকতেই যদি নাকে আসে বেলি ফুলের মিষ্টি সুবাস, কোথাও ধূপের পরিচিত গন্ধ, আবার কোথাও ভেসে আসে ল্যাভেন্ডার কিংবা ভ্যানিলার নরম ঘ্রাণ; তাহলে সেই ঘর শুধু দেখা নয়, অনুভব করা যায়। ঘরের সাজ যেমন মানুষের রুচির পরিচয় দেয়, তেমনি ঘরের গন্ধও তৈরি করে আলাদা এক আবহ। তবে ঘর সুগন্ধিময় করে তোলার এই অভ্যাস নতুন নয়। সুগন্ধের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। সময়ের সঙ্গে শুধু বদলেছে তার উপকরণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি।

ধূপের ধোঁয়ায় শুরু

প্রাচীনকাল থেকে মানুষ ঘরের পরিবেশ সুগন্ধময় করতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে আসছে। গাছের ছাল, কাঠ, রজন, ফুল, পাতা ও সুগন্ধি তেল ছিল সেই সময়ের অন্যতম উপকরণ। বিভিন্ন সভ্যতায় ধর্মীয় ও সামাজিক আচারেও ধূপজাতীয় উপাদানের ব্যবহার দেখা যায়। সুগন্ধি ধোঁয়া অনেক সংস্কৃতিতে পবিত্রতা, শান্তি ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। পূজা-পার্বণ কিংবা বিশেষ কোনো আয়োজনে ধুনার ধোঁয়া মুহূর্তেই বদলে দেয় ঘরের আবহ। ধূপকাঠির ধোঁয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেকের শৈশবের স্মৃতি, উৎসবের দিন কিংবা বাড়ির কোনো বিশেষ আয়োজনের অনুভূতি।

ফুলেই প্রাকৃতিক সুবাস

ঘর সুগন্ধি রাখার সহজ উপায়গুলোর একটি হলো ফুল। বেলি, জুঁই, রজনীগন্ধা, গোলাপ কিংবা গাঁদা—প্রতিটি ফুলের রয়েছে নিজস্ব সুবাস ও সৌন্দর্য। একটি সুন্দর ফুলদানিতে কয়েকটি তাজা ফুল রাখলেই ঘরের চেহারার পাশাপাশি বদলে যেতে পারে তার পরিবেশও। বাঙালি ঘরে ফুলের ব্যবহার শুধু সাজসজ্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিয়ে, উৎসব, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা কোনো বিশেষ দিনের আয়োজনে ফুল ঘরের আবহ করে তোলে প্রাণবন্ত।

ব্যস্ত জীবনে এয়ার ফ্রেশনার

সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাপনও হয়েছে ব্যস্ত। প্রতিদিন ফুল কেনা কিংবা ধূপ-ধুনা জ্বালানোর সুযোগ সবার থাকে না। তখন সহজ সমাধান হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এয়ার ফ্রেশনার। একটি স্প্রেতেই দ্রুত ঘরে ছড়িয়ে দেওয়া যায় পছন্দের সুগন্ধ। ফুলের সুবাসের পাশাপাশি বাজারে যুক্ত হয় নানা ধরনের ঘ্রাণ—লেমন, অরেঞ্জ, ল্যাভেন্ডার, ভ্যানিলা, উডি কিংবা ফ্রুটি। ফলে ঘরের গন্ধও হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কেউ চান ঘরে সতেজতার অনুভূতি, কেউ আবার পছন্দ করেন উষ্ণ ও আরামদায়ক ঘ্রাণ।

রুম মিস্টে নতুন অভিজ্ঞতা

সুগন্ধির এই যাত্রায় সাম্প্রতিক সংযোজন রুম মিস্ট। ব্যবহারেও সহজ, আবার ঘরের আবহ অনুযায়ী বিভিন্ন ঘ্রাণ বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকায় এটি অনেকের পছন্দের তালিকায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে সতেজ সাইট্রাস, বিকেলে ফুলের ঘ্রাণ কিংবা রাতে ভ্যানিলা-উডির মতো উষ্ণ সুবাস—সময় ও মুড অনুযায়ী ঘরের গন্ধ বদলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। শুধু বাতাসকে সুগন্ধি করা নয়, ঘরের একটি নির্দিষ্ট অনুভূতি তৈরি করাও এখন এর উদ্দেশ্য।

গন্ধ যখন ঘরের পরিচয়

আজ ঘরের সুগন্ধি শুধু দুর্গন্ধ দূর করার উপকরণ নয়, এটি ঘর সাজানোরও একটি অংশ। আলো, পর্দা, আসবাব, রঙের পাশাপাশি ঘ্রাণও তৈরি করে ঘরের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব। কারও ঘর হয়তো সব সময় ফুলের বাগানের মতো, কারও ঘরে কাঠ ও মাটির উষ্ণতা, আবার কারও ঘরে ভেসে বেড়ায় লেমন বা সাইট্রাসের সতেজতা। অর্থাৎ ঘরের গন্ধও এখন ব্যক্তিগত রুচির প্রকাশ। ধূপ-ধুনার ধোঁয়া থেকে ফুল, ফুল থেকে ধূপকাঠি, এরপর এয়ার ফ্রেশনার হয়ে আজকের রুম মিস্ট—ঘরের সুগন্ধির এই যাত্রায় বদলেছে প্রযুক্তি, উপকরণ ও অভ্যাস।

কিন্তু মানুষের চাওয়া বদলায়নি। মানুষ আজও চায় নিজের ঘরে ঢুকলে যেন স্বস্তি অনুভব হয়, পরিচিত মনে হয়, মনটা একটু ভালো হয়ে যায়। কারণ, ঘর শুধু দেয়াল, আসবাব আর ছাদের সমষ্টি নয়। একটি ঘরের নিজস্ব গন্ধও হয়ে উঠতে পারে তার পরিচয়—যে গন্ধ দরজা পেরিয়েও মনে থেকে যায়।

সূত্র: স্টাইল কিউরেটর, গ্রো ফ্রেগন্যান্স ও অন্যান্য

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত