Ajker Patrika

ঈদে শরীরের অবস্থা বুঝে মাংস খান

পুষ্টিবিদ মো. ইকবাল হোসেন 
ঈদে শরীরের অবস্থা বুঝে মাংস খান
কম তাপে, উচ্চ চাপে, কম সময়ে রান্না করলে মাংসের পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকে। ছবি: পেক্সেলস

ঈদুল আজহায় খাবার নিয়ে আমাদের অনেক রকমের পরিকল্পনা থাকে। বাড়িতে চলে বাহারি রান্নার ধুম। ঈদ-পরবর্তী দিনগুলোতেও আমরা কোরবানির মাংসের বিভিন্ন পদের আয়োজন করে থাকি। এই সময়ে খাবারের প্রকারভেদ এবং পরিমাণ—দুটোই অনেক বেশি থাকে। তাই না চাইলেও মনের অজান্তে বেশি খেয়ে ফেলি; বিশেষ করে মাংস এবং মাংস দিয়ে তৈরি খাবারগুলো। তবে বিষয়টি মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। তাই ঈদে শরীরের অবস্থা বুঝে মাংস খেতে হবে।

আমাদের প্রত্যেকের শরীরের নির্দিষ্ট চাহিদা আছে। চাহিদার অতিরিক্ত খেলে পরবর্তী সময়ে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঈদের দিনগুলোতে মূলত মাংস বেশি খাওয়া হয়। তাই এ সময় সুস্থ থাকতে নিজের বয়স, ওজন, উচ্চতা এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে খাবার খেতে হবে।

কম তাপে, উচ্চ চাপে, কম সময়ে রান্না করলে মাংসের পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকে। সে ক্ষেত্রে খোলা পাত্রে রান্না না করে, ঢাকনাযুক্ত পাত্রে মাংস রান্না করুন।

একটি পরিবার, মানে অনেক মানুষের বসবাস। তাদের অনেকের বিভিন্ন রকমের শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। কারও হয়তো ডায়াবেটিস আছে, কারও হার্টের অসুখ তো কারও উচ্চ রক্তচাপ, ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা কিংবা কিডনির রোগ থাকতে পারে। এমন ব্যক্তিদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে ঈদে খাবার বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।

এক দিনে কতটুকু মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যকর

ধরা যাক, একজন স্বাভাবিক ওজন ও উচ্চতার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তাঁর ওজন ৭০ কেজি হলে তিনি সারা দিনে মাংসের গুণগত মানভেদে প্রায় ৩৫০ গ্রাম মাংস খেতে পারেন। তবে অন্য কোনো প্রোটিনের উৎস থাকলে মাংসের পরিমাণ কমাতে হবে। সেটা একেবারে না খেয়ে সারা দিনে কয়েকবারে কিছু শাকসবজি বা সালাদের সঙ্গে ভাগ করে খেতে হবে।

কিডনি রোগীদের জন্য মাংস কম লবণ দিয়ে রান্না করে ঝোল ছাড়া খেতে দিন। ছবি: পক্সেলেস
কিডনি রোগীদের জন্য মাংস কম লবণ দিয়ে রান্না করে ঝোল ছাড়া খেতে দিন। ছবি: পক্সেলেস

কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে

বাড়িতে কিডনি রোগী থাকলে তাঁর জন্য খাবারে ভিন্নতা আনতে হবে। কিডনি রোগীদের জন্য ফার্স্ট ক্লাস প্রোটিনের পরিমাণ কমিয়ে দিতে হয়। তাই এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি মাংস খাবেন খুবই কম পরিমাণে। লাল মাংসে সোডিয়ামের পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকে। তাই গরু ও খাসির মাংস না খেয়ে মুরগির মাংস খাওয়া ভালো। গরু-খাসির মাংস যদি এক বেলা খেতেই হয়, তাহলে সেটা কম লবণ দিয়ে রান্না করে ঝোল ছাড়া খেতে হবে। মাংস দিয়ে তৈরি অন্যান্য খাবারও পরিমাণে কম খেতে হবে। এর বাইরে ডাল ও বীজজাতীয় খাবার বা এগুলো দিয়ে তৈরি খাবার বন্ধ করে দিতে হবে।

হৃদ্‌রোগ

সুস্থ থাকতে ঈদের দিনেও খাদ্যতালিকা মেনে খেতে হবে। হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য গরু ও খাসির মাংস খাওয়া বন্ধ করতে হবে। চামড়া ছাড়া মুরগি বা হাঁসের মাংস খাওয়া যাবে। তবে গরু বা খাসির মাংসের গায়ে যে সাদা চর্বি লেগে থাকে, সেটা বাদ দিয়ে রান্না করে ঝোল ছাড়া পরিমিত মাংস খাওয়া যাবে। সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার এবং পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে।

উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল

কারও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে বা রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি থাকলেও গরু-খাসির মাংস না খাওয়া ভালো। তবে উৎসবের দিন খেতে চাইলে যেসব মাংসের গায়ে কোনো চর্বি লেগে নেই, এমন মাংস খুব অল্প পরিমাণে খেতে হবে। অথবা মাংসের গায়ের সাদা চর্বি আলাদা করে নিয়ে সেই মাংস রান্না করে ঝোল বাদ দিয়ে খেতে হবে। এতে রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি খুব কম থাকবে।

ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মিষ্টি এবং মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া নিষেধ করা হয়। সরল শর্করার পরিবর্তে জটিল শর্করা খেতে হবে এবং তৈলাক্ত ও চর্বিজাতীয় খাবার খেতে হবে পরিমাণে খুবই কম। প্রতি এক গ্রাম চর্বিতে থাকে প্রায় ৯ ক্যালরি। এতে রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই চর্বি খাওয়া যাবে না।

গরু-খাসির মাংসে চর্বির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। তাই ডায়াবেটিসের রোগীদের গরু-খাসির মাংস পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে। বেশির ভাগ ডায়াবেটিস রোগীরই উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা এবং কোলেস্টেরল বেশি থাকে। সে ক্ষেত্রে খাবার নিয়ে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।

ইউরিক অ্যাসিড

যাঁদের রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি আছে, তাঁরা গরুর মাংস খাবেন না। তবে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে পরিমিত পরিমাণে গরুর মাংস খাওয়া যাবে। শুধু গরুর মাংস নয়, ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা থাকলে কলিজা, মগজ, ভুঁড়ি, পায়া খাওয়া যাবে না।

কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়

অনেকে প্রশ্ন করেন, হার্টের রোগী বা যাঁদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা অনেক বেশি বা যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ আছে কিংবা যাঁদের কিডনির সমস্যা আছে, তাঁরা কি কোনোভাবেই ঈদের দিনে একটু কোরবানির মাংস খেতে পারবেন না? বিষয়টি খুব আবেগময়। পরিবারের লোকজনও চান, অসুস্থ মানুষেরা অন্তত এক দিন একটু মাংস খাক। সে ক্ষেত্রে কিছু শর্ত মেনে খেতে হবে—

  • মাংসের গায়ে কোনো সাদা চর্বি লেগে থাকা যাবে না।
  • ঝোল ছাড়া রান্না মাংস খেতে হবে। প্রয়োজনে টিস্যু দিয়ে মুছে বা ধুয়ে খেতে হবে।
  • পরিমাণে কম খেতে হবে।
  • মাংস দুপুরে বা তার আগে মাংস খেতে হবে, কখনোই রাতের খাবারের সঙ্গে খাওয়া যাবে না।
  • খাওয়ার পরে বিশ্রামে থাকতে হবে।
  • মাংস ছোট ছোট টুকরো করে কেটে রান্না করতে হবে।
  • রান্না করা মাংস না খেয়ে গ্রিল করে খান।
  • মাংস রান্নার সময় টমেটোর মতো পটাশিয়ামসমৃদ্ধ সবজি যোগ করুন এবং খাওয়ার সময় এক টুকরা লেবু খান। এগুলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।

ওজন কমাতে

যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁদের জন্যও গরু ও খাসির মাংস খেতে নিষেধ করা হয়। তবে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলে ওপরের শর্তগুলো মেনে পরিমিত পরিমাণে মাংস খাওয়া যাবে।

গরুর মাংসের প্রধান সমস্যা হচ্ছে সেদ্ধ হতে দেরি হওয়া, তাতে রান্নায় সময় লাগে বেশি। সে ক্ষেত্রে মাংসের সঙ্গে এক টুকরো পেঁপে বা আনারস দিতে পারেন। অথবা রান্নার কয়েক ঘণ্টা আগে মেরিনেট করে রেখে দিন, তাতে মাংস কম সময়ে সেদ্ধ হবে।

বয়স ৪৫ হলে মাংস খাওয়া কমাতে হবে। মাংসের পরিমাণ আপনার বয়স, ওজন, উচ্চতা এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে। প্রয়োজনে একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে হবে।

এক দিন বেশি খেলে কিছু হয় না

এ ধরনের ভাবনা না ভাবাই ভালো। বেশি খেলে বেশি ক্যালরি শরীরে প্রবেশ করবে। সুস্থ থাকতে সেই ক্যালরি ঝরাতে পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু সেটা করা হয় না। ফলে এক দিন বেশি না খেয়ে প্রতিদিন পরিমাণমতো খাবার খাওয়া ভালো।

লেখক: সিনিয়র পুষ্টি কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত