Ajker Patrika

বার্ধক্যের গতি কমায় রোজা—আমিরাত চিকিৎসকের দাবি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বার্ধক্যের গতি কমায় রোজা—আমিরাত চিকিৎসকের দাবি
ছবি: এএফপি

রোজা কেবল আধ্যাত্মিক অনুশীলন নয়—দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার এই পদ্ধতি শরীরের কোষ মেরামতপ্রক্রিয়া সক্রিয় করে বার্ধক্যের গতি কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক চিকিৎসক।

আমিরাতের শেখ শাখবাউত মেডিকেল সিটির ফ্যামিলি মেডিসিন কনসালট্যান্ট ও লংজিভিটি ক্লিনিকের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর রাহাত গজানফর জানিয়েছেন, রোজার ফলে শরীর হজমের কাজ থেকে বিরতি পায়, যা অভ্যন্তরীণ কোষীয় মেরামতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, কয়েক ঘণ্টা না খেলে শরীর প্রধান জ্বালানি হিসেবে চিনি ব্যবহার বন্ধ করে সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার শুরু করে। এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, এতে শরীরের ভেতরের মেরামতপ্রক্রিয়া সক্রিয় হয়।

গজানফর এই প্রক্রিয়াকে কোষের একধরনের ‘স্প্রিং ক্লিনিং’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অটোফেজি (Autophagy)। এতে পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ অপসারিত হয় এবং প্রদাহ কমে। এ সময় শরীর বৃদ্ধি নয়, বরং মেরামতকে অগ্রাধিকার দেয়। তাঁর মতে, এই ধারা দীর্ঘমেয়াদে জৈবিক বার্ধক্য ধীর করার সঙ্গে সম্পর্কিত।

বার্ধক্য মানে শুধু চেহারা নয়

লংজিভিটি চিকিৎসায় ‘অ্যান্টি-এজিং’ মানে কেবল তারুণ্যদীপ্ত চেহারা নয়। চিকিৎসকেরা ভেতরের সূচকগুলো পর্যবেক্ষণ করেন—যেমন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরলের ভারসাম্য, প্রদাহের মাত্রা, পেশিশক্তি, অস্থির স্বাস্থ্য, হৃদ্‌যন্ত্রের সক্ষমতা ও হরমোনের ভারসাম্য।

গজানফর বলেন, ‘এসব সূচক আমাদের বলে দেয় শরীর ভেতরে ভেতরে কত দ্রুত বা ধীরে বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে। লংজিভিটির দৃষ্টিতে অ্যান্টি-এজিং মানে হলো যত দিন সম্ভব শক্তিশালী, সচল ও মানসিকভাবে সতেজ থাকা।’

রোজা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রচলিত ‘টাইম-রেস্ট্রিকটেড ইটিং’-এর (নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে খাবার গ্রহণ) সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতি ক্যালরি কমানো ছাড়াই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও প্রদাহ কমাতে সহায়ক।

গজানফর বলেন, কেবল কম খাওয়া আর রোজা এক বিষয় নয়। দৈনিক অল্প সময়ের জন্য না খেয়ে থাকাও এমন কিছু মেরামতপ্রক্রিয়া চালু করে, যা সারা দিন অল্প অল্প করে খেলে পুরোপুরি সক্রিয় হয় না। তবে দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ—বিশেষ করে নারী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হতে পারে।

হরমোন, প্রদাহ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য

রোজার সময় ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায়, যা ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধি ও বয়সজনিত নানা রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। একই সঙ্গে গ্রোথ হরমোনের মাত্রা বাড়ে, যা পেশিশক্তি ও টিস্যু মেরামতে সহায়তা করে।

গজানফর বলেন, রোজা শরীরকে ক্রমাগত উদ্দীপনা থেকে বিরতি দেয়। ইনসুলিন কমে, প্রদাহের পথ শান্ত হয়, শরীর আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় যায়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমি রোজাকে আরোগ্যের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে নয়, বরং একটি ‘‘রিসেট’’ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি। এটি স্বাস্থ্যকর খাবার বা জীবনযাপনের বিকল্প নয়, বরং শরীরকে দক্ষভাবে সেরে ওঠার সুযোগ দেয়।’

রোজায় ত্বক উজ্জ্বল হওয়া বা পেশি বাড়ার দাবিকে অতিরঞ্জিত বলে মনে করেন গজানফর। প্রদাহ কমা ও ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উন্নত হওয়ায় ত্বকের কিছু উপকার হতে পারে, কিন্তু এটি সঠিক পুষ্টি, পানি গ্রহণ বা ত্বকের চর্চার বিকল্প নয়। এ ছাড়া পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ব্যায়াম ছাড়া রোজা পেশিক্ষয়ও ঘটাতে পারে—বিশেষত বয়স বাড়লে এই ঝুঁকি বেশি।

তবে এই প্রক্রিয়া সবার জন্য সমান নয়

বয়স, লিঙ্গ, মানসিক চাপ ও বিদ্যমান স্বাস্থ্যসমস্যা—সবই নির্ধারণ করে একজন ব্যক্তি রোজায় কেমন সাড়া দেবেন। তরুণ ও বিপাকীয়ভাবে সুস্থ ব্যক্তিরা সাধারণত সহজে মানিয়ে নিতে পারেন, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে—বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনের ভারসাম্য, পেশিশক্তি ও পুষ্টির গুরুত্ব বাড়ে।

গজানফর সতর্ক করেন, যদি রোজা ক্লান্তি, অনিদ্রা, বিরক্তি, মাথা ঘোরা, হরমোনের গোলযোগ বা পেশিক্ষয়ের কারণ হয়, তবে তা শরীরের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

গজানফর বলেন, রোজা ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষা নয়, এটি একটি উপায়। এটি যদি শক্তি ফিরিয়ে না দিয়ে বরং নিঃশেষ করে ফেলে, তবে বুঝতে হবে, শরীরের পুষ্টির প্রয়োজন।

রমজান এক মাসের বিরতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সূচনা

গজানফর মনে করেন, রমজানের সুফল টিকে থাকবে কি না, তা নির্ভর করে মাস শেষের পর অভ্যাস কতটা বজায় রাখা যায়, তার ওপর। দেরিতে রাতের খাবার এড়ানো, খাবারের মাঝে বিরতি রাখা, সচেতনভাবে খাওয়া ও পর্যাপ্ত ঘুম—এসব অভ্যাস ধরে রাখলে উপকার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

তাঁর মতে, রোজা কেবল আয়ু বাড়ায় না, বরং মানুষের ‘হেলথস্প্যান’ বা সুস্থ থাকার মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়। এটি মানুষকে সচেতন করে এবং শরীরের প্রাকৃতিক ছন্দের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রোজা কেবল সাময়িক কোনো সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের সঙ্গী।

তথ্যসূত্র: খালিজ টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত