Ajker Patrika

খাদ্য অপচয় রোধে ফ্রান্সের লোয়া গারো এক অনন্য আইনি মডেল

ফিচার ডেস্ক
খাদ্য অপচয় রোধে ফ্রান্সের লোয়া গারো এক অনন্য আইনি মডেল
লোয়া গারো আইনটি ফরাসি সুপারমার্কেটগুলোর ভেতরের কাজের ধরন সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি দোকানে একটি বিশেষ টিম থাকে, যারা প্রতিদিন প্রতিটি পণ্য নিখুঁতভাবে বাছাই করে অপচয় কমায়। ছবি: পেক্সেলস

দৈনন্দিন জীবনে কেনাকাটা করতে গিয়ে কিংবা রেস্তোরাঁয় খেতে বসে আমরা কত খাবারই না অপচয় করি। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই খাদ্য অপচয় রোধে আইন করে পৃথিবীতে এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটিয়েছে ফ্রান্স? বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তারা সুপারমার্কেটগুলোর ভালো খাবার ফেলে দেওয়া বা নষ্ট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট ও সিনেটে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয় এই ঐতিহাসিক আইন। ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরদিন থেকেই কার্যকর হয় এটি। এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য, মানুষের পুষ্টির অভাব দূর করা এবং বৈশ্বিক খাদ্য অপচয় রোধ করা। বিশ্বব্যাপী খাদ্য অপচয় রোধে এই ফরাসি মডেলটি আজ পুরো পৃথিবীর জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

সাধারণ মানুষের ক্ষোভ থেকে আইনি লড়াইয়ের গল্প

এই যুগান্তকারী আইনের পেছনে কোনো সরকারি ডিক্রি ছিল না, বরং ছিল সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ। ছিল একটি সামাজিক আন্দোলন এবং প্যারিসের কুর্বেভোয়া শহরের আরাশ দেরাম্বারশ নামে এক স্থানীয় কাউন্সিলরের অক্লান্ত পরিশ্রম। বড় বড় সুপারমার্কেটগুলো মেয়াদের কাছাকাছি থাকা ভালো খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দিলে ক্ষুধার্ত মানুষ সেখান থেকে খাবার সংগ্রহ করত। এটি বন্ধ করতে কিছু অমানবিক সুপারমার্কেট খাবারের ওপর ব্লিচিং পাউডার বা রাসায়নিক ছিটিয়ে দিত। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেরাম্বারশ একটি অনলাইন পিটিশন চালু করেন। মাত্র চার মাসে ২ লাখের বেশি মানুষ তাতে স্বাক্ষর করে বিষয়টিকে এক বিশাল গণ-আন্দোলনে রূপ দেয়।

গুইলোম গারো ও শাস্তির কড়া বিধান

আন্দোলনের মুখে বিষয়টি ফ্রান্সের জাতীয় সংসদে পৌঁছায়। এই বিলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও ফরাসি রাজনীতিক গুইলোম গারোর নামানুসারে আইনটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় লোয়া গারো বা গারো আইন। এই আইনের নিয়মকানুন ও শাস্তির বিধানগুলো অত্যন্ত কঠোর। ৪ হাজার ৩০৫ বর্গফুটের চেয়ে বড় সব সুপারমার্কেটের জন্য এই আইন বাধ্যতামূলক। আইন অনুযায়ী, সুপারমার্কেটগুলো তাদের অবিক্রীত কিন্তু খাওয়ার উপযোগী উদ্বৃত্ত খাবার ফেলে দিতে পারবে না। এগুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত একটি দাতব্য সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে দান করতে হবে। কোনো সুপারমার্কেট যদি এই নিয়ম অমান্য করে বা খাবার নষ্ট করে, তবে তাদের সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার ইউরো জরিমানা অথবা ২ বছরের কারাদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়ার আইনি ক্ষমতা রাখা হয়েছে।

লক্ষ্যমাত্রা ও আইপিএসওএস জরিপের সাফল্য

২০১৬ সালে আইনটি পাসের সময় মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে ল্যান্ডফিল বা আবর্জনার স্তূপ থেকে ৫০ লাখ বা ৫ মিলিয়ন টন খাদ্যবর্জ্য সম্পূর্ণ দূর করা হবে। বাজার গবেষণা সংস্থা আইপিএসওএসের জরিপ অনুযায়ী, আইনটি বাস্তবায়নের পর যে সাফল্য এসেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। আইনটি চালু হওয়ার আগে ফ্রান্সের মাত্র ৩৩ শতাংশ সুপারমার্কেট তাদের উদ্বৃত্ত খাবার দান করত। কিন্তু আইন চালুর মাত্র দুই বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই হার লাফিয়ে বেড়ে ৯৩ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির ডেটা অনুযায়ী, ২০১৫ সালের তুলনায় ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুড ব্যাংকগুলোতে জমা হওয়া খাবারের পরিমাণ ১৫ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

প্যারিসের কুর্বেভোয়া শহরের আরাশ দেরাম্বারশ নামে এক স্থানীয় কাউন্সিলরের অক্লান্ত পরিশ্রমে পাস হয় লোয়া গারো আইনটি। ছবি: সংগৃহীত
প্যারিসের কুর্বেভোয়া শহরের আরাশ দেরাম্বারশ নামে এক স্থানীয় কাউন্সিলরের অক্লান্ত পরিশ্রমে পাস হয় লোয়া গারো আইনটি। ছবি: সংগৃহীত

সুপারমার্কেটের অন্দরে অপচয় রোধের অভিনব কৌশল

লোয়া গারো আইনটি ফরাসি সুপারমার্কেটগুলোর ভেতরের কাজের ধরন সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি দোকানে একটি বিশেষ টিম থাকে, যারা প্রতিদিন প্রতিটি পণ্য নিখুঁতভাবে বাছাই করে অপচয় কমায়। ছড়া থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া কলা তারা কম দামে পুনরায় প্যাকেজিং করে বিক্রি করে দেয়। সামান্য দাগ লাগা রাসবেরি ফেলে না দিয়ে ভালো অংশগুলো বেছে নিয়ে পেস্ট্রির ওপর সাজানোর কাজে ব্যবহার করে। এক দিন আগের বেঁচে যাওয়া ক্রস্যান্ট বা চকলেট ব্রেডগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে রূপান্তর করা হয় সুস্বাদু অ্যালমন্ড পেস্ট্রিতে। চিনি বা লবণের মতো যেসব পণ্য সহজে পচে না বা নষ্ট হয় না, সেগুলোর গা থেকে বেস্ট-বিফোর বা মেয়াদের তারিখ পুরোপুরি তুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ফ্রিজে পণ্য রাখার ক্ষেত্রে নিয়মিত রোটেশন পদ্ধতি অর্থাৎ পুরোনো পণ্য সামনে, নতুন পণ্য পেছনে নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা হচ্ছে। যেসব খাবার কোনোভাবেই আর দান বা খাওয়ার উপযোগী থাকে না, সেগুলো ল্যান্ডফিলে ফেলে দেওয়া আইনত দণ্ডনীয়। সেই বর্জ্য খাবারগুলো বিশেষ প্রযুক্তিতে জৈব জ্বালানিতে রূপান্তর করা হয়। এখান থেকে পরবর্তী সময়ে সুপারমার্কেটের পণ্য সরবরাহকারী বড় বড় ডেলিভারি ট্রাকগুলো চালানো হয়।

ফরাসি মডেল থেকে ইউরোপ ও বিশ্বমঞ্চে দেরাম্বারশ

ফ্রান্সের এই বাধ্যতামূলক মডেলটি ইউরোপের অন্যান্য দেশকেও গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। ইতালি এবং চেক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলো ফরাসি মডেল অনুসরণ করে নিজস্ব ফুড-ডোনেশন বা খাদ্য-দান কর্মসূচি চালু করেছে। তবে বেশির ভাগ দেশেই এটি এখনো স্বেচ্ছামূলক হিসেবে কার্যকর রয়েছে, ফ্রান্সের মতো শাস্তিমূলক নয়। ফ্রান্সে আইন পাসের পর দেরাম্বারশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থল স্ট্র্যাসবুর্গে নিয়ে যান নিজের আন্দোলন। সেখানে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা একটি সার্কুলার ইকোনমি প্রস্তাবে শেষ মুহূর্তে একটি সংশোধনী যুক্ত করে পাস করেন। এর ফলে ইউরোপীয় কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যেন তারা পুরো ইইউ জুড়ে সুপারমার্কেট ও দাতব্য সংস্থাগুলোর মধ্যে খাদ্য দানের চুক্তি তৈরি করতে উৎসাহ দেয়। দেরাম্বারশ বিশ্বখ্যাত আইরিশ রক ব্যান্ড ‘ইউটু’-এর লিড ভোকালিস্ট ও সমাজকর্মী বোনোর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ানের সঙ্গে হাত মেলান। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যখন সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনা হয়, তখন তাঁরা যৌথভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্য অপচয় রোধে এই ফরাসি মডেলটি তুলে ধরেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, ফ্রান্স ২৪

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত