মানুষের জীবনে আর্থিক সংকট যেকোনো সময় আসতে পারে। কখনো অসুস্থতার চিকিৎসা, কখনো সন্তানের পড়াশোনা, আবার কখনো ব্যবসার প্রয়োজনে মানুষ অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার করে। বিপদের সময় কেউ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে সংকট মোকাবিলা সহজ হয়। কিন্তু সেই ধার যথাসময়ে পরিশোধ না করলে তৈরি হতে পারে অভিমান, অবিশ্বাস ও সম্পর্কের দূরত্ব। সামান্য কিছু টাকার জন্য নষ্ট হয়ে যায় দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক কিংবা আত্মীয়তার বন্ধন। অথচ ইসলাম ঋণ দেওয়া-নেওয়া উভয় ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতা, সততা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছে।
ঋণ দেওয়া: এক মহৎ মানবিক কাজ
ইসলাম মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেছে। কেউ আর্থিক সংকটে পড়ে সহযোগিতা চাইলে সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে ঋণ দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি তা বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন।’ (সুরা বাকারা: ২৪৫)
তবে ঋণ দেওয়ার উদ্দেশ্য হতে হবে মানুষের প্রয়োজন পূরণে সাহায্য করা। ঋণগ্রহীতার অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে অন্যায় সুবিধা নেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়।
ঋণ নেওয়া মানেই বড় দায়িত্ব
টাকা ধার নেওয়া সহজ হলেও তা যথাসময়ে পরিশোধ করা একটি নৈতিক দায়িত্ব। ঋণগ্রহীতাকে মনে রাখতে হবে, এই অর্থ অন্যের আমানত। সাময়িকভাবে ব্যবহারের অনুমতি পাওয়ার মানে এই নয় যে তিনি এর মালিক হয়ে গেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ পরিশোধের নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা নষ্ট করার নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেন।’ (সহিহ বুখারি: ২৩৮৭)
ধারের টাকা পরিশোধে তাগিদ
আমাদের সমাজে দেখা যায়, বিপদে পড়ে টাকা ধার নেওয়ার পর ফেরত দেওয়ার সময় এলে কিছু মানুষের আচরণ বদলে যায়। ফোন না ধরা কিংবা দেখা এড়িয়ে চলার মতো ঘটনা ঘটে। অথচ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে অবহেলা করা বা টালবাহানা করা স্পষ্ট জুলুম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করা জুলুম।’ (সহিহ বুখারি: ২৪০০)
বাস্তবেই যদি কোনো সমস্যা বা আর্থিক লোকসান দেখা দেয়, তবে ঋণগ্রহীতার উচিত পাওনাদারের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা এবং পরিশোধের জন্য যুক্তিসংগত সময় চাওয়া।
অসচ্ছল ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি
প্রকৃত অসচ্ছল ঋণগ্রহীতার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ারও কথা বলেছে ইসলাম। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর ঋণগ্রহীতা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি তোমরা সদকা হিসেবে ঋণ মাফ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।’ (সুরা বাকারা: ২৮০)
হিসাব লিখে রাখা ও স্বচ্ছতা
অনেকে পরিচিতজন বা আত্মীয়কে টাকা ধার দেওয়ার সময় কোনো লিখিত প্রমাণ রাখেন না। অথচ ভুল-বোঝাবুঝি এড়াতে লেনদেন লিখে রাখা ইসলামের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। সুরা বাকারার ২৮২ নম্বর আয়াতে নির্দিষ্ট মেয়াদের লেনদেন লিখে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। হিসাব লিখিত থাকলে ভবিষ্যতে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয় না।
টাকাপয়সা লেনদেন জীবনের স্বাভাবিক একটি অংশ। ঋণ যেমন বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ, তেমনি তা যথাসময়ে পরিশোধ করা ঋণগ্রহীতার ইমানি দায়িত্ব। লেনদেনে সততা বজায় থাকলে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস অটুট থাকে, সম্পর্ক সুন্দর হয় এবং সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় থাকে।










