Ajker Patrika

স্থিতিশীল দেশ গড়তে আদর্শ শাসকের ৬ করণীয়

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ
স্থিতিশীল দেশ গড়তে আদর্শ শাসকের ৬ করণীয়

মানুষের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং অধিকার নিশ্চিত হওয়ার মধ্যেই একটি দেশের প্রকৃত স্থিতি নিহিত। শাসকের হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা যেমন আমানত, তেমনি জনগণের অধিকার নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব। শাসনব্যবস্থাকে ন্যায়বিচার ও আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে ইসলাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের নিকট পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।’ (সুরা নিসা: ৫৮) আয়াতটি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মৌলিক নীতিসংবলিত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়তে শাসকের করণীয় হলো—

১. সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা

রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার প্রথম শর্ত ন্যায়বিচার। মানুষের পরিচয় দেখে আইনের প্রয়োগ বদলে গেলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। ফলে রাষ্ট্রের ভিতও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই জাত, ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় পেছনে রেখে অপরাধ ও প্রমাণের ভিত্তিতেই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচার করো, আর এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা: ৮) এ আয়াতের তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এমনকি কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিরাগও যেন শাসককে ন্যায়-ইনসাফ থেকে বিচ্যুত না করে, সে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এ কারণেই অপরিহার্য। বিচারক যেন ক্ষমতাবানকে ভয় না করেন, আবার দুর্বল মানুষের প্রতিও অবিচার না করেন, এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ন্যায়পরায়ণ শাসকের মর্যাদা বর্ণনা করে বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহর ছায়াপ্রাপ্ত সাত শ্রেণির অন্যতম হলো ‘ন্যায়পরায়ণ শাসক’। (সহিহ মুসলিম: ১০৩১)

একই সঙ্গে প্রশাসনের সর্বস্তরে দুর্নীতির পথ বন্ধ করতে হবে। ঘুষ, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি সম্পদের আত্মসাৎ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট বৃদ্ধি করে। তাই দুর্নীতি দমনে আইন যেমন কঠোর হবে, তেমনি তার প্রয়োগও হতে হবে পরিচয়-নিরপেক্ষ।

২. অর্থনীতিতে ভারসাম্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ

রাষ্ট্রের শান্তি কেবল রাজনৈতিক স্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। মানুষের ঘরে অর্থনৈতিক স্বস্তি না থাকলে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। একজন দায়িত্বশীল শাসকের অন্যতম কাজ হলো এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সম্পদ কেবল একটি শ্রেণির হাতে আবদ্ধ না থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে আবর্তিত হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যাতে তা (সম্পদ) কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা হাশর: ৭) এ আয়াত সম্পদের সামাজিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরেছে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে এমন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ উৎপাদন, ব্যবসা ও সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ পায়।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি। নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মের ক্ষেত্র বাড়াতে হবে। সহজ শর্তে বৈধ অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা গেলে বহু তরুণ চাকরিপ্রার্থী থেকে উদ্যোক্তায় পরিণত হতে পারবে।

৩. দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, চাল, ডাল, তেল, সবজি, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে সংকটাপন্ন করে তোলে। তাই একজন দায়িত্বশীল শাসকের অন্যতম কর্তব্য হলো বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।

ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যকে বৈধতা দিয়েছে, কিন্তু প্রতারণা, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মানুষের কষ্ট বাড়ানোকে সমর্থন করেনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মজুতদারি করে, সে অপরাধী।’ (সহিহ মুসলিম: ১৬০৫) তাই আমদানি-রপ্তানিতে দুর্নীতি, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত মুনাফার উদ্দেশ্যে পণ্য আটকে রাখা কিংবা ভোক্তাকে প্রতারিত করার মতো অনিয়ম বন্ধে কার্যকর নজরদারি অপরিহার্য।

৪. মৌলিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

জনগণের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা সফল রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এগুলোর প্রতি রাষ্ট্রকে বিশেষ মনোযোগী হতে হবে। বিধবা, এতিম, প্রতিবন্ধী, প্রবীণ ও অসচ্ছল মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য যেহেতু মানুষের মৌলিক অধিকার, তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের কাছেও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পৌঁছানো, দরিদ্র মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসাব্যবস্থায় বৈষম্য কমানো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলাম মানুষের প্রতি কল্যাণ ও সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায় ও অনুগ্রহের নির্দেশ দেন।’ (সুরা নাহল: ৯০)

একই সঙ্গে মতপ্রকাশ ও সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা সমাজে ভীতি তৈরি করবে, আর এতে রাষ্ট্র ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

৫. রাজনৈতিক সহনশীলতা

একটি দেশের মানুষ কখনো সব বিষয়ে একমত হবে না। মতপার্থক্য ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই। তবে এই মতভিন্নতা যেন রাষ্ট্রীয় বিভাজনে পরিণত না হয়, সেটাই বিচক্ষণ নেতৃত্বের আলামত। ইসলামও এই চিন্তাকে সমর্থন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মতভেদ কোরো না, কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীরা মতভেদ করেছিল এবং এর ফলে তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি: ২৪১০) সুতরাং নীতিগত বিতর্ক থাকলেও রাষ্ট্রীয় সংহতি ধরে রাখাই ইসলামের মূল শিক্ষা।

৬. দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে নিজের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম হতে হয়। এ জন্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আধুনিক ও দক্ষ করার পাশাপাশি কূটনৈতিক সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হবে জাতীয় স্বার্থ। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে অকারণ বৈরিতা কিংবা কারও ওপর অন্ধ নির্ভরতা, উভয়টিই রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। তাই এগুলো পরিহার করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

আদর্শ শাসক সেই ব্যক্তি, যিনি ক্ষমতাকে মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ন্যায় ও দক্ষতার ভিত্তিতে পরিচালনা করেন, ভিন্নমতকে সহ্য করেন, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং দেশের বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যৎকেও সমান গুরুত্ব দেন। এমন নেতৃত্বের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্রে স্থায়ী স্থিতিশীলতার ভিত নির্মিত হতে পারে।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত