মো. ফয়সাল। বয়স মাত্র ২৬ বছর। তরতাজা এক যুবক। তাঁকে চোর সন্দেহে দিনের আলোয় নির্মমভাবে নির্যাতন করে পিটিয়ে হত্যা করেছে একদল মানুষ। ফয়সালের বাবার নাম বাদশাহ মিয়া। বাদশাহর সন্তান হয়েও ফয়সাল ছিলেন বাংলাদেশের একজন সাধারণ দরিদ্র দিনমজুর ও নিরীহ নাগরিক। হয়তো সেটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অপরাধ—তিনি ছিলেন অসহায়, দরিদ্র এবং প্রতিরোধহীন।
তাঁকে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তাঁর পিঠের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল একের পর এক ভারী ইট। ইটের ভারে কাতর হয়ে পড়া এই তরুণকে ঘিরে চলেছে নির্মম পিটুনি। নির্যাতনের একপর্যায়ে তাঁর মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে এলেও থামেনি আঘাত।
চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ১৫ থেকে ২০ জন মানুষ। কেউ তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। কেউ এক গ্লাস পানি নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াননি। বরং অনেকেই মুঠোফোনে ধারণ করেছেন সেই ভয়াবহ মৃত্যুর দৃশ্য।
প্রশ্ন ওঠে—একজন মানুষ যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, তখন আরেকজন মানুষ কীভাবে সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করতে পারেন?
মৃত্যুর আগে তৃষ্ণা কতটা যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে, তা হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারি না। অথচ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো একজন মানুষকে এক ফোঁটা পানি দেওয়ার মতো মানবিকতাও যেন সেদিন কারও মধ্যে অবশিষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন দিয়েই জীবনের ফয়সালা করে গেলেন একজন নিরীহ ফয়সাল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কিসের ফয়সালা?
ঘটনাটি ঘটেছে এ বছর ১৫ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার, কক্সবাজারের মহেশখালীর বড় মহেশখালী ইউনিয়নের পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকায়।
আজ থেকে দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ঠিক এই সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখে, ঢাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে ঘটে গিয়েছিল আরেকটি নির্মম হত্যাকাণ্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ এনে ৩৫ বছর বয়সী তোফাজ্জল হোসেনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
তোফাজ্জলের জীবনকাহিনি ছিল বেদনায় ভরা। জানা যায়, যে বছর এক দুর্ঘটনায় তিনি তাঁর বাবাকে হারান, সেই বছরই দুরারোগ্য ব্যাধিতে তাঁর প্রিয় মাকেও হারাতে হয়। তাঁর এক ভাই, যিনি পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন, মৃত্যুবরণ করেন ক্যানসারে। একের পর এক প্রিয়জনকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন তরুণ তোফাজ্জল।
এরপর তিনি ক্যাম্পাসের আশপাশে ঘুরে বেড়াতেন। কেউ কিছু খেতে দিলে তাতেই হয়তো তাঁর দিন কেটে যেত। জীবনের কাছে তাঁর চাওয়া-পাওয়ার যেন আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। স্বপ্নহীন, আপনজনহীন এক মানুষ, কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন ৩৫ বছরের ক্লান্ত জীবন। অথচ সেই জীবনটুকুও এক রাতে নির্মমভাবে কেড়ে নেওয়া হলো।
একটি মোবাইল ফোনের জন্য একটি মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া, একজন সুস্থ, স্বাভাবিক বিবেকসম্পন্ন মানুষের পক্ষে এমন ঘটনা কল্পনা করাও কঠিন। অথচ আমাদের সমাজে এমন ঘটনা ঘটছে।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের অনেকেই ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ দেশের অল্পসংখ্যক তরুণের ভাগ্যেই জোটে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁদেরই তো দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার কথা। কেউ বিচারক হবেন, কেউ প্রশাসনের দায়িত্ব নেবেন, কেউ শিক্ষক, গবেষক কিংবা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে আসবেন, এমন প্রত্যাশাই থাকে তাঁদের ঘিরে।
মানুষ তৈরির যে প্রতিষ্ঠান থেকে মানবিকতা, যুক্তিবোধ, ন্যায়বোধ ও সহনশীলতার শিক্ষা পাওয়ার কথা, সেখানকার শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যখন এমন নৃশংসতার অভিযোগ ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, আমরা আসলে কেমন মানুষ তৈরি করছি?
তোফাজ্জলের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই তো সেদিন, ১৮ সেপ্টেম্বর খুলনার এক মেসে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে পিটিয়ে ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হলো টগবগে তরুণ আজমুল হোসেনকে।
এখানে মাত্র তিনটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হলো। বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। আমাদের দেশে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো মানুষকে চোর, ছিনতাইকারী কিংবা অপরাধী সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হতে হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই শুরু হয়ে যায় শাস্তি। আর সেই শাস্তি অনেক সময় এতটাই নির্মম হয় যে অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তো দূরের কথা, বেঁচে থাকার সুযোগটুকুও থাকে না।
কোনো কিছু হারিয়ে গেলে কিংবা খোয়া গেলে অনেক পরিবারেই প্রথম সন্দেহের তির গিয়ে পড়ে গৃহকর্মীর দিকে। বিশেষ করে দরিদ্র, অসহায় ও সহায়সম্বলহীন মানুষগুলো সহজেই হয়ে ওঠেন সন্দেহের লক্ষ্য। তাঁদের ওপর চলে মানসিক নির্যাতন, শারীরিক নিগ্রহ, অপমান ও অত্যাচার।
কেউ হয়তো সৌভাগ্যক্রমে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান। কিন্তু অনেকেই সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। কেউ শারীরিকভাবে বেঁচে গেলেও গভীর মানসিক ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকেন। সেই ক্ষতের খবর আমাদের কাছে খুব কমই পৌঁছায়। কারণ, এসব মানুষের কণ্ঠস্বর দুর্বল।
তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রভাবশালী কেউ থাকেন না। তাঁদের যন্ত্রণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তোলে না। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় জায়গা হয় না। অনেক ঘটনার মতো তাঁদের ওপর চালানো নিষ্ঠুরতাও ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায় দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য খবরের ভিড়ে।
কেউ চুরি করেছে—এমন সন্দেহ হলেই কি তাকে মারধর করার অধিকার আমরা পেয়ে যাই? আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কি কোনো ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষার্থী কিংবা জনতার আছে?
অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হবে। প্রমাণ সংগ্রহ হবে। আদালতে বিচার হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে। এটাই সভ্য সমাজের নিয়ম। কিন্তু আমরা যেন ক্রমেই সেই নিয়মটি ভুলে যাচ্ছি।
সন্দেহ থেকে মারধর, মারধর থেকে গণপিটুনি, আর গণপিটুনি থেকে মৃত্যু, এই ভয়ংকর পথটি আমাদের সমাজে যেন অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং কখনো কখনো মানুষের মধ্যে এমন এক উন্মত্ততা তৈরি হয়, যেখানে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার দৃশ্যও যেন বিনোদনের অংশ হয়ে ওঠে। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
কারণ, একটি সমাজের সভ্যতা শুধু তার উঁচু ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়, সড়ক কিংবা প্রযুক্তির অগ্রগতিতে মাপা যায় না। একজন দুর্বল, অসহায় ও অভিযুক্ত মানুষের সঙ্গে আমরা কেমন আচরণ করি, সেখানেও সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায়।
সন্দেহ থেকে গণপিটুনি, এরপর হত্যা—এসব আমাদের বিবেকের সামনে রাখা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে পাই? একজন অসহায় মানুষের মুখ, নাকি নিজেদেরই মুখ?
পিটিয়ে খুন করা কোনো বিনোদন নয়। এটি সভ্যতার পরাজয়, আইনের প্রতি অবিশ্বাস এবং মানুষের বিবেকের ভয়াবহ অবনতির প্রতিচ্ছবি; জাতির সামষ্টিক মানসিকতার ভয়াবহ অবক্ষয়।

স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা একটা যথাযথ শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে পারিনি। এ নিয়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের আক্ষেপের শেষ নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তখন সেই দলের চিন্তাভাবনা তারা শিক্ষানীতিতে প্রয়োগ করে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে দেশের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে।
১ ঘণ্টা আগে
একজন নারীর নিরাপদে বেঁচে থাকা আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক বা দুই দশক আগে বলা হতো নারীরা ঘরের বাইরে অনিরাপদ, ঘরে তারা সুরক্ষিত। কিন্তু বর্তমান সময়ের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
২০ সেপ্টেম্বর রাতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনটি যখন জারি হলো, তখন ঢাকার পাম্পগুলোতে গাড়ির লম্বা সারি হচ্ছিল। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল লিটারে ১১৫ থেকে ১৩৫, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চার পণ্যেই এক রাতে ২০ টাকা বৃদ্ধি।
১ দিন আগে
ধরে নিন, আপনি প্রিয় কোনো সুরসাধক বা শিল্পীর জমকালো কনসার্ট দেখতে মাঠে ঢুকলেন। আপনার টিকিটের গায়ে কোনো আসন নম্বর লেখা নেই, তবে আপনি নিশ্চিত জানেন টিকিটগুলো পর্যায়ক্রমে ১ নম্বর থেকে বিক্রি শুরু হয়েছিল। এখন মাঠে বসে আপনি কি নিজেকে ১ নম্বর কিংবা একেবারে শেষের টিকিটধারী দর্শক বলে দাবি করবেন? নিশ্চয়ই না।
১ দিন আগে