Ajker Patrika

মুখের কথার মূল্য ও ওয়াদা রক্ষার গুরুত্ব

আনওয়ার হুসাইন
মুখের কথার মূল্য ও ওয়াদা রক্ষার গুরুত্ব

মানুষের মুখের একটি কথার মূল্য কত? পৃথিবীর ইতিহাসে যত সফল সম্পর্ক ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে, তার মূলে ছিল একটি অদৃশ্য শক্তি—বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাসের প্রধান ভিত্তি হলো ওয়াদা রক্ষা। মানুষের মুখের কথার মূল্য থাকলে সমাজে মামলা-মোকদ্দমা কমে, ব্যবসায় সততা আসে এবং পরিবারে প্রশান্তি বাড়ে। বিপরীতে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হলে পারস্পরিক আস্থা ধসে পড়ে।

আজ প্রযুক্তি উন্নত হলেও মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস তলানিতে এসে ঠেকেছে। লিখিত চুক্তি, জামিনদার কিংবা আইনি দলিলের পরও সমাজে প্রতারণা কমছে না। কারণ সংকট আইনের নয়; সংকট মানুষের নৈতিক চরিত্রে। ইসলাম এমন এক আদর্শ মানুষ গড়ে তুলতে চায়, যার মুখের কথাই হবে তার বিশ্বস্ততার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ইসলামে ওয়াদা রক্ষা করা ইমানের অপরিহার্য দাবি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা ইসরা: ৩৪)

আল্লাহর এই নির্দেশ কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সঙ্গে মানুষের সমস্ত বৈধ চুক্তি, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং পারিবারিক দায়িত্ব এর অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে সফল মুমিনদের গুণাবলি উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে—তারা আমানত ও অঙ্গীকার যথাযথভাবে রক্ষা করে।

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে ইসলাম মুনাফিকের অন্যতম লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি—কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং আমানতের খেয়ানত করে। (সহিহ বুখারি: ৩২)। তবে আন্তরিক সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোনো অনিবার্য বিপদ বা অক্ষমতার কারণে প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারলে তা ক্ষমার যোগ্য; অপরাধ কেবল ইচ্ছাকৃত প্রতারণায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ওয়াদা রক্ষার মূর্ত প্রতীক। নবুওয়াত পাওয়ার আগে থেকেই তিনি মক্কায় ‘আল-আমিন’ নামে পরিচিত ছিলেন। হুদাইবিয়ার সন্ধিতে চুক্তি রক্ষার্থে বন্দী সাহাবি হজরত আবু জান্দাল (রা.)-কে মক্কার কুরাইশদের হাতে ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত বিজয় এনে দেয়।

ব্যক্তি, পরিবার ও কর্মজীবনে ওয়াদা রক্ষা না করলে নিজের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। সন্তানকে দেওয়া ছোট ছোট প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করলে তারা শুরুতেই কথা ভঙ্গের পাঠ শেখে। ব্যবসা ও সামাজিক জীবনেও কথার বরখেলাপ মানুষের আস্থা নষ্ট করে।

একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত মাপকাঠি তার মানুষের নৈতিক চরিত্রে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সমাজে নৈতিক পুনর্জাগরণ জরুরি। তাই আমাদের এমন কোনো কথা দেওয়া উচিত নয়, যা পূরণ করার সাধ্য নেই; আর যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, তা আল্লাহকে সাক্ষী রেখে রক্ষা করাই একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত