কোরবানি একদিকে আত্মত্যাগের মহাকাব্য, অন্যদিকে মুসলিম সমাজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রদর্শনী। বিশ্বের নানা প্রান্তে এই ইবাদতকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এমন সব লোকজ রীতি, যা কখনো বিস্ময় জাগায়, কখনো আবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

কোথাও কোরবানির পশুকে সন্তানস্নেহে নাম দেওয়া হয়, কোথাও আবার মেহেদি পরিয়ে সাজানো হয়, আবার কোথাও ভেড়ার কুস্তি প্রতিযোগিতা, পশুর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, গলায় ফুলের মালা পরানো, রঙিন কাপড়ের মোড়কে শিং ঢেকে দেওয়াসহ নানা আয়োজন হয়ে ওঠে উৎসবের প্রধান আকর্ষণ। ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে লোকজ সংস্কৃতির এই মিশেলই কোরবানির ঈদকে করে তোলে আরও রঙিন, আরও বৈচিত্র্যময়।
জিলহজের নবম দিনে লিবিয়ার পরিবারগুলো কোরবানির পশু জবাইয়ের প্রস্তুতি শুরু করে বিশেষ কিছু ঐতিহ্যবাহী আচার পালনের মধ্য দিয়ে। নারীরা পশুর চোখে আরবি সুরমা পরিয়ে দেন। জবাইয়ের আগে পর্যাপ্ত পানি পান করানো হয়, যাতে পশু পিপাসার্ত অবস্থায় জবাই না হয়। পশুর গলা পানি ও লবণ দিয়ে ধুয়ে দেওয়া হয়—পবিত্রতার এক প্রতীকী আচার হিসেবে। এ ছাড়া ভেড়ার পিত্তথলি দরজায় ঝুলিয়ে রাখার রেওয়াজও আছে—বিশ্বাস করা হয় এটি কল্যাণ বয়ে আনে ও কুনজর দূর করে।

কিছু লিবীয় পরিবার এখনো একটি পুরোনো রীতি মেনে চলে—কোরবানির পশু প্রথম দিনে জবাই করা হয়, কিন্তু মাংস কাটা হয় পরের দিনে।
জিলহজের নবম দিনে আলজেরিয়ায় শুরু হয় ঈদুল আজহার উৎসব। মহল্লার মানুষজন ‘হাওশ’ বা নির্দিষ্ট উন্মুক্ত চত্বরে একত্র হন এবং শুরু হয় ভেড়ার কুস্তি প্রতিযোগিতা।

এটি আলজেরিয়ার এক অনন্য ঐতিহ্য। স্থানীয় মহল্লা থেকে শুরু করে প্রদেশ পর্যায় পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়। অনেকে সারা বছর ধরে বিশেষভাবে ভেড়া লালন-পালন করেন শুধু এই প্রতিযোগিতার জন্য।
পাকিস্তানে কোরবানির পশু সাজানো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেওয়াজ। ঈদের বেশ আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয় পশু কেনার। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব মিলে হাটে যায়। গরু, ছাগল, ভেড়া বা উট পছন্দ করে কেনে।

সমাজের অনেক দরিদ্র মানুষ সারা বছর ধরে পশু লালন-পালন করেন কেবল কোরবানির দিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করবেন বলে। কোরবানির আগে পশুকে রঙিন সাজে সজ্জিত করা হয়। মায়া-আদর মাখিয়ে পশুর যত্ন নেয়।
মিসরে কোরবানির উৎসব শুরু হয় পশু কেনার মুহূর্ত থেকেই, বিশেষত খাসি বা ভেড়া কেনার মধ্য দিয়ে। গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্র এটি একটি বার্ষিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। বাবা তাঁর ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে হাটে যান, ঘুরে ঘুরে কোরবানির পশু বেছে নেন।

আনন্দ শুধু কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বাড়ি ফেরার পর শিশুরা পশুর সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। ভালোবেসে ‘শেখ সাইয়িদ’ নাম দেয়। এই নামটি নেওয়া হয়েছে স্থানীয় বিখ্যাত লোকগীতি:
‘বুকরাতাল ঈদ,
ওয়া নুঈদু ওয়া নাজবাহুকা—
ইয়া শাইখা সাইয়িদ।’
অর্থ: ‘আগামীকাল ঈদ। আমরা ঈদ করব, তোমাকে জবাই করব—হে শেখ সাইয়িদ।’

মিসরীয় গ্রামাঞ্চলে কেবল নামকরণেই শেষ নয়, রয়েছে পশুকে মেহেদি দেওয়ার রেওয়াজও। আরাফার দিন সকালে বা তার আগের দিন পরিবারের ছোট-বড় সবাই মেহেদির থালা নিয়ে একত্র হন এবং কোরবানির পশুকে মেহেদি মাখিয়ে দেন। প্রতিবেশী একাধিক পরিবার মিলে একসঙ্গে মেহেদি অনুষ্ঠান করার রীতিও প্রচলিত আছে। এই আয়োজনে নিজ নিজ পশু নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা হয়। শিশুরা পরিবারের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে।
বাংলাদেশে কোরবানির পশু কেনা শুধু একটি ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—একধরনের পারিবারিক উৎসবে পরিণত হয়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কাছে এই সময়টি হয়ে ওঠে বছরের সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্তগুলোর একটি। হাট থেকে পছন্দের গরু-মহিষ, ভেড়া বা ছাগল কেনার পর থেকেই শুরু হয় তাকে ঘিরে এক বিশেষ প্রস্তুতি—সাজানো, আদর করা এবং পরিবারের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার অনুভূতি।

শিশুরা কোরবানির পশুর সঙ্গে গভীর আবেগময় সম্পর্ক গড়ে তোলে। তারা পশুকে কাছে থেকে দেখে, খাবার দেয়, গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে, পিঠে চড়ে বসে। আবার কখনো কখনো নিজেদের মতো করে তার নামও রাখে। এই নামকরণ ও যত্নের মধ্য দিয়ে পশুটি যেন কয়েক দিনের অতিথি হয়ে ওঠে।
হাট থেকে পশু কেনার পর অনেকেই কাগজ, কাপড় ও রঙিন জরি দিয়ে তৈরি মালা, ফিতা ও ঘণ্টা কিনে আনে। এসব দিয়ে পশুর গলা সাজানো হয়। ঘণ্টার টুংটাং শব্দে পশু যখন পথে হাঁটে, তখন আশপাশের মানুষও থমকে তাকায়। এভাবেই ঈদের আগমনী আনন্দ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

গ্রামাঞ্চলে কোরবানির পশুর জন্য বাড়িতে একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করা হয়—তাকে ভালো খাবার দেওয়া হয় এবং পরিবারের সদস্যরা মিলেই তার দেখভাল করেন। অনেক ক্ষেত্রে পশু কেনার পর শিশুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে কার আগে খাওয়াবে। কোরবানির হাটের কোণে পশু সাজানোর সামগ্রী নিয়ে আলাদা দোকান বসে—যেখানে পাওয়া যায় রঙিন মালা, ঘুঙুর, গলার বেল্ট, লাঠি ও অন্যান্য সাজসজ্জার উপকরণ।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশে কোরবানির পশু সাজানোর এই সংস্কৃতি ঈদুল আজহার উৎসবকে আরও গভীর ও প্রাণবন্ত করে তোলে।

মানবজীবনে জীবনসঙ্গীর প্রভাব অপরিসীম। একজন ভালো সঙ্গী মানুষকে আলোর পথে চালিত করে, আর মন্দ সঙ্গী জীবনকে বিপথগামী করে তোলে। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে ঘরে ফিরে সঙ্গীর একটু সহমর্মিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ দেহ-মনকে প্রফুল্ল করে তোলে, মানুষকে নতুন উদ্যমে বাঁচার প্রেরণা জোগায়।
৫ ঘণ্টা আগে
মহানবী মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাচনশৈলীর অধিকারী। তাঁর কথা বলার ধরন ও শব্দ চয়ন ছিল এতটাই মনোমুগ্ধকর, যা শ্রোতার হৃদয়ে সরাসরি রেখাপাত করত। তাঁর সুমিষ্ট বাণী মানুষকে সত্যের পথে আকর্ষিত করত।
১২ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
১৭ ঘণ্টা আগে
আমরা আখিরাতের অনন্ত জীবনের যাত্রী। এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রতিটি কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ পাবে পরকালে—যার শেষ পরিণতি হয় চিরসুখের জান্নাত, না হয় ভয়াবহ জাহান্নাম। আজকাল আমরা অঢেল ধনসম্পদ, বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি কিংবা সমাজের উঁচু পদমর্যাদাকেই ‘সফলতা’ বলে ধরে নিয়েছি।
২ দিন আগে