শুকনো বালির রাজ্যে দিগন্তরেখা পর্যন্ত কেবল ধু-ধু প্রান্তর। ধূসর পাহাড় আর রুক্ষ পাথুরে মাটির বুক চিরে এঁকেবেঁকে চলে গেছে পথ। সেই পথে হেঁটে চলেছে একদল মুসাফির। তাঁরা প্রিয় নবী (সা.)-এর শহর মদিনার উদ্দেশ্যে হিজরত করছে। তাঁদের গোত্রের নাম আশআরি। তাঁদের নেতৃত্বে আছেন হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)।
যাত্রা দীর্ঘ, পথ বন্ধুর। সঙ্গে ছিল সামান্য কিছু খাবার আর পানি—যা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। ক্লান্তিতে তাঁদের শরীর ভেঙে আসছিল, ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়েছিল প্রতিটি প্রাণ। মুখের হাসিটুকুও যেন শুকিয়ে গেছে, কেবল চোখে লেগে আছে অজানা এক পথের ক্লান্তি। তবুও তাঁরা ভেঙে পড়েননি। তাঁদের হৃদয়ে ছিল আল্লাহর প্রতি অটল বিশ্বাস। বিশ্বাস ছিল, এই দীর্ঘ যাত্রার শেষে মদিনায় পৌঁছালে তাঁদের সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে।
দিন গড়িয়ে বিকেল হলো, বিকেলের আলো নিভে সন্ধ্যা নেমে এলো। আশআরি গোত্রের লোকেরা তাঁবু ফেলল। সবার চোখে-মুখে গভীর হতাশা। না আছে কোনো খাবার, না আছে পান করার মতো এক ফোঁটা পানি। ক্ষুধার জ্বালা সবার চেয়ে বেশি কাবু করে ফেলছে ছোট শিশুদের। তাঁদের ক্ষুধা কাতর চোখের দিকে তাকিয়ে বুক ভেঙে যাচ্ছিল বড়দের। এই অবস্থায় দলের প্রধান আবু মুসা আশআরি (রা.) এক সিদ্ধান্ত নিলেন। এক সঙ্গীকে প্রতিনিধি করে পাঠালেন মদিনায়, প্রিয় নবীজির কাছে।
মরুর পথ ধরে চলছেন সেই প্রতিনিধি। তাঁর কাঁধে এক কঠিন দায়িত্ব—নবীজির কাছে গিয়ে তাঁদের দুরবস্থার কথা জানানো এবং খাবারের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা। এদিকে তিনি নিজেও ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত ছিল। তবে তাঁর মনে ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। কোনোভাবেই তিনি প্রিয় নবীজির কাছে পৌঁছানোর আগে হতাশ হবেন না। তাঁর মনে বারবার ভেসে উঠছিল আশআরি গোত্রের ক্লান্ত মুখ, বিশেষ করে শিশুদের নিষ্পাপ চেহারা।
মদিনার পথে একাই দ্রুত হাঁটতে শুরু করলেন তিনি। তাঁর পায়ের নিচে পাথরের টুকরো আর বালু যেন আগুন হয়ে উঠেছে। তিনি কোনোভাবে প্রিয় নবী (সা.)-এর বাড়ি খুঁজে বের করলেন। নবীজির বাড়িতে পৌঁছে তিনি অবাক হয়ে দেখতে পেলেন, দরজার বাইরে কোনো রক্ষী নেই। ভেতরে থেকে ভেসে আসছে এক সুর, এক স্নিগ্ধতা, এক প্রশান্তি—যা কোনো দিন সে আগে শোনেননি। তিনি বুঝতে পারলেন—এটি প্রিয় নবী (সা.)-এর কণ্ঠ। মধুর কণ্ঠে মায়ার নবী কোরআন তিলাওয়াত করছেন।
তিনি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একমনে শুনতে থাকলেন। নবীজি যে আয়াতগুলো তিলাওয়াত করছিলেন, তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন তাঁর হৃদয়ে শীতল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। তিনি হারিয়ে যাচ্ছিলেন জান্নাতি আবেশে। তিলাওয়াতের একপর্যায়ে নবী করিম (সা.) একটি আয়াত পাঠ করছেন—যার অর্থ এমন, ‘পৃথিবীতে বিচরণ করে এমন কোনো প্রাণী নেই যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ গ্রহণ করেননি।’ (সুরা হুদ: ৬)
এই আয়াত শুনে আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর পাঠানো সেই প্রতিনিধির চোখে পানি চলে এলো। তাঁর মনে এক অভাবনীয় পরিবর্তন এলো। তিনি ভাবলেন, যে আল্লাহ সকল প্রাণীর খাবারের দায়িত্ব নিয়েছেন, সেই আল্লাহ কি আমাদের মতো দুর্বল মুসাফিরদের ভুলে যাবেন? যে আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, সেই আল্লাহ কি আমাদের রিজিক ছাড়া থাকতে দেবেন? না, এটা অসম্ভব। আমরা তো পশুপাখির চেয়ে কোনো অংশে কম নই। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা করবেন।
তাঁর পেটে ছিল তীব্র ক্ষুধা আর গলায় ছিল পিপাসা। কিন্তু এই আয়াতে তিনি পেলেন এক নতুন শক্তি। তাঁর মনের সব হতাশা, কষ্ট, আর ক্লান্তি এক নিমেষে দূর হয়ে গেল। আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি কাফেলার দিকে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। নবীজির ঘরে গিয়ে নিজেদের করুণ অবস্থার কথা বলতে তাঁর আর মন চাইল না। তিনি মনে মনে ভাবলেন, ‘আমি যা শোনার, তা তো শুনেই নিয়েছি। এখন শুধু অপেক্ষা। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করবেন।’
তিনি ফিরে এসে আবু মুসা আশআরি (রা.)-কে বললেন, ‘শুভ সংবাদ, আমাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য আসছে!’
আবু মুসা আশআরি (রা.) ও তাঁর দলের লোকেরা মনে করলেন, তিনি নিশ্চয়ই নবীজির কাছ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করার আশ্বাস পেয়ে ফিরে এসেছেন। তাই তাঁরা নিশ্চিত হয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকলেন। হঠাৎ দূর থেকে দুজন অপরিচিত লোককে আসতে দেখা গেল। তাঁদের হাতে একটি বিরাট পাত্র—কাপড় দিয়ে ঢাকা। তাঁদের তাঁবুর সামনে এসে পাত্রটি রেখে তাঁরা বললেন, ‘দয়া করে খাবারগুলো গ্রহণ করুন।’
গোত্রের লোকেরা পাত্রটি খুলে দেখতে পেলেন, তাতে রয়েছে প্রচুর রান্না করা মাংস ও রুটি। তাঁরা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। ক্ষুধার্ত মুসাফিররা পেট ভরে খেলেন। তারপরও পাত্রে প্রচুর খাবার অবশিষ্ট রয়ে গেল। তাঁরা সেই খাবার নবী করিম (সা.)-এর কাছে ফেরত পাঠানো প্রয়োজন মনে করলেন—যেন তিনি প্রয়োজন অনুপাতে তা কাজে লাগাতে পারেন।
তাঁরা সেই অবশিষ্ট খাবার নিয়ে দুজন প্রতিনিধিকে পাঠালেন প্রিয় নবীজির কাছে। তারা খাবারের পাত্র নিয়ে নবীজির সামনে পৌঁছে বললেন—‘আপনার পাঠানো খাবারগুলো অত্যন্ত সুস্বাদু ছিল। আমাদের সবাই পরিতৃপ্ত হয়ে খাওয়ার পর এগুলো অতিরিক্ত হয়েছে।’
নবীজি (সা.) অবাক হলেন। বললেন, ‘আমি তো তোমাদের জন্য কোনো খাবার পাঠাইনি। আর তোমাদের কোনো খাবার লাগবে—সেটাও তো আমি জানি না। এই খাবার কোত্থেকে এলো?’
তারা তখন পুরো ঘটনা খুলে বললেন—আমাদের অসুবিধার কথা আপনার কাছে ব্যক্ত করার জন্য অমুক ব্যক্তিকে প্রেরণ করেছিলাম। তিনি ফিরে গিয়ে এ কথা বলেছিলেন। ফলে আমরা মনে করেছি যে, আপনিই খাবার পাঠিয়েছেন।
সবকিছু শুনে নবীজি মুচকি হেসে বললেন, ‘আমি তো কোনো খাবার পাঠাইনি! ওই পবিত্র সত্তাই পাঠিয়েছেন, যিনি সকল প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন।’
নবীজির কথা শুনে তাঁদের মনে এক গভীর বিশ্বাস জন্মাল। তাঁরা বুঝলেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর ওপর ভরসা করা কতটা জরুরি। কারণ, আল্লাহ আমাদের রিজিকের ব্যবস্থা করেন অপ্রত্যাশিতভাবে, যখন আমাদের সব আশা শেষ হয়ে যায়। তিনি আমাদের পথ দেখান, যখন আমরা দিগ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ি। আমাদের শুধু তাঁর ওপর অবিচল আস্থা রাখতে হয়।
তথ্যসূত্র: তাফসিরে কুরতুবি

জীবন চলায় বিপদ বা সমস্যা কখনো বলে আসে না। যেকোনো মুহূর্তে মানুষ কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারে। অনেক সময় আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি, ধৈর্য হারিয়ে ফেলি। কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে—কীভাবে বিপদে ধৈর্য ধরে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হয়।
১ ঘণ্টা আগে
ব্রিটিশ ভারতের প্রখ্যাত হানাফি আলেম, হাদিস বিশারদ ও আধ্যাত্মিক সাধক মাওলানা খলিল আহমাদ সাহারানপুরি (রহ.) ছিলেন দেওবন্দি আন্দোলনের প্রথম প্রজন্মের অন্যতম প্রাণপুরুষ। তাঁর জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের সুবাস আজও সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে আছে।
১ ঘণ্টা আগে
রমজানে রোজা রাখা অবস্থায় টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করা নিয়ে অনেকের মনেই নানা সংশয় রয়েছে। কেউ মনে করেন ব্রাশ করলেই রোজা ভেঙে যায়, আবার কেউ মনে করেন এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামি শরিয়ত ও ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে এই বিষয়টি নিচে পরিষ্কারভাবে আলোচনা করা হলো।
৩ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
৭ ঘণ্টা আগে