Ajker Patrika

কোনো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে যে দোয়া পড়বেন

ইসলাম ডেস্ক 
কোনো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে যে দোয়া পড়বেন
কোনো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে যে এই দোয়া পড়তে হয়। ছবি: সংগৃহীত

আমরা প্রতিদিন চলার পথে, প্রযুক্তির পর্দায় কিংবা খবরের মাধ্যমে নানা রকম সুন্দর ও আকর্ষণীয় জিনিস দেখতে পাই। ঘরবাড়ি, গাড়ি, চমৎকার কোনো দৃশ্য, কারও মেধা, সুন্দর কোনো শিশু কিংবা মুসলিম ভাইয়ের ভালো কোনো সংবাদ দেখে মুগ্ধ হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। ইসলামে সব ধরনের হালাল ও বৈধ জিনিসের সৌন্দর্য উপভোগ করার অনুমতি রয়েছে, বরং হালাল জীবনযাপনে রয়েছে বিশেষ সওয়াব।

তবে কোনো সুন্দর বা কল্যাণময় কিছু দেখে কেবল মনে মনে বিমুগ্ধ হওয়াই শেষ কথা নয়, ইসলাম আমাদের সেখানে একটি বিশেষ দায়িত্ব শিখিয়েছে। কোনো ভালো কিছু দেখলে বা শুনলে সেই ব্যক্তি ও বস্তুর জন্য মনে কোনো হিংসা বা সংকীর্ণতা না রেখে কল্যাণ কামনা করা এবং বরকতের দোয়া করা সুন্নত।

বিমুগ্ধতার মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা

কোনো মুসলিম ভাইয়ের ভালো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে করণীয় কী, সে ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। হাদিস শরিফে এরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

‘যদি তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের কোনো কিছু দেখে বিমুগ্ধ হয়, সে যেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৫০৯; মুসনাদে আহমাদ: ২৫/৩৫৫)

বরকতের দোয়াটি কী

বিমুগ্ধতার মুহূর্তে আমরা আরবিতে এই সংক্ষিপ্ত ও অর্থবহ দোয়াটি পড়তে পারি:

اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهُ/اللَّهُمَّ بَارِكْ لَهَا

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা বারিক লাহু’ অথবা ‘আল্লাহুম্মা বারিক লাহা’। অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি তা বরকতময় করুন।

‘লাহু’ ও ‘লাহা’র ব্যবহার: আরবি ভাষার ব্যাকরণ ও ব্যবহারের নিয়ম অনুযায়ী নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে আলাদা শব্দ প্রযুক্ত হয়।

কোনো পুরুষবাচক বা পুরুষের কোনো কল্যাণময় জিনিস দেখে মুগ্ধ হলে বলতে হবে—‘আল্লাহুম্মা বারিক লাহু’।

কোনো নারীবাচক বা নারীর কোনো বিষয় দেখে মুগ্ধ হলে বলতে হবে—‘আল্লাহুম্মা বারিক লাহা’।

কেন এই দোয়া পড়বেন: বদনজর থেকে বাঁচার উপায়

সুন্দর কিছু দেখলে এই দোয়া পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘বদনজর’ বা দৃষ্টির অনিষ্টতা থেকে নিজের ভাইকে রক্ষা করা। এ বিষয়ে মানুষের মানসিক অবস্থা অনুযায়ী ইসলামি স্কলার বা ফকিহরা দুটি দিক উল্লেখ করেছেন:

১. যখন দোয়া করা ওয়াজিব (আবশ্যক):

অনেক সময় মানুষের অবচেতন মনের তীব্র মুগ্ধতা বা দৃষ্টির কারণে অন্য মানুষের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, যাকে শরিয়তের ভাষায় ‘বদনজর’ বলা হয়। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের তীব্র বিমুগ্ধতার কারণে আশঙ্কা করে যে, তার দৃষ্টির ফলে তার ভাই ক্ষতিগ্রস্ত বা বদনজরে আক্রান্ত হতে পারে, তবে তার ওপর বরকতের দোয়া করা ওয়াজিব বা আবশ্যক। কারণ, নিজের ভাইয়ের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা একজন মুসলিমের ওপর অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।

বিখ্যাত ইসলামি মনীষী আল্লামা ইবনে আবদুল বারর (রহ.) বলেন, রাসুল (সা.)-এর বাণী প্রমাণ করে যে, নজরদাতা যদি বরকতের দোয়া করে, তবে তার নজর আর ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু যখন ব্যক্তি বরকতের দোয়া করে না, তখনই নজর সীমা অতিক্রম করে ক্ষতি সাধন করে। তাই অনিষ্ট প্রতিহত করার জন্য তখন দোয়া করা ওয়াজিব। (আত-তামহিদ: ৬ / ২৪০-২৪১)। ইমাম কুরতুবি (রহ.) ও ইবনুল মুলাক্কিন (রহ.)-ও এই মতকে সমর্থন করেছেন।

হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘জাদুল মাআদ’-এ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) উল্লেখ করেছেন, সাহাবি আমের বিন রবিআ যখন অপর সাহাবি সাহল বিন হানিফকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বদনজরে আক্রান্ত করেছিলেন, তখন নবীজি (সা.) আমেরকে সতর্ক করে বলেছিলেন—তুমি কেন ‘আল্লাহুম্মা বারিক আলাইহি’ (হে আল্লাহ, তাকে বরকত দিন) বলে দোয়া করলে না?’

২. পারস্পরিক আন্তরিকতা ও অনুগ্রহ:

যদি ব্যক্তি নিজের নজরের মাধ্যমে ভাইয়ের ক্ষতি হওয়ার কোনো আশঙ্কা না-ও করে, তবু বরকতের দোয়া করা জরুরি। কারণ, এটি মুসলিম ভাইয়ের প্রতি আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও অনুগ্রহের বহিঃপ্রকাশ।

যতবার দেখা হবে, ততবারই কি বলতে হবে

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, একটি সুন্দর জিনিস যতবার দেখা হবে, ততবারই কি ‘আল্লাহুম্মা বারিক’ বলতে হবে? না বললে কি গুনাহ হবে?

এর উত্তর হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই নির্দেশ মূলত উৎসাহমূলক ও কল্যাণকামিতার প্রতীক। কোনো বস্তু প্রথমবার দেখে তীব্র মুগ্ধতা তৈরি হলে দোয়া করা আবশ্যক। তবে একই বস্তু বারবার দেখলে প্রতিবারই বলা বাধ্যতামূলক নয় এবং না বললে গুনাহগার হতে হবে না। তবে যতবারই অন্তরে মুগ্ধতা জাগবে, ততবার বলাই উত্তম।

পরের জন্য দোয়া করার আত্মিক উপকারিতা

আল্লাহ তাআলা প্রার্থনা বা দোয়া পছন্দকারী বান্দাকে ভালোবাসেন। আমরা যখন নিজের মনের সংকীর্ণতা দূর করে অন্যের নিয়ামত দেখে খুশি হই এবং তার জন্য দোয়া করি, তখন আল্লাহ আমাদের ওপরও রহমত নাজিল করেন।

হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:

কোনো মুসলিম ব্যক্তি যখন তার অপর মুসলিম ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে (তার কল্যাণের জন্য) বিশেষ মনে দোয়া করে, তখন সেই দোয়া কবুল হয়। সেখানে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকেন। যখনই ওই ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য দোয়া করে, তখন সেই ফেরেশতা বলেন—‘আমিন (হে আল্লাহ, কবুল করুন) এবং তোমার জন্যও অনুরূপ হোক’। (মিশকাতুল মাসাবিহ: ২২২৮)
Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত