Ajker Patrika

নবীজির বিরহে খেজুরগাছের কান্না

কাউসার লাবীব
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৫১
নবীজির বিরহে খেজুরগাছের কান্না

গল্পের শুরুটা আজ থেকে বহু বছর আগের, যখন মদিনা ছিল কেবলই এক স্বপ্নের নগরী। মক্কার বুকে যখন কাফেরদের অত্যাচার দিনের পর দিন বাড়ছিল, তখন প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জন্মভূমি ছেড়ে মদিনার পথে রওনা দিলেন। এ এক ঐতিহাসিক হিজরত, যা ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।

নবীজি (সা.) মদিনায় এসে প্রথম জুমার নামাজ আদায় করলেন বনি সালেম গোত্রের উপত্যকায়। সেই দিনটি ছিল উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য এক মহা পুরস্কারের দিন—আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে এসেছিল ‘জুমার নামাজ’। এরপর থেকে নবীজি (সা.) প্রতি শুক্রবার মসজিদে নববীতে জুমার খুতবা দিতেন। সেই খুতবা ছিল আত্মার খোরাক—যা মুমিনদের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দিত।

তবে একটি সমস্যা ছিল। নবীজি (সা.) যখন দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন, তখন তা দীর্ঘ হয়ে যেত। একটানা দাঁড়িয়ে থাকতে তাঁর কষ্ট হতো। এই কষ্ট লাঘবের জন্য সাহাবিরা একটি চমৎকার বুদ্ধি বের করলেন। তাঁরা খেজুরগাছের একটি মরা কাণ্ডকে খুঁড়ে মসজিদের এক কোণে পুঁতে দিলেন। নবীজি (সা.) খুতবার সময় সেই কাণ্ডের ওপর ভর দিয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিতে পারতেন। সেই থেকে কাণ্ডটি ধন্য হয়ে উঠল, কারণ প্রিয় নবীর পবিত্র হাতের স্পর্শ সে নিয়মিত পেত, তাঁর মুখ নিঃসৃত মধুর বাণী সে শুনতে পেত।

দিন দিন ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। মুসলমানের সংখ্যা বাড়ছিল দ্রুত গতিতে। জুমার নামাজের মুসল্লিদের সংখ্যাও প্রতিদিন বাড়তে লাগল। সময়ের ব্যবধানে একটি নতুন সমস্যা দেখা দিল। যেহেতু নবীজি (সা.) মাটিতে দাঁড়িয়ে খুতবা দিতেন, তাই পেছনের মুসল্লিরা তাঁর আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পেতেন না। তাঁরা তাঁদের প্রিয় নবীর মোবারক চেহারাও ভালোভাবে দেখতে পারতেন না।

এই পরিস্থিতি বিবেচনা করে সাহাবিরা একটি কাঠের তৈরি উঁচু মিম্বার প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই মিম্বারে দাঁড়িয়ে নবীজি (সা.) খুতবা দিলে পেছনের মুসল্লিদের আর শুনতে কষ্ট হবে না, এবং সবাই তাঁকে স্পষ্ট দেখতে পাবেন।

মিম্বার তৈরি হয়ে গেল। দেখতে বেশ সুন্দর। জুমার দিন। মসজিদের প্রতিটি কোণে মুসল্লিদের ভিড়। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে প্রিয় নবীজির খুতবা শোনার জন্য। নবীজি (সা.) মিম্বারের দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি যখন মিম্বারে দাঁড়ালেন, তখনই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মসজিদের এক কোণ থেকে এক শিশুর কান্নার মতো আওয়াজ ভেসে এল। উপস্থিত সবাই এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন, ‘কোথা থেকে আসছে এই কান্না? নামাজের সময় কে এমন করে কাঁদছে?’

নবীজি (সা.) কিন্তু বুঝতে পারলেন। তিনি জানতেন, এটি কোনো মানব শিশুর কান্নার আওয়াজ নয়। তিনি এক পা-দু পা করে মিম্বার থেকে নামলেন। এগিয়ে গেলেন সেই মরা খেজুরগাছের কাণ্ডের দিকে। যেই কাণ্ডে তিনি একসময় ভর দিয়ে খুতবা দিতেন।

নবীজি (সা.) কাণ্ডটিকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর পবিত্র হাতে স্পর্শ করতেই কান্না কিছুটা শান্ত হলো। কিন্তু সাহাবিরা অবাক, ‘কেন কাঁদছে এই প্রাণহীন খেজুরগাছ? আর আল্লাহর নবীই বা কেন একে জড়িয়ে ধরলেন?’

নবীজি (সা.) সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন তাঁদের বিস্ময়। তিনি বললেন, ‘এই কাণ্ডটি আমার বিচ্ছেদে কাঁদছে। এটি বুঝেছে—আমি যখন নতুন মিম্বারে দাঁড়াব, তখন সে আর আমার স্পর্শ পাবে না, আমার মধুর বাণী শুনতে পাবে না। অপ্রয়োজনীয় ভেবে তাকে হয়তো কোথাও ফেলে দেওয়া হবে।’

নবীজি (সা.) কাণ্ডটিকে সান্ত্বনা দিলেন, ঠিক যেমন একজন পিতা তাঁর সন্তানকে সান্ত্বনা দেন। এরপর তাঁর কান্না থামল। নবীজির নির্দেশ মতে, সেই কাণ্ডটিকে মসজিদের মিম্বারের পেছনের জায়গাটায় দাফন করা হলো। দূরে কোথাও ফেলে দেওয়া হলো না, বরং সযত্নে রাখা হলো। মসজিদে নববীতে এখন আমরা যে মিম্বারটি দেখতে পাই, এর নিচেই সেই কাণ্ডটির অবস্থান। ইতিহাসে এই কাণ্ডটিকে বলা হয় ‘উস্তুনে হান্নানা’, যার অর্থ ‘কান্নারত খুঁটি’।

নবী (সা.) বলেছিলেন, ‘আমি যদি একে জড়িয়ে ধরে শান্ত না করতাম, তাহলে এটি কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে কাঁদতে থাকত।’

তথ্যসূত্র: সহিহ্ বুখারি: ৯১৬

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ভারত থেকে চিরতরে ইসরায়েল চলে গেলেন বিশেষ গোত্রের ২৫০ জন

শূন্যে নামবে সেশনজট, অনেক কলেজে বন্ধ হতে পারে স্নাতক-স্নাতকোত্তর কোর্স

অধ্যক্ষকে জড়িয়ে আপত্তিকর কথা বলায় প্রথমে থাপ্পড় দেন প্রদর্শক

হস্তান্তরের আগেই ফাটল সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনে

নকল পা সংযোজন ও বিকৃত মুখে প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন মোজতবার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত