পাপের প্রতি ঝোঁক মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিগতভাবেই মানুষের অন্তরে পাপকাজের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন। মানুষ ভুল করে, গোনাহে জড়িয়ে পড়ে, এটিই মানবিক বাস্তবতা। কিন্তু মানুষের এই দুর্বলতার পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা নিজের পরিচয় দিয়েছেন অসীম দয়ালু ও পরম ক্ষমাশীল হিসেবে। তিনি মানুষের তওবা গ্রহণ ও বান্দাকে ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। কোনো ব্যক্তি যখন অনুতপ্ত হৃদয়ে তাঁর দরবারে ফিরে আসে, চোখের পানিতে নিজের অপরাধ ধুয়েমুছে পরিচ্ছন্ন হতে চায়, আল্লাহ তাআলা তখন আনন্দিত হন এবং ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত করে দেন।
দয়াময় প্রভুর আহ্বান
আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ক্ষমা করার অছিলা খোঁজেন। এ জন্যই তিনি বছরের কিছুদিন ও রাতকে বিশেষভাবে মর্যাদা ও ফজিলতপূর্ণ করেছেন, যাতে অল্প আমলের বিনিময়ে বান্দা পেতে পারে পাহাড়সম ক্ষমা ও মহান রবের অশেষ রহমত। এ ছাড়া প্রতিদিন শেষ রাতে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটতম আসমানে অবতরণ করে ডাকতে থাকেন, ‘কে আছে ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করব। কে আছে বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে মুক্তি দেব। কে আছে রিজিকের অন্বেষী? আমি তার রিজিক বাড়িয়ে দেব।’ (সহিহ বুখারি: ১১৪৫)
ক্ষমা লাভের এমনই এক সুবর্ণ সুযোগ হলো শাবান মাস। এই মাস রমজানের প্রস্তুতিমঞ্চ, ইবাদতের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করার মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং এতে বরকতের দোয়া করতেন। হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রজব ও শাবান মাসে নবীজি (সা.) এই দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাদের রজব ও শাবানে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ (মুজামুল আওসাত: ৩৯৩৯)
শবে বরাত কী ও কেন?
শাবান মাসের ১৫তম রাত আমাদের কাছে ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত। ‘শব’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ রাত। ‘বরাত’ শব্দটি আরবি ও ফারসি উভয় ভাষায় ব্যবহৃত হয়। আরবিতে ‘বারাআত’ অর্থ মুক্তি, আর ফারসিতে বরাত অর্থ ভাগ্য। সে হিসেবে শবে বরাতকে বলা হয় মুক্তির রজনী বা ভাগ্যরজনী। তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা জরুরি—‘শবে বরাত’ শব্দটি কোরআন ও হাদিসের পরিভাষা নয়। হাদিসে একে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ অর্থাৎ শাবানের মধ্যরাত। পরবর্তী সময়ে এ রাতের ফজিলতকে কেন্দ্র করেই ‘শবে বরাত’ নামটি প্রচলিত হয়েছে।
শবে বরাতের ফজিলত
এই রাতের গুরুত্ব ও মর্যাদা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধশাবানের রাতে সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)
অন্য হাদিসে হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যখন অর্ধশাবানের রাত আসে, তখন তোমরা রাতে ইবাদত করো এবং দিনে রোজা রাখো। এই দিনে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করে বলেন, ‘কে আছে ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করব। কে আছে রিজিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিজিক দেব। কে আছে বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে বিপদ থেকে মুক্তি দেব।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৮৮)। আল্লাহ তাআলার এই ঘোষণা ভোর পর্যন্ত চলতে থাকে। কাজেই এই রাত হওয়া উচিত তওবা, ইস্তিগফার, কান্নাকাটি ও দোয়ার রাত। নিজের গোনাহ স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে লুটিয়ে পড়ার রাত।
শবে বরাতে নবীজি (সা.)-এর আমল
রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম (রা.) মূলত প্রতিটি রাতই নফল ইবাদতে কাটাতেন। নবীজি (সা.) রাতের ইবাদতের প্রতি উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা সালামের প্রচলন করো, মানুষকে খাবার খাওয়াও এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ আদায় করো, তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সহিহুত তারগিব: ৯৫৯)। এ কারণে শাবানের এই রাতের ইবাদতও ছিল মূলত নির্জন, নিভৃত ও লোকচক্ষুর আড়ালে। এ জন্য সাহাবিদের ব্যাপক আমলের বিবরণ খুব বেশি হাদিসে আসেনি। তবে একেবারেই যে নেই, তা কিন্তু নয়। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক রাতে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বিছানায় না পেয়ে খুঁজতে বের হন এবং জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে তাঁকে খুঁজে পান। নবীজি (সা.) তখন বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অর্ধশাবানের রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের বকরির পশমের সংখ্যার চেয়ে বেশি গোনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (জামে তিরমিজি: ৭৩৯)
এসব বর্ণনার আলোকে প্রতিজন মুমিনের কর্তব্য হলো, এই রাতে একান্তে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়া, লোক দেখানো ইবাদত পরিহার করা এবং বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে ক্ষমাপ্রার্থনা করা। তবে ইবাদতের নামে বাড়াবাড়ি কিংবা শোরগোল এ রাতের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।
আমাদের সমাজে শবে বরাত উপলক্ষে হালুয়া-রুটি তৈরি ও বিতরণের একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে। এটি আমাদের ইবাদতের অংশে পরিণত হয়েছে! হালুয়া-রুটি খাওয়া কিংবা গরিব-মিসকিনদের খাওয়ানো নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ। তবে নির্দিষ্ট এই রাতেই এটি করতে হবে, এমন বিশ্বাস শরিয়তসম্মত নয়। এ ধরনের ধারণাকে বহু মুহাক্কিক আলেম বিদআতের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন।
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে নিন্দনীয় কাজগুলোর একটি হলো পটকা ফোটানো ও আতশবাজি। এতে যেমন অর্থের অপচয় হয়, তেমনি মানুষ এবং পরিবেশেরও ক্ষতি হয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে এসব কাজ নিষিদ্ধ ও হারাম।
শবে বরাত হোক আত্মশুদ্ধির রাত, ক্ষমা ও করুণার আশায় আল্লাহর দরবারে ফিরে যাওয়ার রাত, শোরগোল, অপচয় ও বিদআতমুক্ত পবিত্র রজনী।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

সুরা কাফিরুন কোরআনের ৩০তম পারায় অবস্থিত। সুরাটি মক্কায় নাজিল হয়েছে, তাই এটি মাক্কি সুরা হিসেবে পরিচিত। ফজিলতের দিক থেকে এ সুরা পাঠ করলে কোরআনের এক-চতুর্থাংশ তিলাওয়াতের সমান সওয়াব পাওয়া যায়।
৬ ঘণ্টা আগে
সুরা নাসর (سورة النصر) পবিত্র কোরআনের ১১০ তম সুরা। এটি পবিত্র মদিনায় অবতীর্ণ হওয়া সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সুরা। মাত্র ৩টি আয়াতের এই ছোট সুরাটিতে ইসলামি মিশনের পূর্ণতা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইহকাল ত্যাগের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। একে ‘সুরা তাওদি’ বা বিদায়ের সুরা নামেও অভিহিত করা হয়।
৬ ঘণ্টা আগে
ইসলামি শরিয়তে সহবাসের পর গোসল করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা—যেমন: এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। তবে নিয়ম হলো, পরবর্তী ওয়াক্তের নামাজ কাজা হওয়ার আগেই গোসল করে পবিত্র হওয়া ফরজ। নবী করিম (সা.) এবং সালফে সালেহিনের আমল অনুযায়ী, যত দ্রুত সম্ভব ফরজ গোসল করে নেওয়াটাই সুন্নাহ...
৯ ঘণ্টা আগে
শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত হলো পবিত্র শবে বরাত। রাতটি শাবান মাসের মধ্যবর্তী হিসেবে হাদিসে এই রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ তথা অর্ধশাবানের রাত বলা হয়েছে। ফারসি ভাষায় শব অর্থ রাত এবং বরাত অর্থ মুক্তি। সমন্বিত অর্থ মুক্তির রাত। এই রাতে মহান আল্লাহ মুক্তি ও মাগফিরাতের দুয়ার খুলে দেন।
৯ ঘণ্টা আগে