নেতৃত্ব মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলাম নেতৃত্বকে শুধু ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব হিসেবে দেখে না, একে আমানত ও দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। শাসক তার প্রজা সাধারণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।’ (সহিহ বুখারি: ৮৯৩)
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে একজন আদর্শ শাসকের যে গুণাবলি থাকা প্রয়োজন, তার কয়েকটি হলো—
১. তাকওয়া: নেতৃত্বের সবচেয়ে মৌলিক গুণ হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। একজন নেতার হৃদয়ে আল্লাহর ভয় থাকা অপরিহার্য। তাকওয়াই নেতাকে অন্যায়, জুলুম ও দুর্নীতি থেকে বিরত রাখে। তাকওয়ার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা একে অপরকে সহযোগিতা করতে বলেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অন্যের সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা মায়েদা: ২)। যার মধ্যে তাকওয়া ও আল্লাহভীতি নেই, সে সঠিক পন্থায় নেতৃত্ব দেওয়ার উপযুক্ত নয়।
২. চারিত্রিক নৈতিকতা: নেতার চরিত্র হতে হবে নির্মল ও উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন। তিনি যা বলবেন, নির্বাচিত হওয়ার পর তা বাস্তবায়ন করবেন। মানুষকে যা শেখাবেন, নিজে তার ওপর আমল করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চারিত্রিক মাধুর্য প্রতিটা নেতৃত্বের জন্য অনুকরণীয়। মিথ্যা, গিবত, চোগলখোরী, লোভ-লালসা থেকে নেতাকে মুক্ত থাকতে হবে। চরিত্রবান নেতা মানুষের হৃদয় জয় করে সবার অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারেন।
৩. ন্যায়বিচার ও সততা: ইসলামের দৃষ্টিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা একজন নেতার প্রধানতম দায়িত্ব। সবার সঙ্গে সমান আচরণ করা একজন নেতার অবশ্যকর্তব্য। ধনী-গরিব, আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সমাজ ও রাষ্ট্র ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এই কারণে যে তাদের সম্মানিত ব্যক্তিরা চুরি করলে তারা তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত।’ (সহিহ বুখারি: ৬৭৮৮)
৪. বিনয় ও নম্রতা: নেতৃত্বের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো বিনয় ও নম্রতা। অহংকার ও দম্ভ নেতার জন্য ক্ষতিকর। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, তবু তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। তিনি শ্রেণি-বর্ণনির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসতেন, তাদের সমস্যা শুনতেন এবং সাহায্য করতেন। হজরত ওমর (রা.) খলিফা হওয়ার পরও নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন এবং বাজার থেকে নিজেই খাবার কিনে আনতেন।
৫. জ্ঞান ও প্রজ্ঞা: নেতৃত্বের জন্য জ্ঞান অপরিহার্য। একজন নেতাকে শরিয়তের জ্ঞান, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জ্ঞান এবং সমকালীন যাবতীয় বিষয়ে সচেতন হওয়া অপরিহার্য। নেতার জ্ঞানের অভাব জনগণকে বিপদে ফেলতে পারে। জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান নেতা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
৬. পরামর্শ গ্রহণের মানসিকতা: ইসলাম পরামর্শকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আর তুমি কাজকর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করো।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৫৯)। রাসুলুল্লাহ (সা.) নবী হওয়া সত্ত্বেও সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা বাস্তবায়ন সহজ হয় এবং ভুল হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। একজন নেতাকে তাই জ্ঞানীদের সঙ্গে পরামর্শ করার মনমানসিকতা রাখতে হবে।
৭. দায়িত্বশীল মনোভাব: নেতা তার অধীনদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতে বাধ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার উম্মতের যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে, কিন্তু নিজের জন্য যে আন্তরিকতা, সদিচ্ছা ও পরিশ্রম দেখায়, তা যদি জনগণের কল্যাণে না দেখায়, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’ (তারিখে বাগদাদ: ৯ / ৪৯৩)। নেতা জনগণের সেবক, তাদের প্রভু নয়। তিনি জনগণের অধিকার সংরক্ষণ, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং কল্যাণ নিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ।
৮. ধৈর্য ও সহনশীলতা: নেতৃত্বের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়। তাই নেতৃত্বের জন্য ধৈর্য ও সহনশীলতার গুণ অপরিহার্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) নানা কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেছেন, কিন্তু ধৈর্য ও সহনশীলতার পথ থেকে বিচ্যুত হননি। তবে সহনশীলতার মানে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা নয়। সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকেই সকল দল ও মতের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করতে হবে।
৯. অপরিসীম সাহসিকতা: নেতার জন্য সাহসী হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সত্য কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাহস থাকতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অপরিসীম সাহসী মনোবলসম্পন্ন। বদর, উহুদ, খন্দকসহ নানা যুদ্ধে তিনি অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নবীজির তিরোধানের পর আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-ও মুরতাদদের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করেছেন। সাহসী নেতৃত্ব জনগণকে অনেক বিপদাপদ থেকে রক্ষা করে।
১০. ক্ষমা ও উদারতা: ক্ষমা ও উদারতা মহত্ত্বের পরিচায়ক। রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন যারা তাকে নির্যাতন করেছিল, তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। ক্ষমা সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করে। সংকীর্ণমনা কারও নেতৃত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রে কল্যাণ বয়ে আনে না। কল্যাণকর রাষ্ট্র পেতে ক্ষমাশীল ব্যক্তির নেতৃত্ব অপরিহার্য।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদীন বা পথপ্রাপ্ত চার খলিফার অবদান অপরিসীম। তাঁরা ছিলেন ইসলামের স্তম্ভ। তাঁদের জীবন থেকে আমরা সততা, ন্যায়বিচার এবং সাহসিকতার শিক্ষা পাই।
১ ঘণ্টা আগে
একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
৮ ঘণ্টা আগে
তাকাসুর শব্দের অর্থ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা বা অহংকার। মক্কার দুটি গোত্র (বনি আবদে মানাফ ও বনি সাহাম) নিজেদের সংখ্যাধিক্য ও আভিজাত্য নিয়ে গর্ব করতে করতে একপর্যায়ে কবরস্থানে গিয়ে মৃত ব্যক্তিদের নিয়ে বড়াই শুরু করে। এই হীন মানসিকতা ও আখিরাত ভুলে দুনিয়া নিয়ে মত্ত থাকার পরিণামেই এই সুরা নাজিল হয়।
১১ ঘণ্টা আগে
প্রতিবছরের ন্যায় রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের বার্তা নিয়ে আমাদের দ্বারে আবারও কড়া নাড়ছে পবিত্র মাহে রমজান। এটি মূলত সওয়াব অর্জন, আত্মিক পূর্ণতা এবং নেক আমলের মাস। এ মাসের প্রতিটি আমলের সওয়াব অন্য মাসের তুলনায় বহুগুণ বেশি। তাই একজন সাধারণ মুমিনের মনেও এই আকাঙ্ক্ষা জাগে, কীভাবে মাসটিকে ইবাদতের মাধ্যমে
১ দিন আগে