Ajker Patrika

গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণার পরও ১০ জনকে হত্যা করল ইসরায়েল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯: ০৯
গাজার শাতি শরণার্থীশিবিরে ধ্বংসস্তূপের মাঝে হেঁটে যাচ্ছে শিশুরা। ছবি: এএফপি
গাজার শাতি শরণার্থীশিবিরে ধ্বংসস্তূপের মাঝে হেঁটে যাচ্ছে শিশুরা। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা অনুযায়ী গাজা সংঘাত নিরসনে হামাসের সঙ্গে ২০ দফার যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের অগ্রগতির মধ্যেই গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। স্থানীয় সময় গত বুধবার মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ দ্বিতীয় ধাপের যুদ্ধবিরতি শুরুর ঘোষণা দেন।

ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা নিউজের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে আল-হাওলি এবং আল-জারু পরিবারের দুটি বাড়িতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বোমা হামলা চালায়। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এই হামলায় নিহত ছয়জনের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরও রয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের একজন মুহাম্মদ আল-হাওলি ইজ্জুদ্দিন আল-কাসাম ব্রিগেডের (হামাসের সশস্ত্র শাখা) কমান্ডার ছিলেন।

গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার ইব্রাহিম আল-খলিলি নিশ্চিত করেছেন, কাসাম ব্রিগেডের একজন ‘শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব’ নিহত হয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই হামলাটি এই বার্তাই দিচ্ছে যে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায়কে ‘তাদের নিজস্ব শর্তে’ সংজ্ঞায়িত করতে চায়।

তিনি বলেন, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির পরবর্তী পর্যায়ের শর্ত নির্ধারণ করেছে, যেখানে একটি আন্তর্জাতিক ‘বোর্ড অব পিসের’ তত্ত্বাবধানে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে ইসরায়েলের কাছে ’হামলা জোরদার করার’ বিকল্প সুযোগটি বহাল থাকছে।

অবরুদ্ধ গাজার অন্যান্য স্থানেও হামলা অব্যাহত ছিল। রাফাহ শহরের পশ্চিমে আল-আলম চত্বরের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। গাজা সিটির দক্ষিণ-পশ্চিমে আল-নাবলুসি জংশনের কাছে একটি পুলিশ পোস্টে ইসরায়েলি হামলায় আরেকজন এবং মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে আল-খাতিব পরিবারের বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন।

আল-হাওলি পরিবারের বাসভবনে হামলাকে একটি ‘জঘন্য অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করে এর নিন্দা জানিয়েছে হামাস। তারা বলেছে, এই হামলা অক্টোবর মাসের যুদ্ধবিরতির প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘অবজ্ঞা’ প্রকাশ করে। তবে হামাস তাদের কোনো কমান্ডারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১০০ জনের বেশি শিশুসহ অন্তত ৪৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েল গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে তাদের সৈন্যরা একটি অনির্দিষ্ট ‘হলুদ রেখা’র পেছনে অবস্থান করছে। একই সময়ে তিনজন ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বুধবার এক্সে এক পোস্টে ঘোষণা করেছেন, সংঘাত বন্ধে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে। এটি এখন ‘যদ্ধবিরতি থেকে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট শাসন এবং পুনর্গঠনের’ দিকে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, পরবর্তী ধাপের লক্ষ্য হলো ‘গাজার পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ এবং পুনর্গঠন, বিশেষ করে সকল অননুমোদিত কর্মীদের নিরস্ত্রীকরণ।’ এটি মূলত হামাসের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, যারা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

এই পরিকল্পনায় গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যাচাইকৃত ফিলিস্তিনি পুলিশ ইউনিটকে প্রশিক্ষণ দিতে একটি ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ মোতায়েনের আহ্বান জানানো হয়েছে। ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ নামক ১৫ সদস্যের একটি টেকনোক্র্যাট কমিটি গাজার দৈনন্দিন শাসন পরিচালনা করবে। তবে গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহারসহ বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাবেক উপমন্ত্রী আলী শাথকে এই কমিটির নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মিসরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, কমিটিটি এখন গাজায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে মিসরে বৈঠক করছে।

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আলী শাথ বলেছেন, এই কমিটি অস্ত্রের পরিবর্তে ‘মেধার’ ওপর নির্ভর করবে এবং কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করবে না। হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা বাসেম নাইম বৃহস্পতিবার এই কমিটি গঠনকে স্বাগত জানিয়েছেন। একে ‘সঠিক দিশায় একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীটি গাজার প্রশাসন হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি সুসংহত করতে, যুদ্ধে ফিরে আসা রোধ করতে, ভয়াবহ মানবিক সংকট মোকাবিলা করতে এবং ব্যাপক পুনর্গঠনের প্রস্তুতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এখন বল মধ্যস্থতাকারী, মার্কিন গ্যারান্টর এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোর্টে, যাতে তারা এই কমিটিকে ক্ষমতায়ন করে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ মাঠপর্যায়ে বুলগেরিয়ার কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ নিকোলে ম্লাদেনভের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগতভাবে মনোনীত সম্ভাব্য ‘বোর্ড অব পিস’ সদস্যদের কাছে বুধবার আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত