Ajker Patrika

৪০ লাখ কোটি ডলার ঋণের কে কত পায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ২০: ১২
৪০ লাখ কোটি ডলার ঋণের কে কত পায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে
প্রতীকী ছবি। ছবি: সংগৃহীত

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার (৪০ লাখ কোটি ডলার) ছাড়িয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির এই ঋণ নতুন এক রেকর্ড গড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দ্রুত বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ, উচ্চ ব্যয়, কর কমানো এবং সুদের বোঝা—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর সরকারি ব্যয় কমানো ও দক্ষতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সি (ডিওজিই) কয়েক লাখ ফেডারেল চাকরি কমিয়েছে এবং বৈদেশিক সহায়তাও সংকুচিত করেছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও সরকারি ঋণের গতি থামেনি।

কত দ্রুত বাড়ছে ঋণ

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বৃদ্ধির গতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় মোট ঋণ ছিল প্রায় ১৯ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার। মাত্র নয় বছরে তা দ্বিগুণ হয়ে ৪০ ট্রিলিয়নে পৌঁছেছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ঋণ বেড়েছিল ৭ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই ছিল কোভিড-১৯ মহামারির সময় অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও জরুরি ব্যয়ের কারণে। ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর মাত্র দেড় বছরেরও কম সময়ে আরও ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ যোগ হয়েছে।

অন্যদিকে, জো বাইডেনের ২০২১–২০২৫ মেয়াদেও সরকার ব্যাপক ঋণ নিয়ে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে ব্যয় করেছিল। ওই সময়ে ঋণ বেড়েছিল প্রায় ৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ মাসেরও কম সময়ে আরও ১ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ যুক্ত হয়েছে।

কেন এত ঋণ হচ্ছে

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান ঋণ সংকটের পেছনে তিনটি বড় কারণ রয়েছে।

প্রথমত, বড় বড় জাতীয় সংকট। ২০০৭–০৯ সালের বৈশ্বিক মন্দা এবং ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করতে হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান। যুক্তরাষ্ট্র বছরে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এর প্রায় ৬০ শতাংশ চলে যায় সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, মেডিকেয়ার, মেডিকেইড এবং প্রবীণ সেনাসদস্যদের সেবায়।

কিন্তু কর আদায় সেই ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। উদাহরণ হিসেবে জুলাই মাসে সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে আয় করেছে ৩৩৪ বিলিয়ন ডলার, অথচ একই সময়ে ব্যয় করেছে ৭৬৬ বিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ আয়ের প্রায় দ্বিগুণ।

তৃতীয় কারণ হলো সুদের হার বৃদ্ধি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ানোর ফলে এখন ঋণের সুদ পরিশোধেই বছরে প্রায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এই অঙ্কটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয়েরও বেশি।

ট্রাম্পের করনীতি কতটা ভূমিকা রেখেছে

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কর কমানো। ২০১৭ সালের ট্যাক্স কাটস অ্যান্ড জবস অ্যাক্টের মাধ্যমে করপোরেট করের হার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২১ শতাংশ করা হয়।

পরে ২০২৫ সালে তাঁর ‘ওয়ান বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ সেই করছাড়কে স্থায়ী রূপ দেয়। একই সঙ্গে মেডিকেইড ব্যয় কমানো হলেও সরকারকে আরও প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার সুযোগ দিতে ঋণসীমা বাড়ানো হয়।

বর্তমানে ফেডারেল সরকারের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে ব্যক্তিগত আয়কর থেকে, কিন্তু করপোরেট করের অবদান মাত্র ৯ শতাংশের মতো।

যুক্তরাষ্ট্র কার কাছে ঋণী

৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ বা ৩২ ট্রিলিয়ন ডলার সরকার ধার নিয়েছে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।

দেশীয় ঋণদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কয়েকটি হলো—

মিউচুয়াল ফান্ড: ৫.২ ট্রিলিয়ন ডলার

ফেডারেল রিজার্ভ: ৪.৫ ট্রিলিয়ন ডলার

বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান: ২ ট্রিলিয়নের বেশি

অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকার: ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার

পেনশন তহবিল ও অন্যান্য ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান: কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার

বিদেশি ঋণদাতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো জাপান, যার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের দেনা প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য (৮৮৯ বিলিয়ন ডলার) এবং চীন (৬৮৩ বিলিয়ন ডলার)। এ ছাড়া আরও ৩০টির বেশি দেশ ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর কাছ থেকেও যুক্তরাষ্ট্র ঋণ নিয়েছে।

অবশিষ্ট প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার সরকারের নিজস্ব বিভিন্ন তহবিলের অভ্যন্তরীণ দেনা, যা সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে।

কেন এটি বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ বাড়তে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। কর বাড়ানো, সরকারি ব্যয় কমানো কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কাটছাঁটের মতো পদক্ষেপ সামনে আসতে পারে।

অতিরিক্ত ঋণের আরেকটি ঝুঁকি হলো বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়া। দীর্ঘমেয়াদে এর বোঝা বহন করতে হবে আগামী প্রজন্মকেও।

কমিটি ফর এ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের সভাপতি মায়া ম্যাকগিনিয়াস বলেন, ‘৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ শুধু সরকারের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পকেটেও গিয়ে পড়ে।’

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। ফলে ওয়াশিংটনে ঋণসংকট গভীর হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজার, সুদের হার, জ্বালানি মূল্য এবং বিশ্বের প্রায় সব বড় অর্থনীতিতেই পড়তে পারে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত