Ajker Patrika

‘পারমাণবিক ধুলো’ ফেরত দিতে সম্মত ইরান: ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০: ০১
‘পারমাণবিক ধুলো’ ফেরত দিতে সম্মত ইরান: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, গত বছর প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন বিমান হামলায় মাটিচাপা পড়া ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট বা পারমাণবিক ধুলো’ হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে ইরান। তাঁর এই দাবি যদি সঠিক হয়, তবে তা তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা কমিয়ে আনার মার্কিন প্রচেষ্টায় একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, তবে আগামী মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আমেরিকান এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সাথে আলোচনায় ইরান আসলেই এই ছাড় দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। ইরানের পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে ট্রাম্পের আগের দাবিগুলো অনেক সময় ভুল প্রমাণিত হয়েছে বা ভেস্তে গেছে।

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, গত বছরের জুনে তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মাটির গভীরে চাপা পড়ে আছে। ট্রাম্প এই ইউরেনিয়ামকেই ‘পারমাণবিক ধুলো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। ইরানের হাতে এই উপাদানের অস্তিত্ব ট্রাম্প প্রশাসন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনার প্রধান কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এটি উদ্বেগের বিষয়, কারণ এই উপাদান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে।

যুদ্ধবিরতির আগে ট্রাম্প মার্কিন সামরিক বাহিনীকে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল রেইড (অভিযান) পরিচালনার পরিকল্পনা করতে বলেছিলেন, যাতে ইরানের অনুমতি ছাড়াই সেখানে ঢুকে তেজস্ক্রিয় উপাদানগুলো উদ্ধার করা যায়।

হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে মেরিন ওয়ান হেলিকপ্টারের দিকে যাওয়ার সময় গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র নেই এবং তারা সেই অবস্থাতেই থাকতে রাজি হয়েছে। তারা খুব ব্যাপকভাবে এতে একমত হয়েছে। আমাদের বি-২ বোমারু বিমানের হামলার কারণে মাটির গভীরে চলে যাওয়া পারমাণবিক ধুলো তারা আমাদের ফেরত দিতে রাজি হয়েছে। তাই ইরানের সাথে আমাদের অনেক বিষয়ে মিল হচ্ছে এবং আমি মনে করি খুব ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’

গত সপ্তাহে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসলামাবাদে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় বসলেও কোনো চুক্তি ছাড়াই ফিরে আসেন। তবে দুই পক্ষই একে অপরের কাছে বার্তা পাঠানো অব্যাহত রেখেছে।

ইরান দীর্ঘকাল ধরে বলে আসছে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র চায় না, তাই তারা অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন নতুন প্রতিশ্রুতি খুব বড় কোনো অগ্রগতি নাও হতে পারে। তবে বিদ্যমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা একটি বড় ছাড় হবে; যদিও তেহরান যদি নতুন করে সমৃদ্ধ করার সক্ষমতা ধরে রাখে তবে এই ছাড়ের গুরুত্ব সীমিত হতে পারে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বিশ্বাস, গত গ্রীষ্মের বিমান হামলায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনেক সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয়েছে, তবে ইরানের কাছে আরও সেন্ট্রিফিউজ আছে বলে ধারণা করা হয়।

ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা সীমিত করা ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের চুক্তিতে ইরান ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত ৩০০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম রাখার শর্তে রাজি হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইরান ২০২১ সালে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণের ঘোষণা দেয়।

ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান একটি চুক্তি করতে চায় এবং আমরা তাদের সাথে খুব ভালোভাবে ডিল করছি। দুই মাস আগে তারা যা করতে রাজি ছিল না, আজ তা করতে চাইছে।’ তিনি আরও জানান, সম্ভবত এই সপ্তাহান্তেই সশরীরে আলোচনার আরেকটি রাউন্ড শুরু হবে এবং ইরানের নতুন নেতৃত্বকে তিনি ‘যথেষ্ট যুক্তিবাদী’ বলে অভিহিত করেন।

গত সপ্তাহে ভ্যান্স ইরানের সামনে ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যদিও ট্রাম্প পরে জানান তিনি এই মেয়াদের বিরোধী। ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের কাছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বিবৃতি আছে যে ২০ বছরের বেশি সময় পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’

তবে অতীতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করা কর্মকর্তারা সামরিক শক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক হুমকি দূর করার বিষয়ে সন্দিহান। তাদের মতে, কূটনৈতিক পথই সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ ‘পারমাণবিক ধুলো’ উদ্ধারের সামরিক অভিযানে কয়েক হাজার মার্কিন সেনাকে আকাশপথে ইরানে পাঠাতে হবে, যারা কয়েক সপ্তাহ ধরে শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশে অভিযান চালাবে।

ইরান ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে রাজি হলে এ ধরনের অভিযানের চাপ কমে যাবে। এর আগে ইরান ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে তারা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে নিম্ন স্তরে ‘মিশ্রিত’ করতে পারে।

একই দিনে ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েল ও লেবানন ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। পেন্টাগনে কথা বলার সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানকে সরাসরি সতর্ক করে বলেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনী যখন বিধ্বস্ত, তখন যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়েও বেশি শক্তি নিয়ে ‘রিলোড’ করছে। চুক্তি না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামোতে’ হামলার জন্য তারা প্রস্তুত।

হেগসেথ আরও বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী যে অবরোধ কার্যকর করছে তা হলো ‘ভদ্রোচিত উপায়’, যেখানে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানগুলো ইরানের বন্দরে জাহাজ আসা-যাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, অবরোধের মুখে ১৩টি জাহাজ ইরানে ফিরে গেছে এবং কোনোটিই তা ভেদ করতে পারেনি।

গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন আলোচনা মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কতদিন বন্ধ থাকবে—সেই প্রশ্নে ভেস্তে যায়। তবে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই পক্ষ এখনও বার্তা বিনিময় করছে এবং পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।

শান্তি আলোচনার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত বুধবার তেহরান সফর করেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফরে বেরিয়েছেন। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি ছাড়াও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশ এখনও অনড় অবস্থানে রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত