Ajker Patrika

সিলিকন ভ্যালিতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ: ‘গোপন তালিকায়’ শতাধিক নাম

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩: ০৮
সিলিকন ভ্যালিতে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ: ‘গোপন তালিকায়’ শতাধিক নাম
যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে যৌন নিপীড়নের এক গোপন তালিকায় শতাধিক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি হাব বলে পরিচিত সিলিকন ভ্যালিতে যৌন নিপীড়নকারীদের নামের কথিত এক গোপন স্প্রেডশিটে ‘শতাধিক’ ব্যক্তির নাম রয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট। একাধিক সূত্রের বরাতে তারা জানিয়েছে, তালিকায় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্প্রেডশিটটি সিলিকন ভ্যালির নারীদের একটি অনানুষ্ঠানিক ‘হুইসপার নেটওয়ার্ক’-এর অংশ। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নারীরা কথিত যৌন অসদাচরণ সম্পর্কে একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেন। তালিকায় থাকা অভিযোগের মধ্যে কাউকে নেশাজাতীয় কিছু খাওয়ানো, যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

২০-এর কোঠায় থাকা এক প্রযুক্তিকর্মী বলেন, তালিকাটি প্রথম দেখার পর তিনি বিস্মিত হন। পরে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন নারীর সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনিও নিজের কথিত যৌন অসদাচরণের অভিজ্ঞতা সেখানে যুক্ত করেন। তাঁর ভাষ্য, তালিকায় ‘বিখ্যাত বিনিয়োগকারী’ এবং পরিচিত ব্যবসায়ীদের নাম ছিল, যাদের তিনি আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখেছেন। তিনি বলেন, চারপাশে খোঁজখবর নেওয়ার পরই তিনি জানতে পারেন যে এমন একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং সেখানে ‘শত শত’ ঘটনার বিবরণ রয়েছে।

ওই নারী জানান, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ বা প্রকাশ্যে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে অনেক নারী ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করেন। নিজের ক্ষেত্রে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, অভিযোগ করে ব্যর্থ হলে সিলিকন ভ্যালির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কথিত যৌন অসদাচরণের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে তথাকথিত ‘হ্যাকার হাউসে।’ এসব আবাসিক কমিউনিটিতে তরুণ উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তিকর্মীরা একই সঙ্গে বসবাস, সামাজিক যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। ফলে একই ব্যক্তি কারও সহবাসী বা পার্টির পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক অংশীদার, বিনিয়োগকারী, সহকর্মী কিংবা ভবিষ্যৎ চাকরির সুযোগের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন।

সিলিকন ভ্যালির এক অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি অভিযোগ করেন, কিছু ক্ষেত্রে বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করার পর ব্যক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম করা হয়েছে। তাঁর দাবি, কিছু পুরুষ ইচ্ছাকৃতভাবে অপেক্ষাকৃত বিচ্ছিন্ন বা দুর্বল অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্য করেন। এর মধ্যে তরুণ নারী এবং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বা সিলিকন ভ্যালিতে আসা ব্যক্তিরাও রয়েছেন। তবে ওই সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত অপরাধী ও ভুক্তভোগী কোনো একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

জিটি (Zette) অ্যাপের প্রতিষ্ঠাতা ইয়েহং ঝু সান ফ্রান্সিসকোর জেনেসিস হ্যাকার হাউসের সাবেক এক সদস্যের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশ্যে এনেছেন। ঝু ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, অভিযোগের পর ওই ব্যক্তি পালিয়ে যান এবং এখনও তাঁকে খুঁজে পাওয়া বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি তাদের অভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের বৃত্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন বলে ঝু জানান। তিনি বলেন, তিনি ওই ব্যক্তিকে বারবার না বলেছিলেন।

তাঁর ভাষ্য, ধর্ষণের পর তাঁর এক নারী বন্ধু অভিযোগটি ওই ব্যক্তির সুনামের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ঝু আরও বলেন, ওই ব্যক্তিকে হাউস থেকে বের করে দেওয়ার জন্য তিনি উদ্যোগ নেওয়ার সময় একজন সংগঠক তাকে পুলিশের কাছে না গিয়ে একটি কমিটি গঠন এবং ভোটের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেন।

পরে ঝু পুলিশ ও আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ওই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার জন্য তার পরিচিতদের সঙ্গেও কথা বলেন। তবে তাঁর দাবি, কয়েকজন এতে জড়াতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের একজনের বক্তব্য ছিল, ‘আমরা একসঙ্গে বিনিয়োগ করেছি। আমরা একসঙ্গে ব্যবসা করেছি।’

বেভারলি হিলসের উদ্যোক্তা কমিউনিটি লাঞ্চ হাউসের এক সাবেক বাসিন্দা জানান, একটি অনুষ্ঠানে তিনি সন্দেহ করেছিলেন যে তাঁকে নেশাজাতীয় কিছু খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নারী বলেন, রাতের কিছু অংশ তাঁর মনে ছিল না। পরে জানতে পারেন, এক ‘বন্ধু’ তাঁকে বিছানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি একই সময়ে ঠান্ডা অনুভব করছিলেন ও ঘামছিলেন, প্রায় ফ্লুর মতো লাগছিল এবং রোদে বাইরে থাকার সময় তিনি নড়াচড়া করতে পারছিলেন না।

পরে আরও কয়েকজন নারী তাঁকে জানান, একই ব্যক্তি তাদের অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেছিলেন বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেছিলেন বলে তারা মনে করেন। ওই নারীরা একসঙ্গে লাঞ্চ হাউসের প্রতিষ্ঠাতাদের কাছে বিষয়টি জানান। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠাতারা ওই ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে হাউস থেকে বের করে দেন, তালা পরিবর্তন করেন এবং পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহায়তার প্রস্তাব দেন।

তবে ওই নারী নিজে পুলিশে অভিযোগ করেননি। কারণ, কী ঘটেছিল তার অনেকটাই তিনি মনে করতে পারছিলেন না এবং সাক্ষীদের মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেননি। তিনি বলেন, এরপরও তিনি লাঞ্চ হাউসে থেকে যান এবং সেখানে নিজেকে নিরাপদ মনে করতেন। তবে তাঁর অভিযোগ, ওই ব্যক্তি পরে অনলাইনে তাঁকে এবং কোম্পানিটিকে লক্ষ্যবস্তু করা চালিয়ে যান, যার মধ্যে ব্যক্তিগত বার্তাও ছিল। ভবিষ্যতে তিনি প্রকাশ্যে কোনো সাফল্য অর্জন করলে ওই ব্যক্তি আবার তাঁকে হয়রানি করতে পারেন বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

লাঞ্চ হাউসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ব্রেট গোল্ডস্টেইন বলেন, প্রতিষ্ঠানটি এখন আর আগের কাঠামোয় পরিচালিত হয় না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, লাঞ্চ হাউসের আচরণবিধি এবং ঘটনা মোকাবিলার নীতিমালা বাইরের মানবসম্পদ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, সরাসরি উপস্থিতির কোনো আয়োজন পরিচালনাকারীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ক্রমাগত উন্নত করার দায়িত্ব রয়েছে।

সিলিকন ভ্যালির ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও পেশাগত কমিউনিটিতে যৌন অসদাচরণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সালে এআই গবেষক কৃর্তনা গোপালাকৃষ্ণান ইফেক্টিভ অলট্রুইজম কমিউনিটিতে যৌন চাপ প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে লিখেছিলেন। যৌন নিপীড়নের অভিযোগ কমিউনিটির অভ্যন্তরীণ মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের পদ্ধতি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জবরদস্তিমূলক যৌন আচরণ এবং সম্মতিপূর্ণ বহুগামী যৌন সম্পর্কের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনের প্রদত্ত তথ্য থেকে স্পষ্ট নয়। তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণেও আদালত বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সিদ্ধান্তের তথ্য এখানে দেওয়া হয়নি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত