Ajker Patrika

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ: ট্রেনের গতি বাড়াতে ডুয়েলগেজ

  • মোট করিডর ৩২৫ কিলোমিটার, ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন আছে ৯৫ কিলোমিটার।
  • এখনো ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন হয়নি প্রায় ২৩০ কিলোমিটার অংশে।
  • প্রায় ৪ ঘণ্টায় ট্রেন এই পথ পাড়ি দিতে পারবে বলে আশা।
  • দুটি প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ৩৩,৩০৯ কোটি টাকা।
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ: ট্রেনের গতি বাড়াতে ডুয়েলগেজ
ফাইল ছবি

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেনের গতি বাড়াতে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে রেলওয়ে। দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত এই রেল করিডরকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের মাধ্যমে ট্রেন চলাচলের গতি, সক্ষমতা ও সময়ানুবর্তিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রেলযাত্রার সময় প্রায় ৪ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

৩২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে বর্তমানে যেখানে দৈনিক ৫২ জোড়া ট্রেন চলাচল করে, সেখানে সক্ষমতা বাড়িয়ে ৬৫ জোড়া ট্রেন চালানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা।

বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে দ্রুতগতির আন্তনগর ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেসের যাত্রায় সময় লাগে ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিটের মতো।

রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো করিডর ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরিত হলে ট্রেনগুলো ব্রডগেজ হিসেবে চালানো যাবে, যা মিটারগেজের তুলনায় উচ্চগতিতে চলতে সক্ষম। ফলে ক্রসিংজনিত বিলম্ব কমবে এবং লাইনের সক্ষমতা বাড়বে। এই উন্নয়নের ফলে যাত্রার সময় ধাপে ধাপে কমে সাড়ে তিন ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, বর্তমানে আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটার এবং ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার অংশ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত হয়েছে। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরের বাকি প্রায় ২৩০ কিলোমিটার অংশ এখনো মিটারগেজ ডাবল লাইনের কাঠামোয় রয়েছে। এই অংশগুলোকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের জন্য দুটি পৃথক প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, লাকসাম থেকে চিনকি আস্তানা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১৩২ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (পিডিপিপি) অনুসারে, টঙ্গী থেকে ভৈরব বাজার হয়ে আখাউড়া পর্যন্ত ৯৮ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা। দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৩৩ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। তবে এই ব্যয় এখনই চূড়ান্ত নয়।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এ দুটি প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ দেখিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি শুরুতে লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে চাইলেও বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পুরো করিডরের উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। ইতিমধ্যে লাকসাম-চিনকি আস্তানা-চট্টগ্রাম অংশের উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপি জমা পড়েছে রেলের পরিকল্পনা বিভাগে এবং টঙ্গী-ভৈরব বাজার-আখাউড়া অংশের ডিপিপি প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

ডিপিপি অনুযায়ী, লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত হলে এই করিডরে ভ্রমণের সময় প্রায় ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে।

একই সঙ্গে ট্রেন চলাচলের সময়সূচি মেনে চলার হার ৫৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৫ শতাংশে উন্নীত হবে। বর্তমানে যেখানে দৈনিক ৫২ জোড়া ট্রেন চলাচল করে, সেখানে সক্ষমতা বাড়িয়ে ৬৫ জোড়া ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।

শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, পণ্য পরিবহনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে কনটেইনার ট্রেন চলাচলে সময়সূচি অনুসরণের হার প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের পর তা ৭০ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে রেলপথে পণ্য পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং সড়কপথের ওপর চাপ কমবে।

এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই রুট সম্পূর্ণ ডুয়েলগেজে রূপান্তরিত হলে আখাউড়া হয়ে ভারতীয় রেলের ট্রেন সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত চলাচল করতে পারবে। ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং আন্তদেশীয় যোগাযোগে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। এই অংশ ২০৩২ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে ডিপিপিতে।

অন্যদিকে পিডিপিপিতে বলা হয়েছে, টঙ্গী-ভৈরব বাজার-আখাউড়া অংশের উন্নয়ন ‘গেজ একীকরণ’-এর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে মিটারগেজ, ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ—এই তিন ধরনের গেজ ব্যবহৃত হওয়ায় পরিচালনায় জটিলতা তৈরি হয়। পুরো করিডর ডুয়েলগেজে রূপান্তরিত হলে এই জটিলতা কমবে এবং রেল পরিচালনা আরও সহজ ও কার্যকর হবে।

রেলওয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডর নয়, ভবিষ্যতে দেশের পুরো রেল নেটওয়ার্ককেই ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের মধ্যে এই করিডর উন্নয়নের কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল, যদিও সময়সীমা চলে গেলেও বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন গত বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডরকে পূর্ণাঙ্গ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। করিডরের যেসব অংশ এখনো এই আওতায় আসেনি, সেগুলোকে ‘মিসিং লিংক’ হিসেবে চিহ্নিত করে টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া এবং লাকসাম-চিনকি আস্তানা-চট্টগ্রাম অংশে দুটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের গতি বাড়বে, যাত্রার সময় কমবে এবং করিডরের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের উদ্যোগটি সময়োপযোগী ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে শুধু অবকাঠামো উন্নয়নই নয়, এর সঙ্গে সমন্বিত সিগন্যাল, অপারেশন ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। তা না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে পণ্য পরিবহনও অনেক বেশি দক্ষ হবে, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যশোরে খোদ বিচারকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা, বাদী গ্রেপ্তার

চীনকে নিয়ে হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করবে ইরান! ভারতের জন্য বিপদ

পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আর্টেমিস নভোচারীদের ৪০ মিনিট, কী ঘটবে তখন

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের পাল্টা ১০ দফা

অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রাইম ব্যাংকে নেবে ট্রেইনি অফিসার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত