Ajker Patrika

মিত্ররা পাশে নেই, যুদ্ধে একা ট্রাম্প

  • ট্রাম্পের হুমকি, হরমুজে জাহাজ না পাঠালে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
  • জার্মানি বলছে, এ যুদ্ধ তাদের নয়। সংঘাতে জড়াবে না যুক্তরাজ্য।
  • যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে চায় অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও গ্রিস।
আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মিত্ররা পাশে নেই, যুদ্ধে একা ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সাহায্য চেয়েও পাচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোর সাহায্য চেয়েছিলেন তিনি। তবে এই জোটের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও গ্রিস এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা যুদ্ধে জড়াতে চায় না। জোটের অন্য দেশগুলো এখনো নীরব। যুদ্ধকে না বলছে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র অস্ট্রেলিয়াও।

এমন সময় এ ঘটনা ঘটছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় তেলের স্থাপনার পাশাপাশি শিল্প এলাকায় পাল্টা হামলা শুরু করেছে ইরান। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় গতকাল সোমবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০৫ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

ইরানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা পরই জবাব দেওয়া শুরু করে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলে হামলা শুরু করে তারা। যুদ্ধ পরিস্থিতি জটিল হয় ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করায়। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই প্রণালি দিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মিত্রদেশের জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। এরপর ২০টির মতো জাহাজে হামলাও চালিয়েছে তারা। এর জেরে তেল পরিবহনে সংকট দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে থাকে দাম। গতকাল ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রণালি বন্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৫ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ বন্ধ থাকলে দাম বাড়তেই থাকবে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের জেরে আন্তর্জাতিক মহলে চাপে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরুর জন্য প্রথমে নিজ দেশের নৌবাহিনী ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, মার্কিন বাহিনী ওই প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজের নিরাপত্তা দেবে। তবে মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা এই উদ্যোগ নেবে না। এরপর ট্রাম্প খানিকটা পিছু হটেন। পরে তিনি হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপত্তা দিতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, এমনকি চীনকেও যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে বলেন গত শনিবার। তবে এই দাবি খারিজ হয়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান জানিয়ে দেয়, তাদের জন্য জাহাজ পাঠানো কঠিন। আর যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স জানায়, তারা সংঘাতে জড়াতে চায় না।

তবে ট্রাম্প থেমে যাননি। এবার ন্যাটো জোটের সদস্যদেশগুলোর কাছেও সাহায্য চেয়েছেন তিনি। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির সুবিধাভোগী যারা, তাদের সহযোগিতার হাত বাড়ানো উচিত, যাতে কোনো বাজে ঘটনা সেখানে না ঘটে। এই আহ্বানে যদি সাড়া না পাওয়া যায়, কিংবা নেতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়, তাহলে আমার ধারণা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ খুবই খারাপ হবে।’

এ নিয়ে গতকাল হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করেন ট্রাম্প। এ সময় মিত্ররা হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করতে সহায়তা করতে না আসায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। ট্রাম্প বলেছেন, ‘তারা এ ব্যাপারে উৎসাহ বোধ করছে না।’ একই সঙ্গে তিনি আবার বলেন, কয়েকজন নেতা যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ট্রাম্প তাঁদের নাম উল্লেখ করেননি।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প সাহায্য চাওয়ার পর তাদের ওপর চাপ বাড়ছে বলে মনে করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কাল্লাস। তিনি ব্রাসেলসে এক বৈঠকের আগে বলেন, এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল শুরুর জন্য কী করা যেতে পারে, সে বিষয়টির ওপর নজর দেওয়া উচিত ইউরোপের নেতাদের। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আগে এটা আলোচনা করা উচিত, ইউনিয়নের কোন কোন দেশ সেখানে স্বেচ্ছায় জাহাজ পাঠাতে চায়।’

তবে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনো সংঘাতে জড়াবে না। তাদের সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। এ ছাড়া মার্কিন আরেক মিত্র এবং ন্যাটোর ঘনিষ্ঠ মিত্র অস্ট্রেলিয়াও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারাও সেখানে জাহাজ পাঠাবে না। আর এশিয়ার মিত্র জাপানও একই ধরনের বার্তা দিয়েছে।

জার্মান সরকারের একজন মুখপাত্র গতকাল বলেছেন, দেশটি যুদ্ধ বা সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার কোনো চেষ্টায় যোগ দেবে না। এ ছাড়া দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রীও বলে দিয়েছেন, ন্যাটোর সদস্য হিসেবে তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ নয়।’

ইউরোপের আরেক দেশ গ্রিস একই অবস্থানের কথা জানিয়েছে। সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস বলেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো সামরিক তৎপরতায় জড়াবে না গ্রিস।

এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গতকাল বলেন, ব্রিটেন নিজেকে কোনো বৃহত্তর সংঘাতের মধ্যে টেনে নিতে দেবে না। পাশাপাশি ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে দ্রুত সমাধানের জন্য কাজ করে যাবে তারা।

তবে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি যুক্তরাজ্যকে নিয়ে সন্তুষ্ট না। আমার ধারণা, হরমুজ খোলা রাখার কাজে তারা যুক্ত হবে হয়তো। তবে তাদের এই কাজে উৎসাহ নিয়ে যুক্ত হতে হবে।’

সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার বার্তা দিয়েছে ফ্রান্সও। ট্রাম্পের আহ্বানের পর ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের যুদ্ধজাহাজ প্রতিরক্ষার জন্য ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলে রয়েছে। তবে তারা হরমুজে গিয়ে সরাসরি কোনো সংঘাতে জড়াতে চায় না।

যদিও গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। হরমুজ খোলার বিষয়ে মাখোঁ কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

ইরানের হামলা চলছে

ইরানের হামলায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে ইসরায়েলে। এখন পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ৩ হাজার ৩৬৯ জন ইসরায়েলি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও এখন পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েল। দেশটির পক্ষ থেকে গতকাল বলা হয়েছে, ইরান থেকে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চল ও জেরুজালেম লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। সতর্কতা জারির পর জেরুজালেমে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া গতকাল মাত্র দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে ৩৭টি ড্রোন ব্যবহার করে হামলার চেষ্টা হয়েছে। হামলার খবর পাওয়া গেছে ইরাকেও। বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কমপ্লেক্সের কাছে একটি ভবনে গত রোববার রাতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে।

আল জাজিরা জানায়, গতকাল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় দফায় দফায় সতর্কতা জারি করে কাতার ও বাহরাইন। গতকাল এক দিনেই অন্তত ৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২১টি ড্রোন প্রতিহত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি জানিয়েছে, গতকাল ফুজাইরাহ এলাকার শিল্প অবকাঠামোয় ড্রোন হামলা করা হয়েছে।

এদিকে শব্দের চেয়ে ১৩ গুণ বেশি গতির ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)। এ ছাড়া তাদের নৌবাহিনী একযোগে চারটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির পক্ষ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের শিল্পকারখানা থেকে মার্কিনদের সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব স্থাপনায় হামলা হবে বলে হুমকি দিয়েছে তারা।

ইরানের ওপর হামলা

অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, গতকাল ইরানের খোমেন শহরে একটি স্কুল হামলার শিকার হয়েছে। হামলা হয়েছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শাবাহার এলাকায়। এ ছাড়া রাজধানী তেহরানের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিদ্যুৎ বিভাগের একটি ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছে। আল জাজিরা জানায়, ইরানের তেহরান, শিরাজ ও তাবরিজে বড় হামলা হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ) দাবি করেছে, তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ব্যবহৃত উড়োজাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলেছে, ইরানে এখনো হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু রয়েছে। তারা এসব লক্ষ্যবস্তুর ওপর নজর রাখছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আটক ৩ ট্যাংকার ফেরত দিলে ভারতকে হরমুজে যাতায়াতের সুযোগে দেবে ইরান

এনসিপি নেতারা গণভোট নিয়ে অর্ধেক বুঝেছেন: আইনমন্ত্রী

কফি পানের ভিডিওটিও এআই দিয়ে তৈরি, নেতানিয়াহু কি তবে মারা গেছেন

ইসরায়েলে শব্দের ১২ গুণ গতির ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ নিক্ষেপ ইরানের, বৈশিষ্ট্য কী

সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য, ইউজিসিতে নতুন চেয়ারম্যান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত