
ইসরায়েলের যুদ্ধপন্থী মনোভাব বিরোধী আন্দোলনের সদস্যা ইতামার গ্রিনবার্গ। তাঁর কাছে যখন জানতে চাওয়া হয় যে, এই অবস্থানের জন্য তাঁর ভয় পাওয়া উচিত কি না? তখন ১৯ বছর বয়সী এই ইসরায়েলি তরুণ, জানান এই অবস্থানের জন্য কীভাবে রাস্তায় তার গায়ে থুতু নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং কীভাবে তিনি অনলাইন বিদ্বেষমূলক প্রচারণার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন।
ইতামার গ্রিনবার্গ বলেন, ‘হ্যাঁ! আমি যদি এটা (এই অবস্থানের পরিণতি) নিয়ে ভাবতাম, তবে সম্ভবত আমার ভয় পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমার কাছে সেই সময়টুকু নেই।’
ইসরায়েলে গ্রিনবার্গের মতো কণ্ঠস্বর এখন বিরল। এমন এক সময়ে তিনি কথা বলছেন যখন দেশটিতে যুদ্ধের জন্য জনদাবি বাড়ছে এবং গাজার লাখ লাখ ফিলিস্তিনির কাছে ইতিমধ্যে পরিচিত সেই ‘গণহত্যামূলক ভাষা’ পুনরায় ফিরে আসছে। তবে এবার লক্ষ্যবস্তু ভিন্ন—ইরান।
সরকারি তথ্য বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইরানি হামলায় ১১ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা কত হতে পারে, বা ইরানের কতগুলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেশের ‘আয়রন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে, তা এখনও অজানা।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার কিছুকাল পরে পশ্চিম জেরুজালেমে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার একটি স্থানে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেই ‘অ্যাপোক্যালিপ্টিক’ বা ধ্বংসাত্মক ভাষায় ফিরে যান, যা গাজায় তাঁর দেশের চালানো গণহত্যার বৈশিষ্ট্য ছিল। ইরানিদের ইহুদি জাতির বাইবেলীয় শত্রু ‘আমালেক’–এর সঙ্গে তুলনা করে (যাদের পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার ঐশ্বরিক আদেশ ইহুদিদের দেওয়া হয়েছিল) নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই সপ্তাহের তোরাহ অংশে আমরা পড়েছি, “আমালেক তোমার সঙ্গে যা করেছে তা মনে রেখো।” আমরা মনে রাখি এবং আমরা ব্যবস্থা নিই।’
এখন পর্যন্ত ইরান দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলজুড়ে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলো সামরিক ঘাঁটি, প্রতীকী অবকাঠামো এমনকি নেতানিয়াহুর কার্যালয়েও আঘাত হেনেছে। তেহরান এই হামলাগুলোকে নির্বিচার না বলে বরং সুনির্দিষ্ট, কৌশলগত এবং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইরান আরও দাবি করেছে, তারা তেল আবিব, বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর এবং হাইফার মতো স্থানগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে।
তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই সুনির্দিষ্ট দাবিগুলোর অনেকগুলোই অস্বীকার করেছেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয় তাঁর অফিস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে ইরানি দাবিগুলোকে ‘ফেইক নিউজ’ বা ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ইরানি হামলার খবরের ওপর কঠোর প্রতিবেদন বিধিনিষেধ থাকায় কোনো পক্ষের দাবিই নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে যা স্পষ্ট তা হলো, ইরানি হামলার দামামার বিপরীতে জনসাধারণের মধ্যে যুদ্ধের উন্মাদনা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট (আইডিআই) কর্তৃক পরিচালিত একটি জরিপ বলছে যে, যুদ্ধের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। ৯৩ শতাংশ ইহুদি-ইসরায়েলি উত্তরদাতা ইরানের ওপর হামলার সমর্থন জানিয়েছেন এবং ৭৪ শতাংশ সমর্থন জানিয়েছেন ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি।
বামপন্থী হাদাশ পার্টি এবং গ্রিনবার্গের সংগঠন মেসারভোট-এর মতো যুদ্ধবিরোধী সংস্থাগুলো বাদে ইসরায়েলের গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনের সবাই যুদ্ধের পক্ষে একাত্ম হয়েছে উল্লেখ করে গ্রিনবার্গ বলেন, ‘পরিস্থিতি দিন দিন আরও সহিংস হয়ে উঠছে। যুদ্ধের বিরোধিতার কথা কেউ বলছে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা মঙ্গলবার একটি প্রতিবাদ সভা করেছিলাম যেখানে পুলিশ আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। তারা আমাদের মারধর করে এবং গ্রেপ্তার করে। আমাকে অবৈধভাবে নগ্ন করে তল্লাশি করা হয়েছে।’ তিনি এটিকে তাকে অপমান করার প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরেন।
গ্রিনবার্গ এ ধরনের আচরণের সঙ্গে বহুল পরিচিত। ছয় মাস আগে গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদ করার জন্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর কারাগারের রক্ষীরা তার মুখে স্টার অব ডেভিড (ইসরায়েলি পতাকায় আঁকা তারা) খোদাই করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল—যাতে তাঁর অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত তা তাকে স্থায়ীভাবে মনে করিয়ে দেওয়া যায়।
নিরাপত্তা বাহিনীর এই রোষানলে কেবল যুদ্ধবিরোধী কর্মীরাই পড়ছেন না। হাদাশ পার্টির আইনপ্রণেতা ওফার ক্যাসিফ আল জাজিরাকে বলেন, ‘পরিবেশটা খুবই সহিংস। আমি যখন বাড়ি থেকে বের হই, তখন কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ফ্যাসিস্টদের শারীরিক হামলার বিপদে বেশি উদ্বিগ্ন থাকি।’
গাজা যুদ্ধ চলাকালীন ক্যাসিফের মতো আইনপ্রণেতারা এবং হাদাশ পার্টি শারীরিক হুমকি ও হামলার শিকার হয়েছেন। তিনি জানান, তবে গাজায় আটক ইসরায়েলি বন্দীদের বিষয়ে নেতানিয়াহু সরকারের ব্যবস্থাপন নিয়ে সমালোচনা থাকায় গাজা যুদ্ধের বিরোধিতা করা কিছুটা হলেও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত বিষাক্ত।
যুদ্ধের বিরোধিতাকে অবৈধ প্রমাণ করার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে ক্যাসিফ ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের প্রায়ই তেহরান সরকারকে সমর্থন করার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আমরা স্পষ্টভাবে তা করছি না। আমরা ওই শাসনের পতন দেখতে চাই, কিন্তু আমরা নেতানিয়াহুকে এটা বলতে দেব না যে তিনি ইরানি জনগণের জন্য এটি করছেন। তিনি তা করছেন না। এটি কেবল অলঙ্কারিক কথা নয়, এটি বাস্তব সত্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইসরায়েলি নেতৃত্বও শাহের (মোহাম্মদ রেজা পাহলভি) চরম সমর্থক ছিল, অথচ তিনি বর্তমান সরকারের চেয়ে কোনো অংশে কম খুনি একনায়ক ছিলেন না।
আপাতত ইসরায়েলের বিশ্লেষক এবং পর্যবেক্ষকরা এমন একটি সমাজের বর্ণনা দিচ্ছেন যারা বিশ্বাস করে যে তারা প্রায় একটি ‘ধর্মযুদ্ধে’ লিপ্ত। তেল আবিবের নিকটবর্তী স্থান থেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, ‘তারা হালকা বিনোদনমূলক সংবাদ অনুষ্ঠানে একজন যুদ্ধবিরোধী কর্মীকে নিয়ে এসেছিল এবং তাঁর সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে যেন সে বিশ্বাস করে যে, পৃথিবীটা সমতল। বিষয়টি এমন যেন কেউ এই যুদ্ধের বিরোধিতা করতে পারে তা অকল্পনীয়।’
ওরি গোল্ডবার্গ বলেন, ‘ইসরায়েল এমন একটি সমাজে পরিণত হয়েছে যেখানে কোনো মধ্যপন্থা নেই, কথা বলার সুযোগ নেই। মনে হচ্ছে যেন আমাদের পুরো অস্তিত্ব নির্ভর করছে আমাদের যা খুশি তাই করার ক্ষমতার ওপর। আর বিশ্ব যদি তা থামানোর চেষ্টা করে, তবে বিশ্ব ইহুদিবিদ্বেষী এবং আমরা সবাই পুড়ে মরব।’

ইরানে মার্কিন–ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে এরই মধ্যে চড়া মূল্য দিতে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতি। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোও এক বিস্তৃতি সংঘাতের ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে এবং ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এই অবস্থায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে ইরানে সঙ্গে যোগাযোগ করেছে চীন ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ।
১৩ মিনিট আগে
লেবানন সীমান্তে এক হামলায় আট ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আছেন, ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী ও কট্টর ইহুদি জাতীয়তাবাদী বা জায়োনিস্ট নেতা বেজালেল স্মতরিচের ছেলেও। স্মতরিচ জানিয়েছেন, হামলায় তাঁর ছেলের লিভার বা যকৃত তথা কলিজা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তবে, এখনো সে বেঁচে আছে।
২৮ মিনিট আগে
ইসরায়েলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এখন ইরানের ওপর চলতে থাকা ক্রমবর্ধমান ও অনির্দিষ্টকালীন হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা এমন কিছু সম্ভাব্য ‘এক্সিট র্যাম্প’ বা ‘প্রস্থান পথ’ বা সমাধানের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
৩৭ মিনিট আগে
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী হয়ে তেল–গ্যাস পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায়, রাশিয়া শর্তসাপেক্ষে ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহে প্রস্তুত। এমনটাই জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
১ ঘণ্টা আগে