Ajker Patrika

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানে ট্রাম্পের ১৫ দফা, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কতটুকু

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানে ট্রাম্পের ১৫ দফা, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কতটুকু
ছবি: এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি ১৫ দফা পরিকল্পনা পেশ করেছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা নিশ্চিত করেছে, এই পরিকল্পনা পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে চলতি সপ্তাহে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতার জন্য প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ‘অত্যন্ত ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ হয়েছে। তবে ইরান শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার কথা অস্বীকার করে আসছে। ট্রাম্পের দাবির প্রতিক্রিয়ায় ইরানি নেতারা উপহাস করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আসলে ‘আত্মপ্রলাপ’ বকছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যখন আলোচনার টেবিলে ছিল, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকস্মিক হামলা চালিয়ে এই যুদ্ধের সূত্রপাত করে। গত কয়েক সপ্তাহের এই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও শেয়ারবাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। লোহিতসাগর ও পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কেবল ইরানেই দেড় হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১৮ হাজার ৫৫১ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকেই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ ঘোষণা করে দেয়। তবে সম্প্রতি তারা ভারত, পাকিস্তান ও চীনের পতাকাবাহী কিছু জাহাজকে যাতায়াতের অনুমতি দিচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সম্পদ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা হামলার কারণে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের ৬৫ ডলারের চেয়ে অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা পরিকল্পনায় কী আছে

আল–জাজিরাসহ মার্কিন ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো এই শান্তি পরিকল্পনায় এক মাসের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে স্থায়ী শান্তিচুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করা যায়। তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তান বর্তমানে ইসলামাবাদে একটি শীর্ষ বৈঠকের জন্য চাপ দিচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের ১৫ দফার অন্যতম দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ৩০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি।

২. নাতানজ, ইসফাহান ও ফোরদোতে অবস্থিত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা।

৩. ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না—এমন স্থায়ী প্রতিশ্রুতি।

৪. ইরানের মজুত করা সমস্ত ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পরমাণুশক্তি সংস্থার (আইএইএ) কাছে হস্তান্তর এবং ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা।

৫. ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও সংখ্যার ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ।

৬. আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে (হিজবুল্লাহ, হামাস ইত্যাদি) ইরানের সমর্থন বন্ধ করা।

৭. মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বন্ধ করা।

৮. হরমুজ প্রণালি পুনরায় সবার জন্য খুলে দেওয়া।

৯. ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের ‘স্ন্যাপব্যাক’ ব্যবস্থা বাতিল।

১০. বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক কারিগরি সহায়তা প্রদান।

ইসরায়েল প্রকাশ্যে কিছু না বললেও সূত্রের খবর অনুযায়ী, তারা এই ১৫ দফার সঙ্গে একমত। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উদ্বেগ হলো—ট্রাম্প চুক্তি করার জন্য কতটুকু ছাড় দেবেন। তাঁরা ভয় পাচ্ছেন, এক মাসের যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি নির্মূল না করেই একটি আপসমূলক চুক্তিতে পরিণত হতে পারে।

যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। গত বছর ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে তারা নাতানজ ও ফোরদোতে বিমান হামলা চালিয়েছিল। কিন্তু এবারের যুদ্ধে তাদের সুর বদলে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে ট্রাম্প সরাসরি বিরক্তি প্রকাশ করেন। তবে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, নতুন এই ১৫ দফা পরিকল্পনায় ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ কোনো সরাসরি উল্লেখ নেই।

ইরানের প্রতিক্রিয়া ও দাবি

ইরানের সামরিক নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে। তাদের মতে, গত দুই বছরে আলোচনার মাঝপথেই যুক্তরাষ্ট্র দুবার ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে, তাই ওয়াশিংটন আর নির্ভরযোগ্য কোনো অংশীদার নয়। ইরানের সামরিক কমান্ডের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি ট্রাম্পকে বিদ্রূপ করে বলেন, ‘আমরা আর কখনোই আপনাদের মতো মানুষের সঙ্গে আপস করব না।’

তবে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিছুটা নমনীয় সুর বজায় রেখেছে। ১১ মার্চ প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান শান্তিচুক্তির জন্য তিনটি প্রধান শর্ত দিয়েছেন:

১. ইরানের বৈধ অধিকারের স্বীকৃতি।

২. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান।

৩. ভবিষ্যতে আর কখনো হামলা না করার আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি।

এ ছাড়া ইরান মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে একটি নতুন আইনি কাঠামো তৈরির দাবি জানিয়েছে, যা এই জলপথের ওপর ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিশ্চিত করবে।

কাতারভিত্তিক গবেষক জেইদুন আলকিনানি মনে করেন, যুদ্ধের ময়দানে ইরানের আইআরজিসি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। পেজেশকিয়ান অর্থনৈতিক চাপ ও জনরোষের কারণে যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী হলেও আইআরজিসির কাছে এটি একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সামরিকভাবে পরাজিত না করে পিছু হটলে তা ইরানের জন্য চিরস্থায়ী বিপদ ডেকে আনবে।

চুক্তি কি আদৌ সম্ভব

কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, ইরান সীমিত পরিসরে হলেও আলোচনায় বসতে আগ্রহী হতে পারে। মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন গতকাল মঙ্গলবার এক অজ্ঞাতনামা ইরানি সূত্রের বরাতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘পূর্ণাঙ্গ আলোচনা’ নয়, বরং ‘যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা’ হয়েছে।

ওই সূত্র আরও জানায়, সংঘাতের অবসান ঘটাতে ‘টেকসই’ কোনো প্রস্তাব এলে তা শোনার জন্য ইরান প্রস্তুত। ইরানি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবির মতে, শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে তিনি উভয় পক্ষের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কথা উল্লেখ করেছেন।

সামনেই নভেম্বর মাসে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন। জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে চাপে আছেন ট্রাম্প।

এদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের আয়, তেল রাজস্ব এবং বিমান চলাচল খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। অপর দিকে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর (যেমন সৌদি আরব ও তুরস্ক) কাছ থেকেও ইরান শান্তি স্থাপনের জন্য চাপের মুখে রয়েছে।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুরুতে ভেবেছিল এটি একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ হবে এবং ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু ইরান এখন ইসরায়েলের ভেতরে সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম হওয়ায় যুদ্ধের খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই অচলাবস্থা কাটানোর একমাত্র পথ এখন আলোচনার টেবিল, যদিও দুই পক্ষের দাবিগুলো দুই মেরুতে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত