Ajker Patrika

গাজা বেসামরিক গণহত্যার নেপথ্যে যেকোনো মূল্যে ‘শান্তি ব্যর্থ করার’ ইসরায়েলি মিশন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
গাজা বেসামরিক গণহত্যার নেপথ্যে যেকোনো মূল্যে ‘শান্তি ব্যর্থ করার’ ইসরায়েলি মিশন
: গাজা সীমান্তে ইসরায়েলি ট্যাংক। ছবি: এএফপি

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে ব্যাপকভাবে বেসামরিক লোকজনকে হত্যা করার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল—যেকোনো মূল্যে শান্তি প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেওয়া। এমনটা করতে ইসরায়েলি সেনাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল উর্ধ্বতন মহল থেকে। সম্প্রতি ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রচারিত এক তথ্যচিত্র থেকে এসব উঠে এসেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপকভাবে হত্যায় ব্যবহৃত গোপন সামরিক ব্যবস্থাগুলো নিয়ে মুখ খুলেছেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ২৪ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনাসদস্য। ‘NAZA’ নামে নতুন একটি তথ্যচিত্রে তাঁরা এসব গোপন ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন।

তথ্যচিত্রটির নাম ‘NAZA’ একটি ইসরায়েলি সামরিক ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত রূপ থেকে নেওয়া হয়েছে। বেসামরিক হতাহতের ঘটনা বোঝাতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে পুরুষ, নারী ও শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত।

ইতালির ভেনিসে তথ্যচিত্রটির প্রিমিয়ারে এটি ২৫ মিনিট ধরে দর্শকদের স্ট্যান্ডিং ওভেশন পায় বা প্রায় ২৫ মিনিট ধরে দর্শকেরা এই চলচ্চিত্রটিকে অভিবাদন জানান। তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন অস্কারজয়ী ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর। তিন বছর ধরে গোপনে তথ্যচিত্রটির শুটিং করা হয়েছে। তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের ছাদে এসব দৃশ্য ধারণ করা হয়। তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। এ জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁদের কণ্ঠ ও চেহারা পরিবর্তন করা হয়েছে।

তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত কিছু গোপন পদ্ধতি সম্পর্কে প্রথমবারের মতো কথা বলেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে হামাসের অপেক্ষাকৃত নিচু পর্যায়ের সদস্যদের শনাক্ত করা হতো। এরপর রাতে তাঁদের বাড়িতে হামলা চালানো হতো। এসব হামলায় ওই ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও মারা যাবেন, তা জানা থাকা সত্ত্বেও হামলা চালানো হতো।

তথ্যচিত্রে আরও দেখানো হয়েছে, লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কীভাবে ফোনে হ্যাক করত। লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিরা তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে হত্যার ঠিক আগে যে কথোপকথন করতেন, সেগুলোও সামরিক বাহিনী শুনত বলে তথ্যচিত্রে দাবি করা হয়েছে।

তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছেন, কীভাবে পুরোপুরি আবাসিক এলাকা ধ্বংস করা হয়েছে, বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং একটি খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে যে—লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়। তবে তাদের দাবি, কোনো হামলা মানুষের সম্পৃক্ততা ছাড়া চালানো হয় না। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়ার আগে তিনি কথা বলছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার ভেনিসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউভাল আব্রাহাম বলেন, তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের তাঁদের কাজ এবং এসব ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তা বর্ণনা করতে বলা হয়েছিল। আব্রাহাম বলেন, ‘তাঁদের কেউ অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন, কেউ করেননি। কেউ উদাসীনতা থেকে কথা বলেছেন, আবার কেউ গর্বের সঙ্গে কথা বলেছেন।’

তথ্যচিত্রে অংশ নেওয়া অনেকেই একটি গোপন গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ করতেন এবং সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছে রিপোর্ট করতেন। তাঁদের একজন জানান, তাঁদের মিশন ছিল যেকোনো মূল্যে ‘শান্তিকে ব্যর্থ করে দেওয়া’ এবং এ কারণে ব্যাপকভাবে বেসামরিক লোকদের হত্যা করা হতো।

এক যৌথ বিবৃতিতে ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর বলেন, ‘আমাদের দেশ যে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপক হত্যার জন্য দায়ী, সেই হত্যার পেছনে থাকা ব্যবস্থাগুলো খতিয়ে দেখার জন্য ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান ব্যবহার করা আমাদের দায়িত্ব বলে মনে করেছি। সেই দায়বোধ থেকেই আমরা এই চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছি।’

ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর ২০২৫ সালের সেরা তথ্যচিত্রের পুরস্কারজয়ী ‘নো আদার ল্যান্ড (No Other Land) ’-এর চার পরিচালকরের মধ্যে দুজন। ওই তথ্যচিত্রে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর উচ্ছেদ ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে নিজেদের সম্প্রদায়কে রক্ষার জন্য লড়াই করা ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীদের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

‘নো আদার ল্যান্ড’ ছিল ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের যৌথ কাজ। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এর নির্মাণকাজ চলে। হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালানোর কয়েক দিন আগে এর শুটিং শেষ হয়। ওই হামলার মধ্য দিয়েই গাজায় শুরু হওয়া যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে।

ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত গাজার এলাকাগুলো বেশির ভাগই ধ্বংস ও জনশূন্য হয়ে পড়েছে। গাজার মোট প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনির অধিকাংশই বর্তমানে হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে অবস্থান করছেন। ইসরায়েলি আগ্রাসনে প্রায় ৭৩ হাজার মানুষ নিহত এবং প্রায় ২ লাখের মতো মানুষ আহত হয়েছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত