Ajker Patrika

পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের বদলে থেমে থেমে সংঘাতের শঙ্কা ইরানের, রাজধানীজুড়ে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের বদলে থেমে থেমে সংঘাতের শঙ্কা ইরানের, রাজধানীজুড়ে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা
ফাইল ছবি

ইরানের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতৃত্ব মনে করছেন, দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণমাত্রার সামরিক যুদ্ধের সম্ভাবনা খুবই কম। তবে তাঁদের মতে, সীমিত সামরিক সংঘর্ষ, রাজনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে। গত মঙ্গলবার ইরানি সংবাদমাধ্যম খবর অনলাইন ইরানের বর্তমান ও সাবেক পাঁচজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সেখানে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজ নিজ মূল্যায়ন তুলে ধরেন। ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও অধিকাংশই একমত যে কোনো পক্ষই দীর্ঘস্থায়ী পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়।

তাঁদের মতে, আগামী সময়ে সামরিক চাপ, সীমিত সংঘর্ষ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সমান্তরালভাবেই চলবে। ইরানের সাবেক মধ্যপন্থী এমপি আলি মোতাহারি বলেন, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না বর্তমান পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে গড়াবে, কারণ কোনো পক্ষই এমন যুদ্ধ চায় না।’

রক্ষণশীল রাজনীতিক মোহসেন কুহকানও একই ধরনের মূল্যায়ন করেন। তাঁর মতে, ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণমাত্রার দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ানোর জন্য প্রস্তুত নয়।’ তাঁর দাবি, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক হুমকির মূল উদ্দেশ্য ছিল চাপ বাড়ানো, যুদ্ধ শুরু করা নয়।

তেহরানে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা

এদিকে তেহরান সিটি কাউন্সিল রাজধানীর বিভিন্ন ভবনে আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বাধ্যতামূলক করার একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে মেট্রো স্টেশন, ভূগর্ভস্থ পার্কিং এবং অন্যান্য জনপরিসরকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ভবিষ্যতেও সামরিক সংঘাত চলতে পারে, এমন সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে দুটি যুদ্ধ শুরু করার পর রাজধানীর বাসিন্দা, নাগরিক সমাজের কর্মী এবং নগর পরিকল্পনাবিদেরা হামলার সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র না থাকার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন।

ইরানের শার্ঘ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলে তেহরান সিটি করপোরেশনকে জনসাধারণের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি মেট্রো স্টেশন, ভূগর্ভস্থ পার্কিং এবং অন্যান্য জনপরিসরকে সামরিক হামলার সময় ব্যবহারের উপযোগী জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। এ ছাড়া নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও সামরিক হামলা প্রতিরোধে সক্ষম সুরক্ষিত আশ্রয়কক্ষ রাখা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই শর্ত পূরণ না করলে নির্মাতারা ভবনের সমাপ্তি সনদ পাবেন না।

যুদ্ধপন্থী অবস্থানের সমালোচনা

ইরানের সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ আলেম ও রাজনীতিক মাসিহ মোহাজেরি দেশের ভেতরে যুদ্ধপন্থী অবস্থান নেওয়া গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দৈনিক আবরারে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘাত বন্ধের বিরোধিতাকারীদের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার নামে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায়।

মোহাজেরির মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করলে সেই লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে উল্টো ক্ষতি হবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী ও বর্ণবাদী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তাদের মোকাবিলায় একটি মাত্র সামরিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। তিনি লেখেন, ‘সমসাময়িক মানবসভ্যতাকে এই দুই অপরাধী শাসনের অপরাধ থেকে রক্ষা করতে হলে আমাদের কৌশলগতভাবে চিন্তা করতে হবে। যদি প্রতিশোধের কথা বলি, তবে সেটি তাদের আদর্শিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হতে হবে, যাতে ষড়যন্ত্র ও অপরাধের শিকড়ই উপড়ে ফেলা যায়।’

মোহাজেরির ভাষ্য, যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক, সেটিই ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্য। কিন্তু এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইরান। তিনি আরও লেখেন, ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের অবশ্যই প্রজ্ঞার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং দেশকে যুদ্ধের ফাঁদে পড়তে দেওয়া যাবে না। ইরানকে ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে এই দুই অপরাধী শাসনের শিকড়ই নির্মূল করা যায়।’

মোহসেন রেজায়ির প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সাবেক কমান্ডার মোহসেন রেজায়ির সাম্প্রতিক মন্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও ইরানের ভেতরে তা তেমন গুরুত্ব পায়নি। ইরানের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাজনৈতিক বন্দি আহমদ জেইদাবাদি বলেন, জাতীয় ও আঞ্চলিক নীতিনির্ধারণে রেজায়ির প্রভাব খুবই সীমিত।

রোববার আইএসএনএ সংবাদ সংস্থা রেজায়ির উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, হরমুজ প্রণালি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘এই কৌশলগত জলপথের গুরুত্ব কয়েক ডজন পারমাণবিক বোমার চেয়েও বেশি।’ পরে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল এই মন্তব্য প্রকাশ করলে জেইদাবাদি টেলিগ্রামে প্রতিক্রিয়া জানান।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজের মন্তব্য ও গণমাধ্যমে কর্মকাণ্ডের কারণে একাধিকবার কারাবন্দি হওয়া জেইদাবাদি লেখেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থায় জনাব রেজায়ির ভূমিকা কি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁর মন্তব্য একটি বড় ইসরায়েলি পত্রিকার প্রথম পাতার সংবাদ হবে? মোটেও নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইরানের এমন ঘটনাগুলোকে বড় সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করছে, যেগুলো বাস্তবে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

যদিও ইরানের সরকারি রাজনৈতিক ভাষ্যে মোহসেন রেজায়িকে সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোতে এমন একাধিক উপদেষ্টা পদ রয়েছে, যেগুলো মূলত আনুষ্ঠানিক বা সম্মানসূচক। এসব পদ সাধারণত সাবেক কর্মকর্তাদের মর্যাদা ধরে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়, আর প্রকৃত নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা দেশের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত