Ajker Patrika

গাজায় ইসরায়েলের হত্যার টার্গেট নির্ধারণ করে দিচ্ছে এআই-অ্যালগরিদম

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১: ১০
গাজায় ইসরায়েলের হত্যার টার্গেট নির্ধারণ করে দিচ্ছে এআই-অ্যালগরিদম
১৫ মাসের সামরিক অভিযানে গাজা এখন ধ্বংসস্তূপ। ফাইল ছবি

ইসরায়েলি বামঘেঁষা ‘+৯৭২ ম্যাগাজিন’ এবং ‘লোকাল কল’ গাজায় পরিচালিত ইসরায়েলি গণহত্যামূলক যুদ্ধের আরেকটি অন্ধকার দিক তুলে এনেছে। এই দুই সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যগুলো গাজার সমসাময়িক যুদ্ধের অন্ধকারতম দিকগুলোর একটি উন্মোচন করেছে। এখানে গণহত্যা কেবল বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে নয়, বরং ডেটা, অ্যালগরিদম এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের খবরে উল্লিখিত দুই ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সিস্টেম ‘ল্যাভেন্ডার’ সেই সত্যটিই নিশ্চিত করেছে, যা ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধা, লেবানন এবং ইরান বছরের পর বছর ধরে বলে আসছে—প্রযুক্তি এখন জায়নবাদী যুদ্ধযন্ত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং গণনিধনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘ডিজিটাল গোপনীয়তা’ বা ‘ডিজিটাল প্রাইভেসি’র উদারপন্থী বুলি বাস্তব তথ্যের সামনে ধসে পড়েছে। হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলো ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’–এর প্রতিশ্রুতি দিলেও একটি জরুরি সত্য গোপন করে—এখানে বার্তার চেয়ে ‘মেটাডেটা’র মূল্য অনেক বেশি।

ল্যাভেন্ডার গাজা উপত্যকার প্রায় পুরো জনসংখ্যাকে (২৩ লাখের বেশি মানুষ) মূল্যায়ন করেছে এবং তাদের ওপর স্বয়ংক্রিয় ‘ঝুঁকি স্কোর’ (risk scores) আরোপ করেছে। কেবল একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে থাকা, চিহ্নিত কারও সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, বা ‘সন্দেহজনক’ কোনো ডিজিটাল প্যাটার্ন প্রদর্শন করাই মৃত্যুদণ্ডের তালিকায় নাম ওঠার জন্য যথেষ্ট। এই পুরো কাজটি করেছে এআই ‘ল্যাভেন্ডার।’

এখানে মানুষের তত্ত্বাবধান ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ন্যূনতম—মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। উচ্চমাত্রার ভুল হওয়ার সম্ভাবনা জেনেও এই মূল্যায়ন সচেতনভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। পুরো পরিবারকে তাদের নিজ ঘরে হত্যা করা হয়েছে এবং একটি অ্যালগরিদমিক সমীকরণে তাদের ‘গ্রহণযোগ্য আনুষঙ্গিক ক্ষতি’ (acceptable collateral damage) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা মূলত এই হত্যাকাণ্ডকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।

এটি কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়; বরং এটি নির্মূল করার একটি নীতি। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন নির্বিচার হামলা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করে এবং বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধাদের মধ্যে পার্থক্য করার নির্দেশ দেয়। প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে সিস্টেমগুলো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করে এবং নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুকে আগে থেকেই মেনে নেয়, সেগুলো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এটি প্রমাণ করে, গাজায় ইসরায়েলি এই গণহত্যা প্রযুক্তিগতভাবে সংগঠিত ও যুক্তিভিত্তিক প্রক্রিয়া।

এই মডেলটি যে যন্ত্রের ওপর টিকে আছে তা বৈশ্বিক। একবিংশ শতাব্দীর গোয়েন্দাগিরি এখন আর শুধু বার্তা আড়িপাতার ওপর নির্ভর করে না, বরং পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেম নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে। বেসরকারি প্ল্যাটফর্মগুলো গ্রহজুড়ে সামাজিক জীবনের স্থায়ী সেন্সর হিসেবে কাজ করছে। তারা এমন ডেটাবেইস তৈরি করছে যা মোসাদ ও সিআইএর মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য উন্মুক্ত—কখনো আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা, কখনো আইনি চাপ, আবার কখনো নিরাপত্তার দুর্বলতা ব্যবহারের মাধ্যমে। এটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স এবং সাম্রাজ্যবাদী নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে একটি কাঠামোগত মেলবন্ধনকে প্রতিনিধিত্ব করে।

অভিযোগটি স্পষ্ট—ইসরায়েল কেবল ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না, বরং ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করছে, যা এখন অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

লেবাননের হিজবুল্লাহ সতর্ক করেছে, এই মডেলটি একটি আঞ্চলিক হাইব্রিড যুদ্ধের অংশ, যেখানে ডিজিটাল নজরদারি, প্রযুক্তিগত নাশকতা এবং সুনির্দিষ্ট হামলার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। ২০২৪ সালে লেবাননে তাদের সদস্যদের ব্যবহৃত পেজারগুলোর সমন্বিত বিস্ফোরণের পর হিজবুল্লাহ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমে ঘোষণা করেছিল, ‘শত্রুরা বেসামরিক ডিভাইসগুলোকে গুপ্তহত্যার সরঞ্জামে পরিণত করেছে, যা প্রমাণ করে যে তাদের যুদ্ধের কোনো নৈতিক বা মানবিক সীমা নেই।’ এই ঘটনাটি দৈনন্দিন প্রযুক্তিকে মারণাস্ত্রে রূপান্তরের এক নতুন স্তর উন্মোচন করেছে।

এই ধরনটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক তদন্তে ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে সামরিক স্পাইওয়্যার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা প্রায়ই বিশ্ববাজারে সহজলভ্য স্মার্টফোনের মাধ্যমে করা হয়।

বার্তাটি দ্ব্যর্থহীন—যখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির যুক্তিতে প্রবেশ করানো হয়, তখন প্রতিটি সংযুক্ত ডিভাইস (Connected Device) নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ বা মৃত্যুর সম্ভাব্য হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের নেতারা এ বিষয়ে বিশেষভাবে সরব। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিভিন্ন বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জায়নবাদী শাসন একটি ক্যানসার টিউমার যা জনগণকে নিপীড়ন ও হত্যার জন্য আধুনিকতম সরঞ্জাম ব্যবহার করে।’

ইরানি কর্তৃপক্ষের মতে, গাজা হলো ভবিষ্যৎ সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের একটি পূর্বাভাস—যেখানে বিশ্ব অ্যালগরিদমিক নজরদারি, সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড এবং কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ ‘পরিচ্ছন্ন’ যুদ্ধের মাধ্যমে দ্বারা শাসিত হবে।

ল্যাভেন্ডারের এই বিষয়টি এভাবে একটি ‘ডিজিটাল নেক্রোপলিটিকস’ (Digital Necropolitics) বা ডিজিটাল মারণ-রাজনীতির সংহতকরণ প্রক্রিয়াকেই তুলে ধরে। এখানে অ্যালগরিদম ঠিক করে কে বাঁচবে আর কে মরবে; করপোরেশনগুলো পরিকাঠামো সরবরাহ করে; গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আড়াল থেকে কাজ করে; আর যান্ত্রিক ভাষা অগ্রহণযোগ্য বিষয়কে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। গাজায় রক্ত ঝরছে যাতে এই মডেলটি পরীক্ষা ও পরিমার্জন করা যায় এবং পরে অন্য কোথাও রপ্তানি করা যায়।

এই যুদ্ধযন্ত্রের নিন্দা করা ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এটি কেবল ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশের বিষয় নয়, যদিও সেই সংহতি জরুরি এবং আপসহীন। এটি এমন এক বিশ্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের লড়াই যেখানে জীবনের চেয়ে তথ্যের দাম বেশি, যেখানে প্রযুক্তি কাজ করে উপনিবেশবাদের সেবায়, এবং যেখানে গণহত্যাকে ‘অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আজ এটি গাজা; কাল এটি হতে পারে সেই সব মানুষ যারা প্রতিরোধের সাহস দেখাবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত