Ajker Patrika

গাজায় যুদ্ধবিরতির ‘দ্বিতীয় ধাপ শুরু’, ‘সাজানো’ নাটক বলছেন বিশ্লেষকেরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০: ২৬
১৫ মাসের সামরিক অভিযানে গাজা এখন ধ্বংসস্তূপ। ফাইল ছবি
১৫ মাসের সামরিক অভিযানে গাজা এখন ধ্বংসস্তূপ। ফাইল ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ঘোষণা দিয়েছেন, গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চালানো যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রণীত পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে স্টিভ উইটকফ বলেন, ট্রাম্পের ২০ দফার গাজা পরিকল্পনা এখন যুদ্ধবিরতি থেকে অগ্রসর হয়ে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাট শাসনব্যবস্থা এবং পুনর্গঠনের পর্যায়ে প্রবেশ করছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, দ্বিতীয় ধাপে গাজা শাসনের জন্য একটি অস্থায়ী প্রশাসন গঠন করা হবে। পাশাপাশি গাজাকে ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ করা হবে এবং শুরু হবে ‘পুনর্গঠন কার্যক্রম।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে হামাস তাদের সব দায়বদ্ধতা পুরোপুরি পালন করবে। এর মধ্যে রয়েছে শেষ মৃত জিম্মির মরদেহ দ্রুত ফেরত দেওয়া। এতে ব্যর্থ হলে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’

এদিকে গাজা সরকারের জনসংযোগ কার্যালয় জানিয়েছে, গত বছরের ১০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল ১ হাজার ১৯০ বারের বেশি লঙ্ঘন করেছে। এসব হামলায় চার শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং গাজায় জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। হামাস ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও উইটকফের ঘোষণার বিষয়ে তারা তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

বুধবার মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুম জানান, হামাস এর আগে বলেছিল, তারা ট্রাম্পের পরিকল্পনার আওতায় ‘গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত।’ তবে তিনি বলেন, ‘গাজা শাসন করবে যে অস্থায়ী সংস্থা, তার গঠন ও ক্ষমতা এখনো স্পষ্ট নয়।’

আবু আজ্জুম আরও বলেন, গাজার পুনর্গঠন নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। কারণ, ইসরায়েলের টানা বোমাবর্ষণে গাজার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বই এখানে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতির অবনতি হলে এই পরিকল্পনা বিলম্বিত বা পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে।’

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, তিনি রন গিভিলির মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। গিভিলি ছিলেন সাবেক ইসরায়েলি পুলিশ কর্মকর্তা, যাঁর মরদেহ এখনো গাজায় রয়ে গেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘রানের মরদেহ ফেরত আনা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ একই সঙ্গে বলা হয়, গাজা পরিচালনায় টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠনের পরিকল্পনা ‘গিভিলির মরদেহ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।’

যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফার এই পরিকল্পনা প্রথম উত্থাপন করা হয় গত সেপ্টেম্বরে। এতে আরও রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন এবং গাজার নিরাপত্তা তদারকিতে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন। গত সপ্তাহে নেতানিয়াহু বলেন, জাতিসংঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এই বোর্ডের নেতৃত্ব দেবেন। বোর্ডটি গাজায় গঠিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সরকারের তত্ত্বাবধান করবে।

এদিকে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার, তুরস্ক ও মিসর গাজায় ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট সংস্থা গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, এই সংস্থার প্রধান হবেন আলি আবদেল হামিদ শাথ। তিন দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, ‘এই কমিটি গঠনের মাধ্যমে গাজায় যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।’

তারা আরও জোর দিয়ে বলেছে, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং গাজার পুনর্গঠনের পরিবেশ তৈরির জন্য সব পক্ষকে চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে। তবে আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে। তাঁর মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি ‘ইসরায়েলের সাজানো।’

মারওয়ান বিশারা বলেন, ‘যখন একটি পক্ষকে সব সময় সুবিধা দেওয়া হয়, তখন কীভাবে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এগোতে পারে?’ তিনি আরও বলেন, এই পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীনতা কার্যত উপেক্ষিত। বিশারার ভাষায়, ‘গাজার মানুষ এখনো ভোগান্তিতে রয়েছে, অথচ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা নিজেদের শান্তির দূত হিসেবে তুলে ধরছেন।’ তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল গাজা ছাড়তে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রও ইসরায়েলের ওপর চাপ দিতে আগ্রহী নয়। ফলে দ্বিতীয় ধাপেও আমরা দীর্ঘ সময় আটকে থাকব।’

এদিকে জাতিসংঘ ও গাজায় কর্মরত শীর্ষ মানবিক সংস্থাগুলো আবারও ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন ‘খাদ্য, আশ্রয় সামগ্রী, ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের যন্ত্রপাতিসহ সব ধরনের সহায়তা নির্বিঘ্নে গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।’ আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের এই সহায়তা বাধা দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনে তাদের দায়িত্বের লঙ্ঘন।

এটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিরও লঙ্ঘন, যেখানে প্রতিদিন ‘৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের নির্দেশ ছিল।’ এই পরিস্থিতিতে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবার অপ্রস্তুত তাঁবু শিবির ও অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে, যেখানে তারা ‘শীতের কঠোর আবহাওয়ার মুখে পড়ছে।’

এদিকে বুধবার আলাদা এক ঘটনায়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরের পূর্বে বানি সুহেইলা মোড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নাসের হাসপাতালের এক চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে আল জাজিরাকে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে কমপক্ষে ১৫টি মরদেহ আনা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি আহত হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত