Ajker Patrika

হরমুজে গোপন রুট চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্র, প্রতিরাতে বের হচ্ছে ১ কোটি ব্যারেল তেল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হরমুজে গোপন রুট চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্র, প্রতিরাতে বের হচ্ছে ১ কোটি ব্যারেল তেল
প্রতীকী ছবি

হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ অংশে নীরবে এক বিশেষ ও গোপন নৌপথ চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এই পথ ব্যবহার করে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছাচ্ছে। যুদ্ধ এখনো অচলাবস্থায় থাকলেও হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন সচল রাখার এই উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন দুই কর্মকর্তা এই তথ্য জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই অভিযান চলছে। এর আওতায় প্রতিরাতে ১৫ থেকে ২০টি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালির দক্ষিণের একটি নৌপথ দিয়ে যাতায়াত করছে। নৌপথটি ওমানের উপকূলঘেঁষা। কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রবেশ করছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রণালিটি দিয়ে যে পরিমাণ তেল পরিবহন হতো, বর্তমান পরিমাণ তার প্রায় অর্ধেক।

তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই অভিযান যুদ্ধের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক প্রভাব, অর্থাৎ তেল সরবরাহে বিঘ্ন এবং এর কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, কিছুটা কমাতে সাহায্য করছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখনো যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় কম তেল বের হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই অভিযান শুধু তেলভর্তি ট্যাংকারকে নিরাপত্তা দিয়ে হরমুজ প্রণালি থেকে বের করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অভিযানের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র খালি তেলবাহী জাহাজকে আরব সাগর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করতেও সহায়তা করছে। এসব জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে তেল সংগ্রহ করে আবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।

অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এই অভিযানের পূর্ণাঙ্গ বিস্তারিত তথ্য এর আগে প্রকাশ্যে আসেনি। বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দুই মাস ধরে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণের পথ নিয়ন্ত্রণ করছি। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কিছুটা সমস্যা তৈরি করতে পারে, কিন্তু তারা প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করে না। নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে।’

হরমুজ প্রণালির এই অভিযান পরিচালনাকারী টাস্কফোর্সটি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থিত সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে পরিচালিত হচ্ছে। টাস্কফোর্সটি উপসাগরীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গেও সমন্বয় করছে। প্রতিদিন তারা একটি তালিকা তৈরি করে, যেখানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে আরব সাগরের দিকে বের হওয়া জাহাজগুলোর তথ্য থাকে।

একই সঙ্গে ভাড়া করা খালি তেলবাহী ট্যাংকারগুলোরও একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এসব জাহাজ আরব সাগর থেকে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর বন্দরে যায় এবং সেখানে তেল সংগ্রহ করে। প্রতি রাতে জাহাজগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি বড় বহর হিসেবে প্রণালি দিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য এবং আলাদা আরেকটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি বড় বহর হিসেবে ভেতরে প্রবেশের জন্য নির্ধারণ করা হয়। এরপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালির দক্ষিণের নৌপথ দিয়ে চলাচল করে।

জাহাজগুলোর নিরাপত্তার জন্য মার্কিন বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানও মোতায়েন রয়েছে। এসব যুদ্ধবিমান ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের দুই সপ্তাহব্যাপী একটি সামরিক অভিযান ইরানের রাডার এবং সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়ার পর এই নৌপথ চালু করা সম্ভব হয়েছে।

এর ফলে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণের নৌপথে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের নজরদারি ক্ষমতা কমে গেছে বলে দাবি করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য, ইরানের হাতে এখন কয়েকটি পুনরায় সচল করা রাডার রয়েছে। পাশাপাশি আইআরজিসির ছোট ছোট দ্রুতগতির নৌকায় থাকা পর্যবেক্ষকরাও জাহাজের গতিবিধি নজরদারি করছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানিরা অনেকটাই ‘অন্ধ’ হয়ে গেছে। ফলে জাহাজগুলো ঠিক কোন পথে চলছে, সে বিষয়ে তাদের নির্দিষ্ট তথ্য নেই। এ কারণে ইরান সাধারণভাবে জাহাজ চলাচল করতে পারে এমন এলাকাগুলোর দিকে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে। ইরানের হামলায় কয়েকটি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। তবে অনেক হামলা মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রতিহত করেছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, চলতি সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন বাহিনী আটটি ইরানি ড্রোন ও দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিরাতে ১৫ থেকে ২০টি তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালির দক্ষিণের নৌপথ দিয়ে ঢুকেছে বা বের হয়েছে। এর ফলে তেল রপ্তানি চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক তেল রপ্তানির গড় পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে এবং বর্তমানে তা প্রায় ১ কোটি ব্যারেলে পৌঁছেছে।

তবে গত কয়েক সপ্তাহের কিছু রাতে পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া তেলের পরিমাণ দেড় কোটি থেকে ২ কোটি ব্যারেল পর্যন্তও ছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। চলতি সপ্তাহের একটি রাতে ২০ টিরও বেশি জাহাজ হরমুজ প্রণালির দক্ষিণের নৌপথ দিয়ে যাতায়াতের জন্য নির্ধারিত ছিল। ওই রাতে প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেল প্রণালি দিয়ে বের হয়ে আসার সম্ভাবনা ছিল বলে জানান এক মার্কিন কর্মকর্তা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বুধবার অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল বের হচ্ছে।’ তবে ইরানের সঙ্গে এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র কোনো আলোচনা করছে না বলেও জানান তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সময় নষ্ট করছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করাও সময়ের অপচয়।’ ইরানের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানিদের এখনো কিছুটা লড়াই করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তারা নিজেদের আগের অবস্থার কেবল একটি খোলে পরিণত হয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত