Ajker Patrika

যুদ্ধের দামামার মধ্যেই রাশিয়া-ইরানের নেতাদের স্বাগত জানাল ভারত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ১৩
যুদ্ধের দামামার মধ্যেই রাশিয়া-ইরানের নেতাদের স্বাগত জানাল ভারত
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে নয়াদিল্লিতে জড়ো হচ্ছেন বিশ্বের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সম্মেলনের আগের দিন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আগামীকাল শনিবার শুরু হতে যাওয়া দুই দিনের এই সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যোগ দিচ্ছেন, যা ২০১৯ সালের পর তাঁর প্রথম ভারত সফর।

বিশ্বরাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান সংঘাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অস্থিরতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা—এসব বিষয়ই এবারের ব্রিকস সম্মেলনের মূল আলোচ্য হিসেবে উঠে আসছে।

যুদ্ধের ছায়ায় শুরু হচ্ছে সম্মেলন

সম্মেলনের আগে দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, গোটা বিশ্ব আজ একটি জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসনের কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের ওপর চাপ এক সংকটময় ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

পেজেশকিয়ান বলেন, ব্রিকস মূলত একতরফা আধিপত্যবাদের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সদস্য দেশগুলোর উচিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া। দিল্লিতে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে পৃথক বৈঠকও করেন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান সামরিক অভিযান—দুটি বড় সংঘাতই এবারের সম্মেলনের আলোচনায় প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মোদি-পুতিন বৈঠক

আজ ভ্লাদিমির পুতিনকে আলিঙ্গন করে স্বাগত জানান নরেন্দ্র মোদি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ ভারত সফরের পর এটি পুতিনের দ্বিতীয় দিল্লি সফর। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা অংশীদার।

ব্রিকস নেতাদের স্বাগত জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংস্কৃত ভাষায় একটি বার্তাও দেন মোদি। সেখানে তিনি লেখেন, ‘সবার সঙ্গে নয়, শুধু সজ্জন ও গুণীজনের সঙ্গেই বন্ধুত্ব ও আলোচনা করা উচিত।’ তাঁর এই বার্তাকে সম্মেলনের আগে ঐক্য ও সহযোগিতার আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাত বছর পর ভারতে সি চিন পিং

বিশ্বনেতাদের মধ্যে এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত উপস্থিতি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ২০১৯ সালে তামিলনাড়ুর মামাল্লাপুরমে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের সাত বছর পর এটাই তাঁর প্রথম ভারত সফর।

২০২০ সালের গালওয়ান সীমান্ত সংঘর্ষে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও গত এক বছরে ধীরে ধীরে বরফ গলতে শুরু করেছে। বিমান যোগাযোগ, ভিসা, উচ্চপর্যায়ের সংলাপ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং আজ বলেন, চীন ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার, সহযোগিতা বৃদ্ধি ও মতপার্থক্য সঠিকভাবে নিরসনের মাধ্যমে কাজ করতে প্রস্তুত। তবে সীমান্তে বিরোধ, ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যঘাটতি ও আঞ্চলিক কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে রেখেছে।

এদিকে সি চিন পিংয়ের সফরের বিরোধিতা করে আজ নয়াদিল্লিতে কয়েকজন নির্বাসিত তিব্বতি বিক্ষোভ করেছেন। তাঁরা তিব্বতে চীনের নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

সম্প্রসারিত ব্রিকসের বড় পরীক্ষা

২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে গঠিত ব্রিকস এখন ১১ সদস্যের জোটে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এতে যোগ দিয়েছে।

তবে সদস্যসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মতপার্থক্যও বেড়েছে। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে কেন্দ্র করে ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন।

ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক হর্ষ ভি পন্ত বলেন, এবারের ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় বিভাজনরেখা হবে উপসাগরীয় সংঘাত। গত বছর যেটিকে ব্রিকসের সম্প্রসারণের সাফল্য বলা হচ্ছিল, আজ সেটিই জোটের বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষক শিলান শাহও মনে করেন, ইরান যুদ্ধ ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠবে। তাঁর মতে, দিল্লিতে গত মে মাসে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও সদস্যরা যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেননি।

ভারতের সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য

ভারত একদিকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্য দিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারত্ব ধরে রেখেছে। একই সময়ে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করছে নয়াদিল্লি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বহুমাত্রিক ভারসাম্যই এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কারণ, একই টেবিলে বসছেন এমন সব নেতা, যাঁদের মধ্যে কেউ যুদ্ধরত, কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী, আবার কেউ একই আঞ্চলিক সংকটে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে রয়েছেন।

ভারতের রাজধানীজুড়ে ইতিমধ্যে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শহরের প্রধান সড়ক, হোটেল ও সম্মেলনস্থল ভারত মণ্ডপম ঘিরে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মোদির বিশাল প্রতিকৃতি ও ব্রিকসের ব্যানারে সেজে উঠেছে নয়াদিল্লি, যেখানে বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।

তথ্যসূত্র: এএফপি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত