Ajker Patrika

১৫ বছর আগের যে দিনটি এত দূর নিয়ে এল শুভেন্দুকে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ০০: ৩০
১৫ বছর আগের যে দিনটি এত দূর নিয়ে এল শুভেন্দুকে
শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: সংগৃহীত

সবকিছু ঠিক থাকলে আজ (শনিবার) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বিজেপির নেতা শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শুভেন্দুর এই উত্থান অনেকের কাছেই এক নাটকীয় রাজনৈতিক যাত্রার নাম। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই নেতা আজ মমতারই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, শুভেন্দুর এমন উত্থান হঠাৎ করেই হয়নি। এই যাত্রার গল্পটি শুরু হয়েছিল ১৫ বছর আগেই, ২০১১ সালে। সেই বছর ধর্মতলা ও ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে তৃণমূলের বিশাল সমাবেশে তিনি উপস্থিত ছিলেন যুব তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে। কিন্তু মঞ্চে থেকেও তিনি ছিলেন প্রায় অদৃশ্য। পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা ও ঘোষণার দায়িত্বে ছিলেন কুণাল ঘোষ। তিনি জনতাকে উজ্জীবিত করছিলেন, কর্মসূচি পরিচালনা করছিলেন, আর শুভেন্দু ছিলেন নীরব দর্শক। রাজনৈতিকভাবে উচ্চাভিলাষী শুভেন্দুর কাছে এটি ছিল বড় ধরনের অপমান।

সেই সময় থেকেই তাঁর মনে ক্ষোভ জন্মাতে শুরু করে বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হয়। তিনি মনে করেছিলেন, দলীয় নেতৃত্বে তাঁর গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নীরবে সেটিকে সমর্থন করছেন।

এরপর আরও কিছু ঘটনা তাঁর অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে। যুব তৃণমূলের নেতৃত্বের প্রশ্নে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌমিত্র খানের মতো নেতাদের সামনে আনা হয়, আর শুভেন্দু ক্রমে সংগঠনের কেন্দ্রীয় জায়গা থেকে সরে যেতে থাকেন। একই সময়ে তৃণমূলে মুকুল রায়ের প্রভাব দ্রুত বাড়ছিল। সংগঠনের ভেতরে মুকুল রায় ও পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলীয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হলে শুভেন্দু বুঝতে পারেন, তিনি হয়তো আর শক্তিশালী নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছাতে পারবেন না।

রাজনীতির এই পরিবর্তনের মধ্যে বিজেপির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও বাড়তে থাকে। তবে বিষয়টি সহজ ছিল না। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী ছিলেন দীর্ঘদিনের কংগ্রেস রাজনীতির মানুষ। শুরুতে ছেলের বিজেপিতে যাওয়া নিয়ে তিনিই বিরোধিতা করেছিলেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও শুভেন্দুকে দলে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব শুভেন্দুর সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের সঙ্গে শুভেন্দুর পার্থক্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মুকুল রায়কে বিজেপি গ্রহণ করেছিল একজন অভিজ্ঞ সাংগঠনিক নেতা হিসেবে। কিন্তু শুভেন্দুকে দেখা হয়েছিল মমতা-বিরোধী রাজনীতির সম্ভাব্য মুখ হিসেবে। বিজেপি নেতৃত্ব মনে করেছিল, তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিকল্প আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হতে পারেন।

শেষ ধাক্কাটি এসেছিল দিঘায় তৃণমূলের এক বড় সম্মেলনকে ঘিরে। পূর্ব মেদিনীপুরে অধিকারী পরিবারের শক্ত ঘাঁটিতে আয়োজিত সেই সম্মেলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন শুভেন্দু। কিন্তু তিনি অনুভব করেন, তাঁর অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এরপরই সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত হয়ে যায়।

২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর অমিত শাহর উপস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারী আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। এর পরের বছর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি নন্দীগ্রামে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেন। এই জয় তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত করে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু হয়ে ওঠেন বিজেপির অন্যতম প্রধান মুখ। বিজেপি ও আরএসএসের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়। আরএসএসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। এখন তিনি নাগরিকত্ব, অনুপ্রবেশ, বাংলাদেশ প্রসঙ্গ ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে সরব অবস্থান নিয়েছেন।

তবে শুভেন্দুর ব্যক্তিগত জীবনও আলোচনার বিষয়। তিনি স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারার অনুরাগী। ঘনিষ্ঠদের মতে, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অতিথিপরায়ণ ও সংযমী। তিনি কখনো বিয়ে করেননি। রাজ্য ও কেন্দ্র—উভয় পর্যায়ে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের মধ্যে তিনিই অন্যতম।

২০১১ সালে যে মানুষটি মঞ্চে নীরবে বসে ছিলেন, আজ তিনিই পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বহুত্ববাদী ও সাংস্কৃতিকভাবে বৈচিত্র্যময় সমাজে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—সেই প্রশ্নটির উত্তর সময়ই দেবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

অনলাইন জুয়ার দেড় কোটি টাকার ভাগ-বণ্টন নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসের পর সরকারি কর্মচারীর আত্মহত্যা

র‍্যাবের তালিকা: খুলনায় ৩৩ চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী

এমএলএ বাগিয়ে সরকার গঠনের চেষ্টা বিরোধীদের, বিজয়ের দলের বিধায়কদের গণপদত্যাগের হুমকি

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী: শুভেন্দু প্রায় নিশ্চিত, পেতে পারেন দুই ডেপুটি

মির্জা ফখরুল-ফাতেমাসহ আরও যাঁরা পাচ্ছেন খালেদা জিয়া স্মৃতি স্বর্ণপদক

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত