Ajker Patrika

রামমন্দিরে দানের কোটি কোটি রুপি আত্মসাতের অভিযোগ, ভারতজুড়ে তোলপাড়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ১১: ১৮
রামমন্দিরে দানের কোটি কোটি রুপি আত্মসাতের অভিযোগ, ভারতজুড়ে তোলপাড়
ফাইল ছবি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে অযোধ্যার জমকালো রামমন্দির উদ্বোধনের আড়াই বছর পর, বড়সড় বিতর্কের মুখে পড়েছে এই তীর্থক্ষেত্র। ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি রুপির অনুদান ও মূল্যবান সামগ্রী আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক।

উত্তর প্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যা শহরের এই মন্দিরটি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ এই মন্দিরে দর্শন করতে আসেন। কিন্তু সম্প্রতি ভক্তদের দেওয়া নগদ অর্থ, সোনা ও রুপার গয়নার ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিবিআই) দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে এ ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়ে একাধিক পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি ‘বিশেষ তদন্ত দল’ (এসআইটি) গঠন করেছে। তবে মন্দির পরিচালনাকারী সংস্থা ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

২ দশমিক ৭ একর জায়গার ওপর নির্মিত তিনতলা এই মন্দির কমপ্লেক্সে প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার ভক্ত সমবেত হন। ছুটির দিন ও ধর্মীয় উৎসবে এই সংখ্যা তিন গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ভক্তদের দেওয়া অনুদান সংগ্রহের জন্য পুরো মন্দির প্রাঙ্গণে প্রায় ৩৫টি দানবাক্স রয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ট্রাস্টের বার্ষিক আয় ছিল ৩ দশমিক ২৭ বিলিয়ন রুপি (প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার); যা আয়ের দিক থেকে এটিকে ভারতের অন্যতম ধনী মন্দিরে পরিণত করেছে।

সম্প্রতি অযোধ্যার সাবেক এক স্থানীয় বিধায়ক অভিযোগ করেছেন, মন্দির থেকে সাত কোটি রুপিরও (প্রায় ৭ লাখ ৩৯ হাজার ডলার) বেশি অর্থ গায়েব হয়ে গেছে।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘দানবাক্স খোলা থেকে শুরু করে টাকা গণনার পুরো প্রক্রিয়াটি সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (এসবিআই) কর্মকর্তা এবং আমাদের ট্রাস্টের সদস্যদের উপস্থিতিতে অডিট করা হয়। এখানে কোনো ধরনের অমিল বা গরমিল পাওয়ার সুযোগ নেই।’

যেভাবে বিতর্কের সূত্রপাত

এই আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি প্রথম সামনে আনেন মহিপাল সিং। যিনি আগে ট্রাস্টের হিসাবরক্ষণ দলের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁকে এখন এই ঘটনার ‘হুইসেলব্লোয়ার’ বা তথ্যফাঁসকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মহিপাল সিং দাবি করেছেন, নগদ টাকা ও মূল্যবান ধাতু গণনার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ কিছু অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিবিসি হিন্দির পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তিনি নিজের জীবননাশের হুমকির কথা উল্লেখ করে বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি।

তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি পাচ্ছি। চরম মানসিক চাপের মধ্যে আছি আমি। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে নতুন কিছু বলা সম্ভব নয়। এ পর্যন্ত জনসমক্ষে আমি যা বলেছি, দয়া করে সেটিকে আমার বক্তব্য হিসেবে ধরে নিন।’

যদিও মহিপাল সিংয়ের অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। ৭ জুন উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেন।

সমাজবাদী পার্টির স্থানীয় সংসদ সদস্য অবধেশ প্রসাদ দাবি করেছেন, তদন্ত চলাকালীন ট্রাস্টের অভিযুক্ত সদস্যদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা উচিত। এমনকি ক্ষমতাসীন দল বিজেপির স্থানীয় নেতা রজনীশ সিংও এই অনুদান বিতর্কের সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

অযোধ্যার সাধারণ মানুষ ও ভক্তদের মধ্যে এ ঘটনা গভীর ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা বিজয় লক্ষ্মী বিবিসি হিন্দিকে বলেন, ‘ভক্তদের দেওয়া দান মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ এবং তীর্থযাত্রীদের কল্যাণের জন্য। এটি কারও নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য নয়।’

সন্তোষ পুরী নামের আরেকজন এই অভিযোগকে ‘ধর্মের ওপর এক মারাত্মক আঘাত’ বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে অজয় কুমার বর্মা নামের এক বাসিন্দা বলেন, ‘অযোধ্যা ঈশ্বরের ধাম, এখানে এমনটা হওয়া উচিত নয়। যারা অভিযুক্ত তারা দীর্ঘ সময় ধরে মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত, তাই বিশ্বাস করা কঠিন হচ্ছে।’

তীব্র সমালোচনার মুখে উত্তর প্রদেশ সরকার যে তিন সদস্যের ‘এসআইটি’ গঠন করেছিল, তারা গত মঙ্গলবার সরকারের কাছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে চূড়ান্ত রিপোর্টের জন্য তারা আরও কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেছেন, ‘যাঁদের কাছে এ বিষয়ে তথ্য বা প্রমাণ রয়েছে, তাঁরা যেন তা তদন্তকারীদের কাছে জমা দেন। সত্য অবশ্যই সামনে আসবে। শত শত বছর অপেক্ষা করে যাঁরা রামমন্দির পেয়েছেন, তাঁরা সত্য জানতে আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতেই পারেন।’

এদিকে, বিষয়টি ভারতের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত থাকায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সিবিআই তদন্তের জন্য চাপ বাড়ছে। সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রধানমন্ত্রী, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠিয়ে লিখেছেন, ‘এই অনুদানগুলো সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক আয় নয়, এগুলো পবিত্র অর্ঘ্য। এই অর্থের যেকোনো ধরনের অপব্যবহার বা আত্মসাৎ কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর বিশ্বাসের সঙ্গে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত