Ajker Patrika

প্রয়োজনীয় সীমার নিচে প্রজনন হার: ভারতের ‘তরুণ জনশক্তি’ কি তবে বার্ধক্যের মুখে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ১৫: ৪৫
প্রয়োজনীয় সীমার নিচে প্রজনন হার: ভারতের ‘তরুণ জনশক্তি’ কি তবে বার্ধক্যের মুখে
ভারতে জনসংখ্যা স্বাভাবিক রাখার চেয়ে কম মাত্রার নিচে নেমে গেছে প্রজনন হার। ছবি: এএফপি

ভারতে প্রথমবারের মতো প্রজনন হার জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে গেছে। এতে ভবিষ্যতে দেশটির শ্রমশক্তি সংকুচিত হওয়া, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর দ্রুত বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দশকের পর দশক ধরে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেখেছে ভারত। সরকারি পরিসংখ্যান, বিশেষ করে স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেমের (এসআরএস) তথ্য দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছিল, দেশে প্রজনন হার ক্রমেই কমছে। তবে এত দিন তা জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা বজায় রাখার মতো পর্যায়ে ছিল। এখন আর সেই ধারা নেই।

গত মাসে ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেনসাস কমিশনারের দপ্তর প্রকাশিত সর্বশেষ এসআরএস প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট—টিএফআর) প্রতি নারীর ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৯-এ নেমে এসেছে। অথচ দীর্ঘ মেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় প্রতিস্থাপন হার ২ দশমিক ১। টিএফআর বলতে একজন নারী তাঁর জীবদ্দশায় গড়ে কত সন্তানের জন্ম দিতে পারেন, সেই সংখ্যাকে বোঝায়। ২০০০-এর দশকে ভারতে প্রতি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার প্রসার, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সহজলভ্যতা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সন্তান প্রতিপালনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় প্রজনন হার কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। ভারতের সামাজিক নীতি নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ দীপা সিনহা বলেন, ‘সমাজে যখন নারীরা বেশি শিক্ষা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সুবিধা এবং পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পান, তখন সাধারণত মোট প্রজনন হার কমে যায়। একই সঙ্গে অর্থনীতি ব্যয়বহুল হয়ে উঠলে সন্তান লালন-পালনের খরচও বৃদ্ধি পায়, যা জন্মহার কমিয়ে দেয়।’

দীপা সিনহা আরও বলেন, ‘শিশুমৃত্যুর হার কমে যাওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সর্বশেষ এসআরএস প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভারতে ২০১৯ সালে প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩০। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৪-এ। ফলে পরিবারগুলো বেশি সন্তান নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আগের মতো অনুভব করছে না।’

দেশজুড়ে প্রজনন হারে উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক বৈষম্যও দেখা যাচ্ছে। মে মাসে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, উত্তর ভারতের দরিদ্র রাজ্য বিহারে দেশের সর্বোচ্চ প্রজনন হার ২ দশমিক ৯। এরপরই রয়েছে উত্তর প্রদেশ, যেখানে হার ২ দশমিক ৬। তুলনামূলকভাবে শিক্ষায় ও স্বাস্থ্যসেবায় এগিয়ে থাকা নয়াদিল্লিতে এই হার মাত্র ১ দশমিক ২। একইভাবে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু ও কেরালায় প্রতি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার ১ দশমিক ৩।

দীপা সিনহার ভাষ্য, ১৯৮০-এর দশক থেকে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সমাজে নারীর অবস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই কারণগুলোই সেখানে নিম্ন প্রজনন হারে ভূমিকা রেখেছে।

ভারত ২০০৫ সালে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধার যুগে প্রবেশ করে। এটি এমন একটি পর্যায়, যখন কর্মক্ষম বয়সী মানুষের সংখ্যা শিশু ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের এই সুবিধাজনক সময়কাল ২০৫৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

অতীতে জাপান, সিঙ্গাপুর ও হংকং ১৯৬০-এর দশকে এবং চীন ১৯৮০-এর দশকে এই পর্যায়ে প্রবেশ করে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছিল। চীন বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। ভারতের ক্ষেত্রেও জনমিতিক সুবিধা অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে দেশটিতে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার এবং চীনের মতো উন্নত অর্থনৈতিক অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জন্মহার ক্রমাগত কমতে থাকলে ভারত হয়তো এই জনমিতিক সুবিধার পূর্ণ সুফল আর পাবে না। কারণ, এতে ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সংকুচিত হবে এবং প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। দীপা সিনহা বলেন, ‘যদি কম শিশু জন্ম নেয়, তাহলে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বছর পর ভারতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হবে। তাঁরা শ্রমবাজারে ততটা অংশ নিতে পারবেন না। এতে দেশের কর্মশক্তির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।’

জনসংখ্যার পরিবর্তিত চিত্র ভারতের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উর্বরতার হারে বড় ধরনের পার্থক্যের অর্থ হলো, উত্তর ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলো ভবিষ্যতে ভারতের মোট জনসংখ্যার আরও বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করবে।

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার, তাদের তুলনামূলক কম অর্থ বরাদ্দ দিয়ে কার্যত শাস্তি দিচ্ছে। দীপা সিনহার মতে, কেন্দ্র থেকে রাজ্যগুলোর মধ্যে আর্থিক সম্পদ বণ্টন ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হতে পারে।

এ বছরের শেষ দিকে ভারত সরকার সংসদে ‘ডিলিমিটেশন’ বা নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ নীতি উপস্থাপন করবে। নতুন জনগণনার ভিত্তিতে প্রতিটি রাজ্যের জনসংখ্যা অনুযায়ী সংসদীয় আসন পুনর্বণ্টন করা হবে। জনগণনা কার্যক্রম এ বছর শুরু হয়েছে এবং ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। সিনহা বলেন, ‘ডিলিমিটেশন কার্যকর হলে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর সংসদীয় আসনের অংশ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।’

জনসংখ্যা নিয়ে ধর্মীয় রাজনীতিও ভারতে নতুন নয়। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দীর্ঘদিন ধরে এমন ধারণা উসকে দিয়েছে যে মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় বেশি সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। এর ফলে অনেক হিন্দুর মধ্যে একদিন মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেতে পারেন, এমন আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত হিন্দু দম্পতিদের অন্তত তিন থেকে চারটি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর দাবি ছিল, এর মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে হিন্দু সমাজের সম্ভাব্য অবক্ষয় ঠেকানো সম্ভব হবে।

তবে সরকারি তথ্য ভিন্ন চিত্র দেখায়। ২০১১ সালের সর্বশেষ জনগণনা অনুযায়ী, ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ ছিল মুসলমান। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলমানদের উর্বরতার হার ৪ দশমিক ৪১ থেকে কমে ২ দশমিক ৩৬-এ নেমে এসেছে। একই সময়ে হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা ৩ দশমিক ৩ থেকে কমে ১ দশমিক ৯৪ হয়েছে। সর্বশেষ জরিপ আরও দেখিয়েছে যে ভারতের সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রজনন হার দ্রুত কমছে।

কমতে থাকা জন্মহার মোকাবিলায় ভারত সরকার এখনো জাতীয় পর্যায়ে কোনো নীতি ঘোষণা করেনি। তবে কয়েকটি রাজ্য সরকার সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে উদ্যোগ নিয়েছে। গত মাসে অন্ধ্র প্রদেশ সরকার ঘোষণা করেছে, কোনো পরিবারে তৃতীয় সন্তান জন্ম নিলে ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তান জন্ম নিলে ৪০ হাজার রুপি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এসআরএস তথ্য অনুযায়ী, অন্ধ্র প্রদেশের মোট প্রজনন হার বর্তমানে ১ দশমিক ৪।

এ ছাড়া গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানা রাজ্যে প্রথমবারের মতো সন্তান নিতে ইচ্ছুক দম্পতিদের জন্য সরকার-অর্থায়িত আইভিএফ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যাতে মানুষকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করা যায়। দীপা সিনহার মতে, মানুষের ব্যক্তিগত প্রজননসংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

দীপা সিনহা বলেন, ‘ভারতের মতো দেশগুলোর জন্য তাদের জনমিতিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের ভিত্তিতে জননীতি তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা একটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হতে যাচ্ছি, তাহলে বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষের সহায়তার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’

দীপা সিনহার মতে, এখনই এমন নীতি প্রয়োজন যা প্রবীণদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

শুধু ভারত নয়, এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশও দ্রুত কমে যাওয়া জন্মহারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চীনের প্রজনন হার ১, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ২ দশমিক ১-এর অনেক নিচে। তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির মোট প্রজনন হার প্রায় শূন্য দশমিক ৮৬ এবং তা আরও কমতে পারে। আর জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতি নারীর গড় সন্তানসংখ্যা মাত্র শূন্য দশমিক ৭৫, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বনিম্ন উর্বরতার হার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে কমে যাওয়া জন্মহার, অন্যদিকে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া সমাজ। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হিসেবে ভারতের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং রাজনীতি কতটা সফলভাবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সেটিই আগামী দশকগুলোর বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত