Ajker Patrika

অবহেলিত আতাফলের বিস্ময়কর উত্থান ভারতে, নেপথ্যে কী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
অবহেলিত আতাফলের বিস্ময়কর উত্থান ভারতে, নেপথ্যে কী
আতাফল। ছবি: বিবিসি

ভারতে কাস্টার্ড আপেল বা আতাফলের চাষ এখন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে। একসময় অবহেলিত এই ফলটি এখন স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে। কম পানিতে টিকে থাকা, তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদন এবং উন্নত জাত উদ্ভাবনের কারণে আতাফল ধীরে ধীরে কৃষকদের কাছে লাভজনক ফসলে পরিণত হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৬ মে) এই বিষয়ে প্রকাশিত বিবিসির প্রতিবেদনে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের কোলার জেলার কৃষক পরিবারের সন্তান অশোকা শিবারেড্ডির গল্প তুলে ধরেছে। খরাপ্রবণ কোলার জেলায় বৃষ্টিপাত খুব কম হয়। ফলে কৃষকদের গভীর নলকূপ খনন করে পানি তুলতে হয়, আর এতে অধিকাংশ অর্থ ব্যয় হয়ে যায়। একসময় লোকসানের কারণে শিবারেড্ডির পরিবার কৃষিকাজ ছেড়ে বেঙ্গালুরুতে চলে যায় এবং সবজির ব্যবসা শুরু করে। পরে শিবারেড্ডি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

তবে কৃষির প্রতি টান কখনোই হারাননি তিনি। ২০১৮ সালে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পারিবারিক খামার পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এমন একটি ফসল খুঁজছিলেন, যা কম পানিতে বাঁচতে পারে, বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল হবে এবং কীটনাশকের প্রয়োজন কম হবে। সেই ভাবনা থেকেই বেছে নেন আতাফল।

আতাফলের নরম ও মিষ্টি শাঁস অনেকটা কাস্টার্ডের মতো স্বাদের হওয়ায় ইংরেজিতে এটির নামকরণ হয়েছে কাস্টার্ড আপেল। শিবারেড্ডির এলাকায় এই ফলের গাছ আগে বুনোগাছ হিসেবেই জন্মাত এবং স্থানীয়রা বাজারে বিক্রি করতেন। তবে এই ফলটির সম্ভাবনা দেখে শিবারেড্ডি পরিকল্পিতভাবে চাষ শুরু করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাধারণ খামারের তুলনায় কাছাকাছি দূরত্বে গাছ লাগিয়েছেন তিনি। মোট তিন ধরনের জাত নির্বাচন করেছেন। ফলও পেয়েছেন ভালো। গত বছর তিনি প্রায় ২০ টন ফল উৎপাদন করেন, আর চলতি বছরে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৫ টন।

তবে আতাফলের চাষে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রচলিত ‘বালাঙ্গার’ জাতের ফল খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়—মাত্র তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই। এ ছাড়া এতে বীজ বেশি থাকায় ক্রেতাদের আগ্রহও কমে যায়।

এই সমস্যার সমাধানে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব হর্টিকালচার রিসার্চের বিজ্ঞানীরা ‘আরকা সাহান’ নামে একটি হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেছেন। এই জাতের ফল ঘরের তাপমাত্রায় প্রায় এক সপ্তাহ ভালো থাকে, বীজ কম এবং শাঁস বেশি। গবেষকদের মতে, বুনো জাতের তুলনায় এই জাত থেকে প্রায় দ্বিগুণ ব্যবহারযোগ্য ফল পাওয়া যায়।

এখন গবেষকেরা ফলের শাঁস দীর্ঘ সময় সাদা ও সতেজ রাখার প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন, যাতে এটি আইসক্রিম, মিল্কশেকসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে আরও বেশি ব্যবহার করা যায়।

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্য বর্তমানে আতাফলের সবচেয়ে বড় উৎপাদক। সেখানকার কৃষক নবনাথ মালহারি কাসপাটে বহু বছর ধরে নতুন জাত উদ্ভাবনে কাজ করছেন। দীর্ঘ গবেষণার পর তিনি ‘এনএমকে-০১’ নামে উচ্চফলনশীল একটি জাত তৈরি করেন, যা ২০১৪ সালে বাজারে আসে। এই জাতের ফল সহজে নষ্ট হয় না এবং রপ্তানির জন্য উপযোগী। বর্তমানে তাঁর খামারে প্রায় ৫০ একর জমিতে আতাফল চাষ হচ্ছে।

এখন এই ফল যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইউরোপেও রপ্তানি হচ্ছে। তবে রপ্তানি প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। ফল সংগ্রহ, প্যাকেজিং, শীতলীকরণ ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আতাফল এখন আর শুধু একটি স্থানীয় ফল নয়; এটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যে পরিণত হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত