Ajker Patrika

ইউক্রেনে ‘ডাইনি বাহিনী’র হানি ট্র্যাপে কুপোকাত রুশ সেনারা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ২১: ৪৬
ইউক্রেনে ‘ডাইনি বাহিনী’র হানি ট্র্যাপে কুপোকাত রুশ সেনারা
প্রতীকী ছবি। ছবি: এএফপি

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ গড়িয়েছে পঞ্চম বছরে। প্রথম দিকে রুশ ছত্রীসেনাদের রুখে দিতে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের খালি হাতে প্রতিরোধ যেমন বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান ছিল, বর্তমান যুদ্ধের কৌশল তার চেয়ে অনেকটা ভিন্ন। অবরুদ্ধ ও রুশ অধিকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে এই প্রতিরোধ এখন পুরোপুরি রূপ নিয়েছে ‘ছায়া যুদ্ধে’। আর এই গোপন যুদ্ধের নেপথ্যে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে একদল নারী বা ছদ্মনামধারী পুরুষ গোয়েন্দা, যাদের প্রতিরোধ কমান্ডাররা আদর করে ডাকছেন ‘ভিদমা’ বা ‘ডাইনি’।

বিশ্বখ্যাত মার্কিন সাময়িকী দ্য আটলান্টিকের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইউক্রেনের এই ‘ডাইনি বাহিনী’ এবং তাদের ভয়ংকর সব গোয়েন্দা জালের চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে।

অধিকৃত ইউক্রেনের এক রুশ সেনা বেশ কয়েক মাস ধরে ভাবছিলেন, তিনি এক নিঃসঙ্গ ইউক্রেনীয় গৃহবধূর প্রেমে পড়েছেন। হোয়াটসঅ্যাপ ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপে তাঁদের দীর্ঘদিনের আলাপচারিতা একসময় গভীর রোমান্সে রূপ নেয়। একদিন ওই নারী সেনাটির ক্যাম্প দেখতে চাইলে তিনি একটি ছবি পাঠান। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব আবছাভাবে তাঁদের সামরিক ঘাঁটির একটি ম্যাপ বা মানচিত্র দেখা যাচ্ছিল।

বাস্তবে কিন্তু ওই নারীর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। অ্যাকাউন্টটি পরিচালনা করছিলেন ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (এইচইউআর) একজন পুরুষ কর্মকর্তা। ছবি পাঠানোর মাত্র ১৫ মিনিটের মাথায় সেই সুনির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক বা কো-অর্ডিনেট লক্ষ্য করে নিখুঁত ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেনীয় বাহিনী। অনেক সময় এমনও হয়েছে, ওপাশে রুশ সেনা চ্যাট করছেন, আর এপাশে ড্রোন আঘাত হেনেছে।

কারা এই ভিদমা বা ডাইনি

ইউক্রেনীয় লোকগাথায় ভিদমা শব্দের অর্থ এমন এক নারী, যার কাছে এমন কিছু বিশেষ জ্ঞান থাকে, যা সাধারণের নাগালের বাইরে। ইউক্রেনের সাবেক সংসদ সদস্য লেসিয়া ওরোবেটস দ্য আটলান্টিককে বলেন, ইউক্রেনীয় সমাজে এই নারীদের ডাইনি বলে পুড়িয়ে মারা হতো না। তাঁদের জ্ঞানকে সম্মান করা হতো।

বর্তমানে এই ডাইনিরা হলেন ইউক্রেনের সেই সাধারণ নারীরা, যাঁরা প্রতিদিন সকালে বাজার করার বাহানায় রুশ চেকপোস্ট পার হন; যাঁরা অধিকৃত অঞ্চলের স্কুল, ক্লিনিক কিংবা রাশিয়ার বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন এবং রুশ সেনাদের প্রতিটি গতিবিধি ডায়েরিতে টুকে রাখেন।

মারিউপোলের এক প্রতিরোধ সেলের প্রধান পেত্রো আন্দ্রিয়ুশচেঙ্কো বলেন, ‘নারীরা এমন সব জায়গায় যেতে পারেন এবং এমন সব কাজ করতে পারেন, যা পুরুষদের পক্ষে অসম্ভব। তা ছাড়া তাঁরা শত্রুর প্রতি অত্যন্ত নির্মম।

রান্নাঘর থেকে পরিচালিত হচ্ছে যুদ্ধের ‘কিল চেইন’

ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ যোদ্ধারা এই ‘হানি ট্র্যাপ’ পাততে সুনির্দিষ্ট ও পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন। ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া ‘ইউক্রেনীয় উইমেনস গার্ড’ নামের একটি সংস্থা এ পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি নারীকে টিকে থাকা, আত্মরক্ষা এবং প্রতিরোধের কৌশল শিখিয়েছে।

মজার বিষয় হলো, এই গুপ্তচরবৃত্তির কাজ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। জার্মানি, পোল্যান্ড কিংবা অন্য কোনো দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া সাধারণ ইউক্রেনীয় গৃহিণীরাও এই দূরনিয়ন্ত্রিত কিল চেইনের অংশ হয়ে উঠেছেন। নিজেদের অঞ্চলের অলিগলি, কোন গুদামঘরটি রুশ বাহিনী ব্যবহার করছে—এসব পুরোনো স্মৃতি মিলিয়ে তাঁরা বিদেশ থেকে ড্রোনের টার্গেট নিশ্চিত বা ভেরিফাই করেন।

দক্ষিণ ইউক্রেনের খেরসনে রোকসানা (ছদ্মনাম) নামে এক শরণার্থী নারী বর্তমানে দেশের বাইরে থেকে টার্গেট ভেরিফায়ার হিসেবে কাজ করছেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—নিজের চেনা জায়গায় ড্রোন হামলার স্থানাঙ্ক দিতে তাঁর খারাপ লাগে কি না? তাঁর সটান জবাব, ‘গুদামঘর আমরা আবার বানিয়ে নিতে পারব, কিন্তু রাশিয়ানরা মরে গেলে তো আর বেঁচে ফিরবে না।’

তবে এই ডাইনি বাহিনীর মূল লক্ষ্য শুধু রুশ সেনাদের হত্যা করা নয়, বরং তাঁদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক বা ‘প্যারানোয়া’ তৈরি করা।

মারিউপোলে ছদ্মনামে সক্রিয় ‘সেস্ত্রা’ নামের এক এজেন্ট বলেন, ‘আমি চাই ইউক্রেনের মাটিতে পা রাখা প্রত্যেক রুশ সেনা প্রতি সেকেন্ডে এই দমবন্ধ করা আতঙ্কে ভুগুক। বাজারে সবজি বিক্রি করা বয়স্ক নারী, বাসের ড্রাইভার, ক্লিনিকের ডাক্তার কিংবা সাধারণ পথচারী—সবার দিকে তাকিয়েই যেন রুশ সেনারা নিজেদের নিশ্চিত মৃত্যু দেখতে পায়।’

দ্য আটলান্টিকের পক্ষ থেকে সাবেক সংসদ সদস্য ওরোবেটসকে যখন বিদেশে জিজ্ঞেস করা হয়, যুদ্ধে ইউক্রেনের পুরুষ শেষ হয়ে গেলে কী হবে? তিনি হাসিমুখে উত্তর দেন, ‘সাবধান! ইউক্রেনের নারীরা যদি পুরোপুরি যুদ্ধের হাল ধরে, তবে একজন রাশিয়ানও আর বেঁচে ফিরতে পারবে না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত