Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি বানচাল করতে ট্রাম্পকে হত্যার নাটক সাজায় ইসরায়েল: তুরস্ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি বানচাল করতে ট্রাম্পকে হত্যার নাটক সাজায় ইসরায়েল: তুরস্ক
গত ৭ জুলাই ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে আঙ্কারার এতিমেসগুত বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে ট্রাম্পের এয়ার ফোর্স ওয়ান। ছবি: এএফপি

গত মাসে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল ইরান—ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার এমন একটি প্রতিবেদনকে সাজানো নাটক বা প্রতারণা বলে মনে করছে তুর্কি কর্তৃপক্ষ। তাদের সন্দেহ, তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য চুক্তি ও আলোচনা বানচাল করার উদ্দেশেই ইসরায়েল এই মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছিল। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৮ জুলাই দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে সাংবাদিকেরা জানতে পারেন, তুর্কি নিরাপত্তা বাহিনী আঙ্কারা বিমানবন্দরে হঠাৎ অতিরিক্ত সৈন্য ও সদস্য মোতায়েন করছে। সেখানে ট্রাম্পের বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ান রাখা ছিল।

ওই সময় (৭-৮ জুলাই) ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে পুরো আঙ্কারাজুড়ে ছিল কঠোর নিরাপত্তা। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং সরকারি কর্মচারীদের এক সপ্তাহের প্রশাসনিক ছুটি দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া সম্মেলনস্থলে রাষ্ট্রপ্রধানদের দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার জন্য তুর্কি বিমানবাহিনীর এতিমেসগুত বিমানঘাঁটিকে (যা আনুষ্ঠানিকভাবে আঙ্কারা বিমানবন্দর নামে পরিচিত) সাজিয়ে তোলা হয়েছিল।

এত কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই মার্কিন কর্মকর্তারা তুর্কি কর্তৃপক্ষকে জানায় যে, তাঁরা ইসরায়েলের কাছ থেকে একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেয়েছেন। প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, ইরান ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানান, গোয়েন্দা তথ্যে সতর্ক করা হয়েছিল—ইরানের একটি গোপন অভিযান পরিচালনাকারী দল আঙ্কারা বিমানবন্দরের কাছে ট্রাম্পের নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। কাঁধে রেখে নিক্ষেপযোগ্য ম্যানপ্যাডস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ১ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্য থেকে বিমানটিতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

বিমানবন্দরের কাছাকাছি বেসামরিক ভবন থাকায় তুর্কি কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসও অবিলম্বে অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেয়। প্রথমে ট্রাম্পের প্রস্থানের স্থান পরিবর্তন করে এসেনবোগা বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। পাশাপাশি নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অভাব থাকায় পুরোনো বিমানটিকে ফেরত আনা হয়।

ট্রাম্পকে হত্যার এই ইরানি হুমকির বিষয়টি অনেক মার্কিন কর্মকর্তার কাছেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল, কারণ এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই এবং নভেম্বরেও ট্রাম্পকে হত্যার একাধিক ইরানি চক্রান্তের অভিযোগ উঠেছিল (যদিও ইরান সব সময়ই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে)।

ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিক্রেট সার্ভিস ঘটনাটিকে এতটাই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল যে, পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার পর ট্রাম্পকে গোপনে একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে আরেকটি ছোট বিমানে (মার্কিন এয়ার ফোর্সের সি-৩২) সরিয়ে নেওয়া হয়।

‘গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি সত্যি হওয়ার কোনো সুযোগই নেই’

ন্যাটো সম্মেলনের সেই সময়টিতে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে এবং বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তির আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকের সময়ও ট্রাম্প বারবার ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে ট্রাম্পের এই অবস্থান ছিল ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এজেন্ডার সম্পূর্ণ বিপরীত। নেতানিয়াহু চাচ্ছিলেন ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে আরও ভারী হামলা চালাতে এবং ইরানি নেতাদের ওপর নতুন করে হামলা বা হত্যাকাণ্ড শুরু করতে।

তুর্কি কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পকে রক্ষার ভান করা, ইরানের সঙ্গে চলমান চুক্তি বানচাল করা এবং ট্রাম্পের সঙ্গে এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে ফাটল ধরানোর জন্যই নেতানিয়াহু সরকার এই ভিত্তিহীন গোয়েন্দা নাটক সাজিয়েছিল।

এ ছাড়া, ওই সম্মেলনের ঠিক আগের দিন ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তিনি তুরস্কের ওপর থেকে ২০১৯ সালে রাশিয়ান এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের কারণে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে এবং আঙ্কারার কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করতে প্রস্তুত। নেতানিয়াহু শুরু থেকেই তুরস্কে এফ-৩৫ বিক্রির চরম বিরোধী, কারণ তাঁর মতে এটি মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে এবং ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে ক্ষুণ্ন করবে।

এক তুর্কি নিরাপত্তা কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আমরা ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের যথাসম্ভব সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট ছিল যে, এই প্রতিবেদনের বিন্দুমাত্র কোনো সত্যতা ছিল না।’

অতীতে তুরস্কে ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ছোটখাটো হামলার ইতিহাস থাকলেও, এত কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বিমান ধ্বংস করার মতো জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালানো ইরানের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, সেফ হাউজ এবং কঠোর চেকপোস্ট পার করে কাঁধে বহনযোগ্য মিসাইল আঙ্কারায় প্রবেশ করানো। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ধরনের হামলা তুরস্ককে সরাসরি ইরানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত। অথচ যুদ্ধের শুরু থেকেই আঙ্কারার সঙ্গে তেহরান তুলনামূলক স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে।

তুরস্কের এক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে হামলাটি কখনো ঘটেইনি এবং যার কোনো পরিকল্পনাও ছিল না, সেটির জন্য এখন মিথ্যা বীর সাজতে ও তথ্য ফাঁস করতে তাদের লজ্জা লাগছে না।’

এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে মিডল ইস্ট আইয়ের পক্ষ থেকে হোয়াইট হাউস এবং ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত