পৃথিবীর এক প্রান্তে সংঘাতের উত্তাপ অন্য প্রান্তে কৃষকের মাঠে ফাটল ধরায়, তার জীবিকার নিশ্চয়তাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়। যেমন হাজার মাইল দূরের ভূরাজনৈতিক সংঘাত সরাসরি বাংলাদেশের কৃষি, কৃষক এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। এই প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সার পরিবাহিত হয়। সংঘাতের ফলে এই পথ কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। কয়েক মাস আগেও প্রতি টন ৪৯০ ডলারের মধ্যে ছিল, তা এখন ৬২৫ থেকে ৭০০ ডলারের ওপরে। ডিএপি সারের দামও টনপ্রতি ৮০০ ডলারের কাছাকাছি। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, জাহাজের বিমা খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক কৃষি খাতে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪৫ লাখ টন। এর একটি বিশাল অংশ ব্যবহৃত হয় কৃষি খাতে। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত আছে মাত্র ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন। দেশের সার্বিক দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার টন বিবেচনায় নিলে এই মজুত দিয়ে বড়জোর আর মাত্র ১০ দিন চলা সম্ভব। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত চলমান কৃষি সেচ মৌসুমে সেচ ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্র পরিচালনার জন্য ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মতে, শুধু সেচযন্ত্রগুলো সচল রাখতেই এই সময়ে দরকার প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার টন ডিজেল। এই বিপুল পরিমাণ চাহিদার বিপরীতে মজুতের এই করুণ চিত্র কৃষকের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
সরকার-নির্ধারিত দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা হলেও বাস্তবে কৃষককে অনেক ক্ষেত্রে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, যা কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ মূলত সার আমদানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশ, বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু হরমুজ প্রণালির রুট প্রায় বন্ধ থাকায় এপ্রিলে সৌদি আরব থেকে ডিএপি সারের চালান আসা নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের দেশীয় সার কারখানাগুলোও ধুঁকছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে সরকার। গ্যাস সরবরাহ না থাকায় এসব কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি স্থবির।
তবে এই চরম হতাশার মধ্যেও কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির দেওয়া তথ্য কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। তাদের মতে, সাময়িকভাবে ভয়ের কিছু নেই। বর্তমানে দেশে ইউরিয়া সারের মজুত আছে প্রায় ৩ লাখ ৫৮ হাজার টন, টিএসপি মজুত আছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার টন, ডিএপি মজুত আছে ৫ লাখ ৯ হাজার টন এবং এমওপি সারের মজুত আছে প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার টন। পরিসংখ্যান বলছে, এই মজুত দিয়ে জুন পর্যন্ত কৃষকের সারের চাহিদা নিশ্চিন্তে পার করা যাবে। কিন্তু আসল শঙ্কাটা ঘনীভূত হচ্ছে আগামী জুলাই এবং আগস্ট মাসের আমন মৌসুম নিয়ে।
এই জ্বালানি ও সারের দ্বিমুখী সংকট সরাসরি আঘাত হানছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তায়। বোরো ধান বাংলাদেশের মোট চাল উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি জোগান দেয়। আবার আমন মৌসুমও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেচের অভাব বা সারের ঘাটতির কারণে উৎপাদন কমে গেলে বাজারে চালের দাম বেড়ে যাবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে।
এই বাস্তবতায় কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। দেশীয় সার কারখানাগুলো চালু রাখতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে হলেও কৃষিসংশ্লিষ্ট উৎপাদন সচল রাখতে হবে। এতে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। কৃষকদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক ডিজেল বিতরণ ব্যবস্থা চালু করলে প্রকৃত কৃষকেরা ন্যায্যমূল্যে জ্বালানি পাবেন এবং কালোবাজারি কমবে। বোরো মৌসুমে ধান কাটার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। হাওর অঞ্চলে সময়মতো ধান কাটতে না পারলে আগাম বন্যায় ব্যাপক ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। তাই এসব যন্ত্রের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। সার ও জ্বালানি যেন নির্ধারিত দামে কৃষকের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে। কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট বা মজুতদারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সৌরচালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি করলে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং কৃষি খাত আরও স্থিতিশীল হবে। কৃষকদের জন্য ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। সরাসরি নগদ সহায়তা বা কৃষি উপকরণের ভাউচার প্রদান করলে উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। বিকল্প উৎস থেকে সার ও জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঠিক পরামর্শ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করলে সীমিত সম্পদ দিয়েও উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হবে।
সংকট আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু এই সংকটকে জয় করার সামর্থ্যও আমাদের রয়েছে। সঠিক ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা, বিকল্প বাজারের সন্ধান, দুর্নীতিমুক্ত সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষকের প্রতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারই পারে এই কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে।
লেখক: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান চ্যানেল আই

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল সোমবার হুমকি দেন যে, আজ মঙ্গলবার ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় রাত ৮টার মধ্যে যদি ইরান কোনো চুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে তিনি ‘এক রাতেই’ ইরানকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। তাঁর শর্ত ছিল, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে হবে।
১৭ মিনিট আগে
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন ফিলিপাইনের হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিক। ইসরায়েল, লেবানন ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করতে যাওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি ফিলিপিনো কর্মী এখন দেশ ছাড়তে পারছেন না।
৩ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানকে ‘পুরো দেশজুড়ে বোমা হামলার’ হুমকি দিয়েছেন। একই সঙ্গে পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা ব্যয়বহুল এই সংঘাতের জন্য নতুন এক যুক্তিও তুলে ধরছেন। তাঁর দাবি, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যা করছে, তা নাকি স্বয়ং ঈশ্বরই চান। তবে, ঈশ্বর সংঘাত পছন্দ করে না বলেও জানান তিনি।
৩ ঘণ্টা আগে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর মাধ্যমে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের বিষয়টিকে তিনি কেয়ার করেন না। এই বিষয়ে তিনি ‘একেবারেই’ উদ্বিগ্ন নন।
৪ ঘণ্টা আগে