Ajker Patrika

মার্কিন আধিপত্যের বদলে বহু মেরুর বিশ্ব ও ডলার বর্জনের ঘোষণা সি-পুতিনের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মার্কিন আধিপত্যের বদলে বহু মেরুর বিশ্ব ও ডলার বর্জনের ঘোষণা সি-পুতিনের
চীনের প্রেসিডেন্ট সি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন। ছবি: এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের মাত্র চার দিনের মাথায় অনুষ্ঠিত চীন-রাশিয়া শীর্ষ সম্মেলন শেষে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই বিবৃতির মূল বিষয় ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে একটি ‘বহু মেরুর বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় তৈরি করা। একই সঙ্গে দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতাকে আরও সুসংহত করতে বেশ কিছু চুক্তি সই করা হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বেইজিং ও মস্কোর পক্ষ থেকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাতে এই সম্মেলনের ৫টি দিক তুলে ধরেছে।

‘বহু মেরুর বিশ্ব’ গঠন ও মার্কিন আধিপত্যের বিরোধিতা

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশ একটি বৈশ্বিক বহু মেরুর বিশ্ব ব্যবস্থার পক্ষে যৌথ বিবৃতি ইস্যু করেছে। রুশ প্রেসিডেন্টের সহকারী ইউরি উশাকভ এই ঘোষণাকে একটি ৪৭ পৃষ্ঠার বিস্তারিত ‘নীতিগত দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

‘বহু মেরুর বিশ্ব’ বলতে এমন একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষমতা কেবল এক বা দুটি দেশের হাতে না থেকে বেশ কয়েকটি দেশের মধ্যে বণ্টিত থাকে। বৈঠকে সি চিনপিং পুতিনকে বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে একতরফা আধিপত্যবাদের ধারা তীব্র রূপ নিয়েছে।’ অন্যদিকে পুতিন এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘নিজেদের একক হেজেমনি (আধিপত্য) বজায় রাখতেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত উসকে দিচ্ছে। এককেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার যুগ এখন শেষের পথে।’

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়

ক্রেমলিনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক বর্তমানে ‘নতুন স্তরে পৌঁছেছে এবং তা দ্রুত বিকশিত হচ্ছে।’ অন্যদিকে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই দেশের উচিত শান্তি, উন্নয়ন ও পারস্পরিক সহযোগিতার ধারা বজায় রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও মজবুত করা। এই সহযোগিতা অর্থনীতি, খেলাধুলা, শিক্ষা এবং গণমাধ্যম পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। চলতি বছর রাশিয়ার তাস ও চীনের সিনহুয়া নিউজ এজেন্সির অংশীদারত্বের ৭০ বছর পূর্তি হচ্ছে বলেও ক্রেমলিন উল্লেখ করেছে।

গভীর অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ‘ডলার’ বর্জন

শীর্ষ সম্মেলনে বেইজিং ও মস্কো প্রায় ৪০টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি সই করেছে, যার বড় অংশই অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ২৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই তা আরও ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে রাশিয়ার ওপর চীনের প্রযুক্তিগত নির্ভরতা ব্যাপক বেড়েছে। ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ-এর নিষেধাজ্ঞাভুক্ত সামরিক ও ড্রোন প্রযুক্তির প্রায় ৯০ শতাংশই এখন চীনা সরবরাহকারীদের মাধ্যমে রাশিয়ায় যাচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চমক হলো, ক্রেমলিন জানিয়েছে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রায় সমস্ত আমদানি-রপ্তানি লেনদেন এখন মার্কিন ডলারের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নিজস্ব মুদ্রা রুবেল ও ইউয়ানের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এর মাধ্যমে দুই দেশ বৈশ্বিক বাজারের নেতিবাচক প্রভাব ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একটি স্থিতিশীল ও স্বাধীন পারস্পরিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও ‘সাইবেরিয়া ২’ পাইপলাইন

ইউরোপীয় বাজার রাশিয়ার জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে চীন রাশিয়ার খনিজ তেল ও গ্যাসের প্রধান ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জি-৭ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার তেলের ওপর যে ৪৮ থেকে ৬০ ডলারের ‘প্রাইস ক্যাপ’ বা মূল্যসীমা বেঁধে দিয়েছিল, চীন তা উপেক্ষা করে বড় ছাড়ে রাশিয়ার থেকে রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি কিনছে।

ক্রেমলিন জানিয়েছে, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ যৌথ গ্যাস পাইপলাইনের রুট এবং নির্মাণকাজের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। পাইপলাইনটি সম্পন্ন হলে মঙ্গোলিয়ার ওপর দিয়ে প্রতি বছর ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার রুশ গ্যাস সরাসরি চীনে সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা চীনের দ্রুত বর্ধনশীল বাজারের জন্য নিশ্ছিদ্র জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

‘শিক্ষা বর্ষ’ ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা

যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের শীর্ষ নেতা শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়েছেন। এর অধীনে চীন ও রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ (শিক্ষার্থী বিনিময়) প্রোগ্রাম এবং যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ করা হবে, যা দুই দেশের মেধা ও প্রযুক্তিগত খাতের পারস্পরিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত