Ajker Patrika

এশিয়া অঞ্চল থেকে সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরীটিও সরাল যুক্তরাষ্ট্র, চীনের সুযোগ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২: ০৬
এশিয়া অঞ্চল থেকে সর্বশেষ বিমানবাহী রণতরীটিও সরাল যুক্তরাষ্ট্র, চীনের সুযোগ
বিমানবাহী মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং এর সঙ্গে থাকা তিনটি ডেস্ট্রয়ার ইতিমধ্যে দক্ষিণ চীন সাগর ছেড়ে পশ্চিমমুখী যাত্রা শুরু করেছে। ছবি: ইউএস নেভি

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোর সক্ষমতার ওপর ক্রমেই চাপ বাড়াচ্ছে। একই সময়ে চীন যখন আরও আগ্রাসী মনোভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তখন পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর একটি থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে। সেখানে এটি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন সমুদ্রে অবস্থান করা লিংকনে মানসিক স্বাস্থ্য ও সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই এই পরিবর্তন আসছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে সহায়তা করার জন্য লিংকনের সমুদ্রে থাকার সময়সীমা তার নির্ধারিত মে মাসে ফেরার তারিখের পরও বাড়ানো হয়েছে।

আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে নৌবাহিনী আরেকটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কোনো ক্যারিয়ার না থাকার পরিস্থিতি হয়তো খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান অনির্দিষ্টকালীন সামরিক অভিযান কীভাবে মার্কিন নাবিকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে—এই ঘটনা তারই একটি উদাহরণ। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে আরও মনোযোগ সরিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে গুরুত্ব দিচ্ছে।

মার্কিন থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক গ্রেগ পোলিং বলেন, ট্রাম্প ‘প্রশাসন বলছে, পশ্চিম গোলার্ধের পর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র তার আগে প্রকাশ করা মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে আসার লক্ষ্যের ঠিক বিপরীত কাজ করছে।’ পোলিংয়ের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্ররা রিপাবলিকান প্রশাসনের অনির্দেশ্য নীতিতে অস্বস্তিতে রয়েছে। অন্যদিকে বেইজিং ‘যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ত হয়ে পড়া, তার মিত্র ও অংশীদারদের হতাশা নিয়ে বেশ খুশি।’

বেইজিং মনে করে, এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি চীনের উত্থানের জন্য হুমকি এবং স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে বাধা। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো, অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটি হারানোর সুযোগ নেই।

কেবল একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ায় চীন তাইওয়ানে হামলা চালাবে, এমনটা কেউ মনে করছেন না। তবে ওই ক্যারিয়ারের অনুপস্থিতি চীনকে নিজের শক্তি প্রদর্শনের আরেকটি সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করেন হাডসন ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং সাবেক নৌবাহিনীর সাবমেরিনার ব্রায়ান ক্লার্ক।

ক্লার্ক বলেন, ‘ফিলিপাইন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্য দেশগুলোর কাছে এটা দেখানোর বয়ানের অংশ হিসেবেই তারা এটিকে ব্যবহার করছে যে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র আর সবচেয়ে বড় শক্তি নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা শুধু চায়, এই অঞ্চলের দেশগুলো যেন মনে করতে শুরু করে যে চীনই বড় শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র আর তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম নয়।’

চীন চলতি সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে নৌ মহড়া করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাপান ও ফিলিপাইনের বিরুদ্ধেও বেইজিংয়ের আগ্রাসী আচরণের নানা লক্ষণ দেখা গেছে। দেশ দুটি যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং উভয়ের সঙ্গেই চীনের আঞ্চলিক বিরোধ রয়েছে।

চলতি মাসে চীন দক্ষিণ চীন সাগরের স্কারবোরো শোলের কাছে সামরিক মহড়া চালিয়েছে। এই জলসীমার মালিকানা চীন ও ফিলিপাইন উভয়েই দাবি করে। এর আগে গত মাসে একটি চীনা গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার জাপানের দক্ষিণতম দ্বীপ ওকিনোতোরির কাছে লাইভ-ফায়ার মহড়া চালায়।

মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ফ্র্যাঙ্ক ব্র্যাডলি এই অঞ্চলের মিত্রদের ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি ম্যানিলায় ছিলেন এবং ফিলিপাইনের কর্মকর্তাদের জানান, দুই দেশের জোটকে আরও শক্তিশালী করতে যৌথ মহড়া বাড়ানোর জন্য মার্কিন বিশেষ বাহিনী প্রস্তুত। তিনি জাপানেও যাওয়ার কথা রয়েছে।

চীনের প্রতি মার্কিন নীতির ওপর নজর রাখা ক্যাটো ইনস্টিটিউটের নীতি বিশ্লেষক ইভান স্যাঙ্কি বলেন, বিমানবাহী রণতরীগুলো মার্কিন মিত্রদের জন্য মানসিক ও কৌশলগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তৈরি করে। তাঁর মতে, এ অঞ্চলে ক্যারিয়ারের অনুপস্থিতি ‘মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলিতে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে’—এমন সামগ্রিক ধারণাকে আরও শক্তিশালী করছে।

ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে সামরিক অভিযান পরিচালনায় বিমানবাহী রণতরীগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছেন। এর একটি উদাহরণ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। এটি মে মাসের মাঝামাঝি দেশে ফিরে যায়। রণতরীটি টানা ১১ মাস মোতায়েন ছিল, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন। ওই সময় এটি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে এবং ভেনেজুয়েলার তৎকালীন নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানে সহায়তা করেছিল।

ফোর্ডে একটি লন্ড্রি কক্ষে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছিল। এর ফলে মেরামতের জন্য রণতরীটিকে ভূমধ্যসাগরে ফিরে যেতে হয় এবং শত শত নাবিকের ঘুমানোর জায়গা ছিল না। এদিকে লিংকন টানা ২৪০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রে অবস্থান করে রেকর্ড গড়েছে। জাহাজটির ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত এবং আরও স্বচ্ছতা দাবি করে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনীতি বিষয়ের শিক্ষক এবং বিমানবাহী রণতরী নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করা রবার্ট ফার্লি বলেন, যুদ্ধজাহাজ ও তাদের নাবিকদেরও সহ্যক্ষমতার সীমা রয়েছে। ফার্লির ভাষায়, ‘মানুষ পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না। এটি মানসিকভাবে ভীষণ ক্লান্তিকর। আর নাবিকদের সুস্থ রাখার জন্য বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ।’

রবার্ট ফার্লি বলেন, ‘কখনও কখনও বিষয়টিকে এভাবে বলা হয় যে—এই মানুষগুলো ছুটি পায়নি। কিন্তু এখানে আমরা দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ দক্ষতায় কাজ করার জন্য একটি ক্রুর সক্ষমতার সুপরিচিত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে মোকাবিলা করছি। সময়ের সঙ্গে সেই দক্ষতা কমতেই থাকে।’

হাডসন ইনস্টিটিউটের ক্লার্কের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীগুলোর ওপর এই চাপের পেছনে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি জানতাম যে এ ধরনের সংঘাতে যেতে হবে এবং ধারণা করতাম যে এটি এত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে, তাহলে হয়তো ক্যারিয়ারগুলোর মোতায়েনের সময়সূচিতে কিছু পরিবর্তন আনতাম, যাতে আরও বেশি রণতরী প্রস্তুত রাখা যায়।’

ক্লার্ক জানান, মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে মোট ১১টি বিমানবাহী রণতরী রয়েছে এবং সাধারণত এর মধ্যে দুই থেকে তিনটি একসঙ্গে মোতায়েন করা হয়। তবে শিগগিরই এই সংখ্যা চারটিতে পৌঁছাতে পারে। ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট যদি সান দিয়েগো থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়, তাহলে জর্জ ওয়াশিংটনকে আবার প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

তবে এত বিশাল যুদ্ধজাহাজগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ দরকার। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র দুটি বিমানবাহী রণতরী রক্ষণাবেক্ষণকারী শিপইয়ার্ডে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্লার্ক বলেন, ‘আমাদের এমন একটি রক্ষণাবেক্ষণ-ঘাটতি তৈরি হবে, যার মূল্য আগামী কয়েক বছর ধরে পরিশোধ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্ভবত আগের বছরগুলোর তুলনায় আমাদের বিমানবাহী রণতরীর উপস্থিতি কম থাকবে, কারণ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ক্যারিয়ারগুলো শিপইয়ার্ডে যাওয়ার অপেক্ষায় সারিবদ্ধ হয়ে থাকবে।’

এদিকে কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ইস্ট এশিয়া কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল সোয়াইন প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাওয়ার এই সময়ে ভবিষ্যতে বিমানবাহী রণতরীর এত বেশি প্রয়োজন আদৌ থাকবে কি না। সোয়াইনের মতে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে বিমানবাহী রণতরীগুলোকে আগের তুলনায় সহজেই লক্ষ্যবস্তু বানানো সম্ভব, বিশেষ করে চীনের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। তাঁর মতে, ছোট আকারের যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনগুলোও অনেক ক্ষেত্রে এমন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, যেগুলোতে একটি বিমানবাহী রণতরী থেকে উড্ডয়ন করা যুদ্ধবিমান হামলা চালায়।

মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও বিমানবাহী রণতরীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর ইচ্ছার ইঙ্গিত দিয়েছেন। নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল ফেব্রুয়ারিতে বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছিলেন, তিনি কমান্ডারদের বোঝাতে চান যেন তারা সব সময় বিশাল বিমানবাহী রণতরীর ওপর নির্ভর না করে ছোট, নতুন যুদ্ধজাহাজ এবং অন্যান্য সামরিক সম্পদ ব্যবহার করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত