Ajker Patrika

বিশ্বজুড়ে পুরোনো বইয়ের বাজার হঠাৎ অস্বাভাবিক চাঙা, নেপথ্যে কী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২: ৫৩
বিশ্বজুড়ে পুরোনো বইয়ের বাজার হঠাৎ অস্বাভাবিক চাঙা, নেপথ্যে কী
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে পুরোনো বা সেকেন্ডহ্যান্ড বইয়ের বাজারে সম্প্রতি এক অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে স্বাধীন বই বিক্রেতারা দেখেছেন, দূরদূরান্তের গুদামঘরগুলো বিপুল পরিমাণ উপন্যাস ও অন্যান্য বই এককালীন কিনে নিচ্ছে।

সাধারণ পাঠকদের জন্য নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দিতেই এই বিশাল পরিমাণ বই কেনা হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের নর্দাম্বারল্যান্ডের ‘বার্টার বুকস’-এর মালিক স্টুয়ার্ট ম্যানলি জানান, ৩০ বছরের পুরোনো বইয়ের ব্যবসায় তিনি এমন ঘটনা কখনো দেখেননি। সম্প্রতি কানাডার একটি প্রতিষ্ঠান তাঁর কাছ থেকে একবারে যে পরিমাণ বই কিনেছে, তা তাঁর সাধারণ এক সপ্তাহের পুরো বিক্রির সমান।

যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বই বিক্রেতারা একই ধরনের অস্বাভাবিক বড় অর্ডারের কথা জানিয়েছেন। ল্যাটিন ভাষায় লেখা প্রাচীন টেক্সট থেকে শুরু করে সাধারণ কাউবয় উপন্যাস—সব ধরনের বই-ই এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত।

এআই প্রযুক্তির এই বিশাল চাহিদার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে মার্কিন আদালতের একটি সাম্প্রতিক মামলার নথি সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর বিরুদ্ধে তিনজন লেখক গ্রন্থস্বত্ব (কপিরাইট) লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।

মামলার বিচারক উইলিয়াম আলসাপ রায়ে জানান, এআই সফটওয়্যার প্রশিক্ষণের জন্য এভাবে বইয়ের ব্যবহার মার্কিন কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করে না, কারণ এটি প্রযুক্তির একটি ‘রূপান্তরমূলক’ ব্যবহার। মামলার নথিপত্র উন্মোচিত হওয়ার পর জানা যায়, অ্যানথ্রোপিক তাদের চ্যাটবট ‘ক্লদ’-কে প্রশিক্ষণ দিতে ‘প্রজেক্ট পানামা’ নামে একটি অভ্যন্তরীণ প্রকল্প পরিচালনা করছিল। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বজুড়ে পুরোনো বই সংগ্রহ করে তা ডিজিটাইজ করা।

মামলার নথি অনুযায়ী, বইগুলো দ্রুত ডিজিটাল তথ্যে রূপান্তর করার জন্য ‘ডেস্ট্রাকটিভ স্ক্যানিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় শিল্প পর্যায়ে দ্রুত স্ক্যান করার সুবিধার্থে বইয়ের বাইন্ডিং বা বাঁধাই কেটে ফেলা হয় এবং স্ক্যান শেষে কাগজের অবশিষ্টাংশ পুনর্ব্যবহার (রিসাইকেল) বা ধ্বংস করে ফেলা হয়।

তবে অ্যানথ্রোপিকের একজন মুখপাত্র এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের ডেটা সংগ্রহের কোনো কর্মসূচির মাধ্যমেই দুর্লভ বা বিরল পুরোনো বই কিনে ধ্বংস করা হয় না। এআই শিল্পে তথ্য সংগ্রহের জন্য বই ব্যবহার একটি সাধারণ প্রক্রিয়া।’

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা স্বত্ব বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এমিলি হাডসন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় যুক্তরাজ্যের কপিরাইট আইন ভিন্ন। যুক্তরাজ্যে এআই প্রশিক্ষণের জন্য ডেটাসেট তৈরি করতে হলে গ্রন্থস্বত্ব বা কপিরাইট মালিকের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।

এদিকে বই ধ্বংসের এই প্রক্রিয়া নিয়ে বই বিক্রেতাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। লন্ডনের ‘ওয়ালডেন বুকস’-এর মালিক ডেভিড টোবিন বলেন, ‘বহু বছর ধরে অবিক্রিত পড়ে থাকা বই বিক্রি হওয়া আনন্দের, কিন্তু সেগুলো শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ভাবলে কষ্ট হয়।’

এডিনবার্গের ‘ম্যাকনটনস’ বইয়ের দোকানের মালিক ডেরেক ওয়াকার মনে করেন, কোনো ১৮ শতকের একমাত্র টিকে থাকা বিরল সংস্করণ যদি স্ক্যান করার নামে ধ্বংস করা হয়, তবে তা অপূরণীয় ক্ষতি।

তবে স্টুয়ার্ট ম্যানলি কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, ‘বাজার থেকে অপ্রয়োজনীয় বই প্রক্রিয়াজাত করা খারাপ কিছু নয়। ড্যান ব্রাউনের “দ্য দা ভিঞ্চি কোড” উপন্যাসের ৫০ লাখ কপির প্রয়োজন পৃথিবীর আর নেই। যে বইগুলো ২০ বছর ধরে ওয়েবসাইটে পড়ে থেকেও বিক্রি হয়নি, সেগুলো এখন বিক্রি হচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত