Ajker Patrika

জাঁকজমকের সঙ্গে স্বাগত জানালেও কাঙ্ক্ষিত ফল প্রসবে ব্যর্থ ট্রাম্প–সি বৈঠক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
জাঁকজমকের সঙ্গে স্বাগত জানালেও কাঙ্ক্ষিত ফল প্রসবে ব্যর্থ ট্রাম্প–সি বৈঠক
রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আগে হোয়াইট হাউসের নর্থ পোর্টিকোর সিঁড়িতে ক্যামেরা বন্দি সি চিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংকে জাঁকজমকের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে শীর্ষ বৈঠকে স্বাগত জানান। বৈঠকটি প্রতীকী আয়োজন ও আড়ম্বরপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতায় ভরপুর হলেও, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতির দিক থেকে ছিল অনেকটাই ফাঁপা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বাণিজ্য, তাইওয়ান এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মতো জটিল বিষয়গুলোতে কোনো বড় ধরনের অগ্রগতির লক্ষণ দেখা যায়নি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, দুই নেতা ও তাঁদের স্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নেন। কালো টাইয়ের আনুষ্ঠানিক পোশাকের এই আয়োজনে তিলের আবরণে পরিবেশিত সি-বাসসহ নানা পদ ছিল। অতিথি তালিকায় ছিলেন প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের বড় একটি অংশ। হোয়াইট হাউসের ফটকের বাইরে একদল উচ্চকণ্ঠ বিক্ষোভকারী ‘চীন হংকং থেকে বেরিয়ে যাও’—এর মতো স্লোগান দিতে থাকেন। লালগালিচা পাতা হোয়াইট হাউসের সিঁড়িতে ছবি তোলার সময় তাঁদের সেই স্লোগান নেতাদের কাছেও স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল।

নৈশভোজে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্পস তাঁর এবং সির কথা ইঙ্গিত করে বলেন, আমরা ‘দুজনেই বুঝতে পারি যে আমরা ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করি, কিন্তু আমাদের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক টিকে আছে এবং আমাদের মধ্যে এর চেয়ে ভালো সম্পর্ক আর কখনো ছিল না।’

এরপর ট্রাম্প নৈশভোজের অতিথিদের তাঁর কাছেই নির্মাণাধীন নতুন বলরুম ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানান। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি সিকে হোয়াইট হাউস কমপ্লেক্সে নির্মিত একটি হেলিপ্যাড দেখান। নির্মাণকাজের প্রসঙ্গ ট্রাম্পের জন্য প্রায়ই একটি আকস্মিক প্রসঙ্গান্তর হয়ে ওঠে। কারণ, তিনি ওয়াশিংটনের ভৌত অবকাঠামো নতুন করে সাজানোর ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন।

সি বলেন, তিনি ও ট্রাম্প গভীরভাবে আলোচনা করেছেন এবং ‘অনেক বিষয়ে অভিন্ন বোঝাপড়ায়’ পৌঁছেছেন, যা ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা’ দিয়েছে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল বৃহৎ দেশ হিসেবে কাজ করতে হবে।’ একই সঙ্গে তিনি ‘বৃহৎ দেশগুলোর পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি নতুন পদ্ধতির’ আহ্বান জানান।

বৈঠকটি যে জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেটিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বিশ্বজুড়ে বহু দেশের নেতা যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছিলেন, তখন বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় ওয়াশিংটনে।

এ বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সময়ে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসন ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, সেটি শেষ করার ক্ষেত্রে সমস্যায় রয়েছেন। এই যুদ্ধ জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তাঁর জনসমর্থনের ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।

তাইওয়ান নিয়ে আলোচনা

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সময় সি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতার’ বিরোধিতা করার আহ্বান জানান বলে চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম জটিল এই ইস্যুটি তিনি আলোচনায় তোলেন। তবে হোয়াইট হাউস এখনো বৈঠকের নিজস্ব কোনো সারসংক্ষেপ প্রকাশ করেনি। ধারণা করা হয়েছিল, চলতি সপ্তাহে সি ট্রাম্পকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার জন্য চাপ দেবেন। মে মাসে চীন সফরের পর ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ স্থগিত রেখেছেন এবং এটিকে ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

এই সিদ্ধান্তে এশিয়ার কিছু মার্কিন মিত্র এবং এমনকি ট্রাম্পের নিজ দলের কিছু রিপাবলিকানও উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের বিনিময়ে ওয়াশিংটন তাইপের প্রতি সমর্থন নরম করতে পারে। চীন গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি।

দুই নেতার এই শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো এমন এক সময়, যখন চলতি সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প তাঁর সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন এবং ইরানকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেওয়ার মতো হুমকিও দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সির সঙ্গে তাঁর সুর ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর মধ্য দিয়ে এমন এক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতিফলন দেখা যায়, যা চীনের নেতার দিকে ঝুঁকেছে বলে মনে হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে এমন একটি বাণিজ্যযুদ্ধ, যার অবসানে যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্কের ক্ষেত্রে পিছু হটতে হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সি চিনপিং ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প নীতিগত মতপার্থক্যের ওপর জোর না দিয়ে সির সঙ্গে তাঁর ‘সত্যিই দারুণ বন্ধুত্বের’ কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মে মাসে চীন সফরের পর দুই দেশ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অগ্রগতি করেছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—সি বলেন, দুই দেশের স্বার্থ গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা ‘সুস্থ’ হওয়া উচিত। তিনি বলেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো চীনে স্বাগত। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘চীনা কোম্পানিগুলোকে এখানে যুক্তরাষ্ট্রে ন্যায্য আচরণ করা হবে।’ সি আরও বলেন, সংকট প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়াতে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা উচিত।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক বনাম জাতীয় সম্পর্ক

পূর্ব এশিয়া বিষয়ে হোয়াইট হাউসের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এডগার্ড কাগান বলেন, দুই নেতার বক্তব্যের পার্থক্য তাঁদের ভিন্ন কৌশলকে তুলে ধরে। কাগান বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট এটিকে সির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবেই তুলে ধরছেন।’

বর্তমানে মার্কিন থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে কর্মরত কাগান বলেন, ‘আমার কাছে যে বিষয়টি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে তা হলো, সি অনেক বেশি সতর্ক এবং তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে এটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে জাতীয় সম্পর্কের বিষয় বেশি।’

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের নেতাদের মধ্যে এ বছর এটি দ্বিতীয় বৈঠক। এক দশকেরও বেশি সময় পর এটি সির প্রথম ওয়াশিংটন সফর। আনুষ্ঠানিকতা পছন্দ করেন এবং ক্ষমতাধর নেতাদের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন এমন ট্রাম্পের কাছে এই সফর উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগের পাশাপাশি জাতীয় মর্যাদার বিষয়ও। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প ও সির বক্তব্য কোনো মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সরাসরি সম্প্রচার করেনি। হোয়াইট হাউস সিএনএন, এমএস নাও এবং পলিটিকোকে নিষিদ্ধ করায় প্রতিবাদ হিসেবে এসব নেটওয়ার্ক সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার করতে অস্বীকৃতি জানায়।

বৃহস্পতিবারের বক্তব্যে সি বলেন, দুই দেশকে ‘নিশ্চিত করতে হবে যে এআইয়ের উন্নয়ন সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে।’

বিশ্লেষকদের মতে, এআই নিয়ে দুই পরাশক্তির তীব্র প্রতিযোগিতা এমন যে, প্রতীকী কিছু চুক্তির বাইরে এর পরিধি বাড়িয়ে আরও বড় কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। চীন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে আগ্রহী, এমন কোনো লক্ষণ খুব কমই দেখা গেছে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবারও যুদ্ধবিরতিতে ফিরতে এবং শেষ পর্যন্ত একটি শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসার প্রতি সমর্থন জানান বলে চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবারের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের অতিথি তালিকায় ছিলেন অ্যাপলের টিম কুক, অ্যামাজনের জেফ বেজোস, অ্যালফাবেটের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, টেসলার ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংয়ের মতো শীর্ষ নির্বাহীরা। এত বড় প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিত্ব থাকা সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ট্রাম্প সম্ভবত মার্কিন প্রযুক্তিপণ্যের ওপর যে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তা কঠোরভাবেই বজায় রাখবেন। এসব নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে চায় সি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত