Ajker Patrika

কুকি নারীর প্রেমে করুণ পরিণতি—মণিপুরে আবারও বিভাজনের শঙ্কা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
কুকি নারীর প্রেমে করুণ পরিণতি—মণিপুরে আবারও বিভাজনের শঙ্কা
প্রতিবাদ সভায় নিহত ঋষিকান্ত সিংয়ের দুই বোন। ছবি: দ্য প্রিন্ট

ভারতের মণিপুর রাজ্যের চুরাচাঁদপুর জেলার কাচিং এলাকায় একটি গাছের নিচে বসে ছিলেন ডজনখানেক নারী। সবার গায়ে সাদা শাল, হাতে হাতে পোস্টার—‘কুকি সন্ত্রাসীদের শাস্তি দাও’, ‘ঋষিকান্ত হত্যার নিন্দা জানাই’।

রাজ্যের সমতল অংশে বসবাস করা প্রভাবশালী মেইতেই সম্প্রদায়ের যুবক ছিলেন মায়াংলামবাম ঋষিকান্ত সিং। রাজ্যের পাহাড়ি অংশে বসবাস করা কুকি সম্প্রদায়ের এক নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের জের ধরেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তিনি।

২০২৩ সাল থেকে চলমান জাতিগত সহিংসতায় মণিপুরের দুটি প্রধান সম্প্রদায় মেইতেই ও কুকিদের মধ্যে এখন চরম শত্রুভাবাপন্ন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই বিভেদ এতটাই স্পষ্ট যে, সমতলে আর পা রাখছে না কুকিরা। অন্যদিকে মেইতেই গোষ্ঠীর মানুষের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে পাহাড়ি অঞ্চল।

এমন পরিস্থিতির মাঝেই নিজের প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে কুকি-জো অধ্যুষিত এলাকায় ঢুকে পড়েছিলেন ঋষিকান্ত। তাঁর প্রেমিকা চিংনু হাওকিপ কুকি-জো জনগোষ্ঠীর নারী। চিংনুর সঙ্গে বসবাস করতে নিজের পরিচয় বদলে ফেলেছিলেন ঋষিকান্ত। গিনমিনথাং নতুন নাম নিয়ে তিনি নিজেকে কুকি-জো হিসেবে পরিচয় দিতেন। ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে তিনি মিজোরামের আইজল হয়ে কুকিদের এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন।

গত ২১ জানুয়ারি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ঋষিকান্তকে গুলি করে হত্যার একটি ভয়াবহ ভিডিও। এতে দেখা যায়, জীবনভিক্ষা চেয়েও রক্ষা হয়নি তাঁর। সেই ভিডিও দেখেই ঋষিকান্তের পরিবার প্রথম জানতে পারে যে, তিনি কুকিদের এলাকায় বসবাস করছিলেন। পরে চিংনুও ঋষিকান্তের পরিবারকে ফোন করে জানান, একটি কুকি সশস্ত্র দল তাঁদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং ঋষিকান্তকে তারা গুলি করে হত্যা করেছে।

ঋষিকান্তের শৈশবের বন্ধু দয়ানন্দ শর্মা বলেন, ‘তার একমাত্র অপরাধ ছিল সে ভালোবেসেছিল।’ তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী—প্রেমিকার সঙ্গে থাকতে গিয়েই নাম ও পরিচয় পাল্টাতে বাধ্য হয়েছিলেন ঋষিকান্ত।

ভাইকে হত্যার অভিযোগ জানিয়ে ঋষিকান্তের বড় বোন আশালতা এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও চিংনু হাওকিপকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

ঘটনার পর মেইতেই সংগঠনগুলোর উদ্যোগে একটি যৌথ অ্যাকশন কমিটি (জেএসি) গঠিত হয়েছে। তারা সরকারের কাছে বিচার দাবি করে স্মারকলিপি জমা দিয়েছে। রাজ্যের গভর্নর অজয় কুমার ভাল্লার সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেছেন নিহতের ভাই প্রেম সিং। পুলিশের একটি সূত্র এই হত্যাকাণ্ডকে ‘প্রেমের সম্পর্কের করুণ পরিণতি’ আখ্যা দিয়েছে।

জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে এমন আশঙ্কায় গত ২৪ জানুয়ারি মণিপুর হাইকোর্ট ভাইরাল ভিডিওটি দ্রুত অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কুকি জনগোষ্ঠীর অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের গোটা সম্প্রদায়কেই অপরাধী বানানো হচ্ছে। এক কুকি নাগরিক বলেন, ‘আমাদের নারীদের নগ্ন করে ঘোরানো হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে—তখন কেউ কথা বলেনি। এখন হঠাৎ সবাই জেগে উঠেছে!’

রোববার (২৫ জানুয়ারি) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট জানিয়েছে, ২০২৩ সালের সহিংসতার সময় পাহাড় ও সমতল আলাদা করতে যে বাফার জোন তৈরি হয়েছিল, তা এখন কার্যত এক অদৃশ্য সীমান্তে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় ৩১ বছর বয়সী ঋষিকান্ত সিংয়ের হত্যাকাণ্ড মণিপুরের সংঘাতকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। মামলাটি এখন ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত