Ajker Patrika

বিবিসির প্রতিবেদন /ভারতে বেসরকারি হাসপাতালের রমরমা: সুযোগ বাড়লেও সাধারণের নাগালের বাইরে সেবা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ভারতে বেসরকারি হাসপাতালের রমরমা: সুযোগ বাড়লেও সাধারণের নাগালের বাইরে সেবা
ভারতের সরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ব্যয় অন্তত ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি পশ্চিম ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের ছোট শহর মিরাজে গিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। এই শহরেই তাঁর বেড়ে ওঠা। সেখানে পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়কের পাশে তিনি ৫০ টিরও বেশি মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র দেখতে পেয়েছেন।

মিরাজ ঐতিহাসিকভাবেই মহারাষ্ট্রের অন্যতম আঞ্চলিক চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই গত পাঁচ বছরের মধ্যে গড়ে উঠেছে। নতুন এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের দ্রুত বিস্তার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে যে নজিরবিহীন উত্থান ঘটেছে, তারই একটি চিত্র তুলে ধরে।

হাসপাতালগুলো প্রায় প্রতি প্রান্তিকেই দ্রুত সম্প্রসারণ করছে এবং হাজার হাজার নতুন শয্যা যোগ করছে। ডায়াগনস্টিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট শহরগুলোতেও তাদের কার্যক্রম বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশজুড়ে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াতে পুঁজিবাজার থেকে শত শত কোটি ডলার সংগ্রহ করছে।

আগস্টের শুরুতে ভারতের সবচেয়ে বড় মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠান মণিপাল হেলথ প্রায় ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করে। এটি চলতি বছরে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে পরিণত হয়। বিশ্বের প্রাইভেট ইক্যুইটি বা পিই বিনিয়োগকারীদের কাছেও ভারতের স্বাস্থ্য খাত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রায় ৬০০টি একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ এবং প্রাইভেট ইক্যুইটি লেনদেন করেছে। এসব লেনদেনের মোট মূল্য ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

গ্রান্ট থর্নটনের তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থের ৪০ শতাংশ গেছে হাসপাতাল খাতে। আরও সাম্প্রতিক সময়ে ওই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে স্বাস্থ্য খাত অতিরিক্ত ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছে। তবে এই বিনিয়োগের জোয়ারের ফলে দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও চিকিৎসাসেবায় প্রবেশাধিকার ব্যাপকভাবে বেড়েছে ঠিকই, একই সঙ্গে লাখ লাখ ভারতীয় এই বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার খরচ বহন করতে না পেরে এর বাইরে চলে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি ভারত সরকারের একটি প্যানেল প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেদনে ভারতের দ্রুত বাড়তে থাকা স্বাস্থ্য অর্থনীতির গভীর বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এবং দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ‘ক্রমবর্ধমান ব্যয়-সামর্থ্য সংকট’ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় প্রায় পাঁচ থেকে ১০ গুণ বেশি। ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের মতো গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও বেড়ে যায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্লিনিক, নার্সিং হোম ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের অসম বাস্তবায়নের কারণে বেসরকারি খাতে চিকিৎসার মান ও খরচে ‘স্পষ্ট বৈষম্য’ তৈরি হয়েছে। এর ফলে রোগীরা ইচ্ছেমতো মূল্য নির্ধারণ এবং নিম্নমানের চিকিৎসা ব্যবস্থার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

প্রতিবেদনে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ‘ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণ’–এর কারণেও রোগীদের অভিযোগ বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত বিল, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সন্তান জন্মদানের মতো সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতির ক্রমবর্ধমান খরচ। প্যানেলের ভাষ্য, এসব বিষয় সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে ‘বিপর্যয়কর ঋণ ও দুর্দশার’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং অনেক পরিবারকে সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য করছে।

এদিকে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত আইভি বা শিরায় ওষুধ দেওয়ার সেটের ওপর ২ হাজার ৮০০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা নেওয়ার তথ্য পেয়েছে। এ ঘটনায় চিকিৎসা সরঞ্জামের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলেছে, চিকিৎসা সরঞ্জামের মূল্য প্রায় পুরোপুরিই নজরদারির বাইরে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের প্যানেল বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে বিতর্ক তৈরি করতে পারে এমন কয়েকটি প্রস্তাব হলো, হাসপাতালের কক্ষের ভাড়া কাছাকাছি এলাকার তিন তারকা হোটেলের কক্ষের ভাড়ার সমপর্যায়ে সীমাবদ্ধ করা, সব বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা ও নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতির মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত চিকিৎসা বা অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা ঠেকাতে মানসম্মত চিকিৎসা নির্দেশিকা চালু করা।

হাসপাতাল চেইনে ৫১ শতাংশের বেশি বিদেশি মালিকানার বিষয়টিকেও প্যানেল সতর্কতার সঙ্গে দেখেছে। ভারতের বেসরকারি হাসপাতালগুলো এসব প্রস্তাবের কিছু অংশের বিরোধিতা করেছে।

ভারতের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এনএটিএইচইএএলটিএইচ (NATHEALTH)-এর মহাসচিব সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের উচিত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কাঠামোগত খরচ কমানোর দিকে নজর দেওয়া। এর মধ্যে কর, জমি, মূলধন, জনবল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম মেনে চলার খরচ রয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসা বা সেবার মূল্যসীমা নির্ধারণের দিকে নয়।

তাঁর মতে, স্বাস্থ্যসেবা খাত মূলধননির্ভর এবং এতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই খাতে ব্যবহৃত মূলধনের বিপরীতে আয় বা রিটার্ন প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থনীতির অনেক অন্য খাতের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে কম, যেখানে মূলধনের বিপরীতে রিটার্ন প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৫ গুণ বেশি।

হাসপাতালের ভাড়ার সঙ্গে হোটেলের ভাড়ার তুলনা করার বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন। তাঁর মতে, এতে হাসপাতালগুলোকে মানতে হওয়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ও শর্ত উপেক্ষা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ড এবং রোগীর নিরাপত্তার নিয়ম। এসব শর্তের কারণে হাসপাতালের পরিচালন ব্যয় বাড়ে।

দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল চেইনগুলোর মধ্যে ম্যাক্স হেলথকেয়ার ও ফোর্টিস সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের ইচ্ছামতো মূল্যসীমা নির্ধারণ হলে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ ‘বাধাগ্রস্ত’ হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থে ঝুঁকিমুক্ত বা পর্যাপ্ত রিটার্ন না পেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এ খাত থেকে দূরে সরে যেতে পারেন।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসার মূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হওয়া দরকার। কারণ বর্তমানে ভারতের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা মূলত পুরোপুরি বিক্রেতানির্ভর বাজারে পরিণত হয়েছে। পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার চিকিৎসক শ্রীনাথ রেড্ডি বলেন, বিশেষ করে তৃতীয় স্তরের বা উন্নত চিকিৎসাসেবায় বিপুল বিদেশি প্রাইভেট ইক্যুইটি অর্থ আসছে। ফলে দেশের বাইরের মানুষই মূলত চিকিৎসার মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এটি হওয়া উচিত নয়।

আরেক স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞ বিবেক এনডি বলেন, এসব হাসপাতালের অনেকেই যে ‘অতিরিক্ত মুনাফা’ করছে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ আরও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, হাসপাতালগুলো বিভিন্ন পরীক্ষা করানো এবং এমন কিছু ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করানোর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে, যেগুলোর হয়তো প্রয়োজনই নেই। বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার।

তবে প্যানেলের কিছু সুপারিশ, যেমন পণ্য ও সেবা কর বা জিএসটির আরও ন্যায্য কাঠামো তৈরি করা, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমাতে কার্যকর হতে পারে বলে মনে করেন বিবেক। তবে তিনি বলেন, এসব সুপারিশ বাধ্যতামূলক করার আগে স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।

ড. রেড্ডিও একই মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার ইচ্ছামতো মূল্যসীমা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সারা দেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত খরচ কত, তার সঠিক হিসাব প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, রাজ্য থেকে রাজ্য এবং শহর থেকে শহরে চিকিৎসার খরচ ভিন্ন হবে। তাই পুরো দেশের জন্য একই ধরনের মূল্যসীমা নির্ধারণ করা যায় না।

তবে চিকিৎসার খরচ নিয়ে এই বিতর্ক যতই তীব্র হোক, বিশেষজ্ঞদের মতে বৃহত্তর গুরুত্ব দিতে হবে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার দিকে। এতে রোগীদের চিকিৎসা খরচ কমবে। সরকারের প্যানেলও একই সুপারিশ করেছে।

বর্তমানে ভারতের সরকারি স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রায় এক দশক আগে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে নির্ধারিত ২ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এটি কম। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ৫ শতাংশ মাত্রার চেয়েও এটি অনেক কম।

সরকারি প্যানেলের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, মাধ্যমিক ও তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবায় তুলনামূলকভাবে কম সরকারি ব্যয়ের কারণে মানুষ ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে তাদের ‘বিপর্যয়কর নিজস্ব ব্যয়’ বা চিকিৎসার পেছনে নিজের পকেট থেকে অত্যধিক অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। বিবেক বলেন, সাধারণ মানুষের বেসরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারকে আরও বেশি সরকারি বিনিয়োগ করতে হবে এবং ‘নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’

তবে একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো, ভারতে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে আনুমানিক আরও ৩০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিপুল মূলধনের একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় ও বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেই আসবে। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা যেখানে বিনিয়োগকারীরা খাতটি থেকে সরে যাবেন না, আবার সাধারণ মানুষও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে উচ্চমূল্যের কারণে বাদ পড়ে যাবেন না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত