Ajker Patrika

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন

সামাজিক বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে ইরান, সত্তর দশকের চীনের প্রতিচ্ছবি দেখছেন বিশ্লেষকেরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ২২: ০০
ইরানে মুদি দোকানের সামনে বিক্ষোভকারীরা। ছবি: সংগৃহীত
ইরানে মুদি দোকানের সামনে বিক্ষোভকারীরা। ছবি: সংগৃহীত

ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। লাগামহীন জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। সমাজের বিভিন্ন ভিন্নমতাবলম্বী অংশ এক হয়ে রাজপথে নেমেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সরকারপন্থী ব্যবসায়ী ও রক্ষণশীল গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি পর্যন্ত। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এই প্রথম এমন ব্যাপক সামাজিক ঐক্য দেখা যাচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার ইরানের রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভ চলাকালে মানুষ একটি সড়ক সংযোগস্থল অবরোধ করে রেখেছে। ছবি: ভিডিও স্ক্রিনগ্র্যাব
গত বৃহস্পতিবার ইরানের রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভ চলাকালে মানুষ একটি সড়ক সংযোগস্থল অবরোধ করে রেখেছে। ছবি: ভিডিও স্ক্রিনগ্র্যাব

গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ডলারের বিপরীতে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের ভয়াবহ পতন ঘটে। এই অর্থনৈতিক বৈকল্যই বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। একই সঙ্গে খামেনি প্রশাসনের দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতায় জনরোষ আরও তীব্র হয়েছে। এর দায় গিয়ে পড়ছে দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর।

বিক্ষোভকারীদের সমন্বিত কোনো নেতৃত্ব বা প্ল্যাটফর্ম নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলন এগিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের সামাজিক অবিচারের ক্ষোভ থেকে। কেননা, ইরানে বর্তমানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ক্ষমতাসীন অভিজাত শ্রেণির সুরক্ষিত সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।

বুধবার ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি সড়কবাজারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক ইরানি নাগরিক। গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ঢেউ চলছে। ছবি: সংগৃহীত
বুধবার ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি সড়কবাজারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক ইরানি নাগরিক। গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ঢেউ চলছে। ছবি: সংগৃহীত

জেনেভাভিত্তিক গ্লোবাল গভর্ন্যান্স সেন্টারের ব্যবস্থাপনা গবেষক ফারজান সাবেত সতর্ক করে বলেন, আজ ইরানে পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এ বছর তা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

বিক্ষোভ শুরুর এক দিন পর ২৯ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, সম্ভাব্য কিছু ঘটনা বিদেশি হস্তক্ষেপ, সামরিক ও অভিজাত শ্রেণির মাঝে ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে। এতে বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

সাবেতের মতে, ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর কাঠামো ও ব্যবস্থাগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখন সবচেয়ে বেশি এবং তা ক্রমেই বাড়ছে।

লন্ডনভিত্তিক বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজও একই মত পোষণ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, ইরান একটি মৌলিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানিরা কোনো রাজনৈতিক বিপ্লব নয়, বরং একটি ‘সামাজিক বিপ্লব’ চাইছে। যেখানে রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে।

২৯ ডিসেম্বর ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সেতুর ওপর দিয়ে মিছিল করছেন বিক্ষোভকারীরা। ছবি: সংগৃহীত
২৯ ডিসেম্বর ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সেতুর ওপর দিয়ে মিছিল করছেন বিক্ষোভকারীরা। ছবি: সংগৃহীত

এই অস্থিরতা ২০১৮ সালের পর সরকারবিরোধী তৃতীয় বড় ঢেউ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, কর্তৃপক্ষ এবারও গ্রেপ্তার ও বলপ্রয়োগের পথেই হাঁটবে। খামেনি ও কট্টরপন্থীরা বরাবরের মতো বিক্ষোভকারীদের ‘শত্রু-সমর্থিত দাঙ্গা’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

কিন্তু বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও তাদের বাসিজ আধা সামরিক শাখার সহিংস দমননীতির কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসতে পারেন। বিশেষ করে বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনা ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকলে।

এদিকে, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল এবং খামেনির সর্বময় নিয়ন্ত্রণের কারণে কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।

ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি ও তেলের দাম হ্রাসের প্রেক্ষাপটে ডিসেম্বরের শেষ দিকে পেজেশকিয়ান একটি বাজেট প্রস্তাব দেন। এতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রিয়ালের অতিমূল্যায়িত সরকারি বিনিময় হারকে খোলা বাজারের হারের সঙ্গে একীভূত করা এবং নির্দিষ্ট আমদানিকারক ও উৎপাদকদের সুবিধা দেওয়া প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্বচ্ছ ভর্তুকি কমানো।

অর্থনীতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে রুটির ভর্তুকিও কমানো হয় এবং আমদানিকৃত জ্বালানির দাম বাজারমূল্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু এসব পদক্ষেপ আদতে সাধারণ মানুষের ওপর বোঝা হয়েই দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতিবিদেরা ধারণা করছেন, মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৫২ শতাংশের চেয়েও অনেক বেশি হবে। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে মাসিক ৭ ডলার সমপরিমাণের সর্বজনীন ভাতা চালু করেছে, এটি মাসিক ১০৫ ডলারের ন্যূনতম মজুরির তুলনায় নগণ্য।

ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বারবারা স্ল্যাভিন বলেন, মুদ্রাস্ফীতি এখন অসহনীয়। কিছু একটা ছেড়ে দিতেই হবে। তাঁর মতে, খামেনির উচিত পেজেশকিয়ানকে প্রকৃত ক্ষমতা দেওয়া, যাতে তিনি প্রয়োজনীয় পণ্য রেশনিং থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠনের মতো বড় সংস্কার করতে পারেন।

তবে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাও বাড়ছে। ২০২৪ সালের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় খামেনির সম্ভাব্য উত্তরসূরি সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর ঘটনায় শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়েছে। সংস্কারপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং জনতাবাদী সাবেক নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদসহ সম্ভাব্য উত্তরসূরিরা ক্রমেই খামেনির ব্যর্থতার সমালোচনা করছেন।

সমালোচকেরা অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং জুনের সংঘাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ঠেকাতে ইরানের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরছেন। ওই সংঘাতে ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতারা মারা যান এবং দেশের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাস্তায় জনগণের চাপ ও অভিজাত শ্রেণির ভেতরের চাপ মিলিয়ে শাসনব্যবস্থা এখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থায় ইরান গবেষণার সাবেক প্রধান ডেনিস সিত্রিনোভিচ বলেন, ঘটনা যত দীর্ঘস্থায়ী ও চরম হবে, শাসনব্যবস্থার ভেতরে নাটকীয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তত বাড়বে।

তবে কিছু ইরানি বিশ্লেষক এই সংকটে একজন ‘নেপোলিয়ন-ধাঁচের’ শক্তিমান নেতার ধারণা সামনে আানছেন। ইসলামি অনুমোদনপ্রাপ্ত একজন স্বৈরশাসক, যিনি এই ব্যবস্থাকে ভাঙন থেকে বাঁচাতে পারেন। ইরানি বিশ্লেষক আলী আলফোনেহ ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’ নামে একটি বিকল্প মডেল সামনে এনেছেন। তিনি সেখানে শাসনব্যবস্থার ভাঙনের পরিবর্তে নেতৃত্বের পরিবর্তনের কথা বলেছেন।

আলফোনেহর মতে, ইরানের নির্বাহী, বিচার বিভাগ, আইনসভা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত ইরানের যৌথ নেতৃত্ব যদি খামেনিকে জলাঞ্জলি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় যায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তাঁর মতে, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সরাসরি ক্ষমতা দখলের চেয়ে বেসামরিক প্রেসিডেন্সিসহ যৌথ নেতৃত্ব বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী। এতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, পশ্চিমা বিনিয়োগ পুনরায় শুরু, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শেষ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার টিকে থাকা সম্ভব হতে পারে।

তবে বারবারা স্ল্যাভিন মনে করেন, ইরানের প্রয়োজন একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তর। যেখানে ইসলামি শাসনের অবসান ও সংবিধানিক গণভোটের সূচনা হবে। তিনি বলেন, ইরানের নাগরিক সমাজে অনেক যোগ্য নেতৃত্ব রয়েছে। দুঃখজনকভাবে যাদের অনেকেই এখন তেহরানের এভিন কারাগারে।

স্ল্যাভিনের মতে, ইরানের সম্ভাব্য পুনরুত্থান সবচেয়ে বেশি মিলে ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকের চীনের সঙ্গে। যেটি ছিল একটি বাস্তববাদী সংস্কারের সময়কাল। তবে তিনি সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি নিশ্চিত নই, এটা ইরানে পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব কি না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মানুষ মনে করে, ৫ আগস্টের আগের পুলিশ কেন গ্রেপ্তার করবে, কেন রাস্তা ছাড়তে বলবে—আইজিপির আক্ষেপ

আযাদ, জারাসহ ৫১ জন ফিরে পেলেন প্রার্থিতা

গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ডকে মাদুরো উৎখাতের পরিকল্পনার বাইরে রেখেছিলেন ট্রাম্প

‘ভারতের কোনো ভেন্যুতেই খেলবে না বাংলাদেশ’

বিনা মামলায় আ.লীগের নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হলে থানা ঘেরাও করব: হারুনুর রশীদ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত