Ajker Patrika

বুলেটের বদলে বই—সিরিয়ার শিশুদের মুখে হাসি ফেরাচ্ছে ‘সাংস্কৃতিক বাস’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ৩৬
বুলেটের বদলে বই—সিরিয়ার শিশুদের মুখে হাসি ফেরাচ্ছে ‘সাংস্কৃতিক বাস’
এই প্রকল্প সিরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছে বই। ছবি: সংগৃহীত

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের আল-কুতায়ফাহ শহরে এক খোলা চত্বরে উজ্জ্বল রঙের চেয়ারে গোল হয়ে বসে আছে একদল শিশু। তাদের উৎসুক চোখ তাকিয়ে আছে এক ব্যক্তির দিকে, যিনি পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি ব্যতিক্রমী বাসের ভেতর থেকে গল্প শুনিয়ে যাচ্ছেন। শিশুদের হাসিতে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে, যা কিছুক্ষণের জন্য হলেও বদলে দিয়েছে সেখানকার পরিবেশ।

এখানে যুদ্ধবিমানের গর্জন নেই, নেই বারুদের গন্ধ, বুলেটের শব্দ। তার বদলে অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য সেখানে তৈরি হয়েছে আনন্দ আর কল্পনার এক স্বর্গরাজ্য, যা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে চাকার ওপর ভর করে।

২০২৫ সালের আগস্টে সিরিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের চালু করা ‘সাংস্কৃতিক বাস’ উদ্যোগের মূল চিত্র এটিই। বর্তমানে এই প্রকল্পে দুটি বাস রয়েছে, যার প্রতিটিতে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০টি বই। এই বাসগুলো মূলত ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি হিসেবে কাজ করে, যা দীর্ঘকাল ধরে মৌলিক সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত প্রত্যন্ত গ্রাম ও অবহেলিত গ্রামাঞ্চলে বই, শিল্পকলা এবং সৃজনশীলতা পৌঁছে দিচ্ছে।

এই ‘সাংস্কৃতিক বাস’-এর পেছনের দর্শনটি বেশ সহজ—সংস্কৃতি শুধু বড় শহরের মানুষের জন্য বিশেষাধিকার হতে পারে না।

প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ মুরাদ বলেন, বাসটিতে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বৈচিত্র্যময় বই, উপন্যাস এবং ছোটগল্পের সংগ্রহ রয়েছে। বাসের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী লেখক, কবি ও শিল্পীদের একটি দল যুক্ত আছে। তাঁরা বিনোদন ও শিক্ষার সমন্বয়ে স্থানীয় বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনকে প্রাণবন্ত করে তুলতে সাহায্য করছেন।

মুরাদ বলেন, এই প্রকল্পের বৃহত্তর লক্ষ্য জ্ঞানকে সবার জন্য উন্মুক্ত করা। নিয়মিতভাবে এসব জনপদে যাওয়ার মাধ্যমে প্রকল্পটি বই পড়াকে একটি বিরল শখ নয়, বরং একটি সাধারণ সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করতে চায়।

এই বাসের কর্মসূচিগুলো বেশ বৈচিত্র্যময়। এতে রয়েছে মিথস্ক্রিয়ামূলক পাঠদান, ঐতিহ্যবাহী ‘হাকাওয়াতো’ (গল্প বলা), শিল্প ও লেখালেখির কর্মশালা, শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কন, এমনকি হালকা শারীরিক ব্যায়াম। এসব কিছুই করা হয়েছে এমন একটি পরিবেশ তৈরির জন্য, যেখানে শিশুরা অবাধে তাদের প্রতিভা অন্বেষণ করতে পারবে।

মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক মূল্যায়ন বলছে, এই মডেল অত্যন্ত কার্যকর এবং এটি সিরিয়ার অন্যান্য প্রদেশেও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

সিরিয়ার এক গ্রামীণ জনপদে যাত্রাবিরতিকালে ‘সাংস্কৃতিক বাস’ আয়োজিত একটি পাঠচক্রে অংশ নিয়েছে শিশুরা। ছবি: সংগৃহীত
সিরিয়ার এক গ্রামীণ জনপদে যাত্রাবিরতিকালে ‘সাংস্কৃতিক বাস’ আয়োজিত একটি পাঠচক্রে অংশ নিয়েছে শিশুরা। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সাংস্কৃতিক বাসটি কুনেইত্রা, দেইর এজ-জোর, লাতাকিয়া ও তার্তুস প্রদেশগুলো ঘুরে বেড়িয়েছে, যেখানে মানুষের শিক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না। এই উদ্যোগ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল, স্কুল এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে, যা এর শিকড়কে আরও গভরে নিয়ে গেছে।

মুরাদ বলেন, এই প্রকল্প একটি জরুরি সাংস্কৃতিক তাগিদ থেকে শুরু হয়েছে।

তিনি মনে করেন, বছরের পর বছর ধরে চলা আসাদ সরকারের সংঘাত সিরিয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়কে খণ্ডিত করেছে, স্কুল ধ্বংস করেছে এবং শিশুদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।

শিশুদের সিরিয়ার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করার মাধ্যমে সেই ক্ষতি পূরণ করতে চায় এই বাস। এর মাধ্যমে তারা দেশের ঐতিহাসিক স্থান সম্পর্কে জানতে পারে। এমনকি কাচশিল্প বা সাবান তৈরির মতো কারুশিল্প সম্পর্কেও জানার সুযোগ পায়। এর মূল মন্ত্র হলো— সংস্কৃতি... সচেতনতা...পুনর্গঠন।

টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, প্রকল্পটি সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে। প্রকাশনা সংস্থা এবং লাইব্রেরিগুলো নিয়মিত বই দান করছে এবং লজিস্টিক সহায়তা এই বাসের যাত্রা অব্যাহত রাখতে সাহায্য করছে।

মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক মূল্যায়ন বলছে, এই মডেল অত্যন্ত কার্যকর এবং এটি সিরিয়ার অন্যান্য প্রদেশেও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক মূল্যায়ন বলছে, এই মডেল অত্যন্ত কার্যকর এবং এটি সিরিয়ার অন্যান্য প্রদেশেও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমানে আট হাজারের বেশি শিশু এই বাসের সুবিধা পাচ্ছে এমন এক দেশে, যেখানে অনেক স্কুলে সাধারণ লাইব্রেরিও নেই।

দামেস্কের আল-হাজার আল-আসওয়াদ শহরের ১২ বছর বয়সী রিম আল-আবসি বলে, ‘বাসের এই সফর আমার কাছে অবিস্মরণীয়। আমি গল্প পড়তে ভালোবাসি কিন্তু কাছেপিঠে কোনো লাইব্রেরি নেই। এই বাস আমাকে পড়ার এবং ভালো কিছু করার সুযোগ করে দিয়েছে।’

তাঁর কাছে বাস আসার দিনটি যেন এক উৎসব।

শিক্ষাক্ষেত্রের বাইরে এই বাস একটি গভীর ও শান্ত প্রতিরোধের প্রতীক। আলেপ্পোর ৪১ বছর বয়সী শিক্ষক নূরা আল-রাসলান একে বর্ণনা করেছেন ‘শ্বেত প্রতিরোধ’ হিসেবে। এটি এমন এক লড়াই, যা বুলেটের বদলে শব্দ, রং আর সুর ব্যবহার করে।

আল-রাসলান বলেন, ‘ভয়াবহ যুদ্ধের পর আমাদের অন্য রকম এক প্রতিরোধের প্রয়োজন ছিল। এই বাস গ্যারেজের নিস্তব্ধতা ভেঙে কাঠের তাকে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে সিরিয়ার পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

সিরিয়ায় বর্তমানে সাংস্কৃতিক বাস কেবল একটি পরিষেবা নয়, এটি একটি সামাজিক দর্শন।

ইউনিসেফের মতে, যুদ্ধে সিরিয়ায় সাত হাজারের বেশি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, যার ফলে প্রায় ২০ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রকল্পগুলো এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিরিয়ার গ্রামাঞ্চলের আঁকাবাঁকা পথে এই বাস এখন এক জীবন্ত সেতুবন্ধন, যা শিশুদের হাতে বই ফিরিয়ে দিচ্ছে এবং সংস্কৃতিকে তার যোগ্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত করছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত