Ajker Patrika

ব্যবহৃত পোশাকের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে যে দেশের মরুভূমি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১৫: ১৮
ব্যবহৃত পোশাকের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে যে দেশের মরুভূমি
চিলি প্রতি বছর ১ লাখ ২৩ হাজার টন ব্যবহৃত পোশাক আমদানি করে। ছবি: এএফপি

পোশাক ব্যবহারের সময় কখনো মাথায় আসে কি আপনার ফেলে দেওয়া পোশাকগুলো গন্তব্য কোথায়? অবশ্য পোশাকের ভবিষ্যৎ ভেবে তো আর কেউ পোশাক কিনছে না। কিন্তু রিসাইকেলিং সম্ভব না হলে সেসব পোশাক বর্জ্য হিসেবে পৃথিবীর বোঝা বাড়িয়েই চলে। তেমনই বর্জ্যের এক গন্তব্যে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার চিলি। দেশটির মরুভূমি অঞ্চলগুলো এরইমধ্যে পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে।

বিবিসির প্রতিবেদনে জানা যায়, যুক্তরাজ্য বা উত্তর আমেরিকায় ব্যবহৃত কাপড় রিসাইকেলের জন্য দেওয়া হলেও সেই পোশাকগুলোর শেষ গন্তব্য হয় চিলির উত্তরাঞ্চলীয় কোনো মরুভূমি, তাও আবার অবৈধভাবে।

ব্যবহৃত পোশাক আমদানিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে যেসব পোশাক পুনরায় বিক্রি সম্ভব হয় না, সেগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় স্তূপ করে ফেলে রাখা হচ্ছে জনশূন্য ও রুক্ষ মরু প্রান্তরে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চিলি প্রতি বছর ১ লাখ ২৩ হাজার টন ব্যবহৃত পোশাক আমদানি করে। আর এটি সম্ভব হয় দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় ইকুয়িকি বন্দরের কারণে, যা মূলত একটি শুল্কমুক্ত বন্দর।

ইকুয়িকি শহর ও এর আশপাশের ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের কাস্টমস ডিউটি বা ভ্যাট (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) ছাড়াই পণ্য আমদানি, সংরক্ষণ ও বিক্রি করতে পারেন। এই অঞ্চলটি ’জোফ্রি’ (Zofri) নামে পরিচিত, যার পূর্ণরূপ হলো ‘জোনা ফ্রাঙ্কা ডেল ইকুয়িকি’ (ইকুয়িকি শুল্কমুক্ত অঞ্চল)।

উত্তরাঞ্চলীয় চিলির অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গতি আনতে ১৯৭৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বর্তমানে ব্যবহৃত পোশাক এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আমদানিপণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ ও এশিয়া থেকে বড় বড় শিপিং কন্টেইনারে করে এসব পোশাকের গাঁট এখানে এসে পৌঁছায়। এরপর সেগুলো হয় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়, নয়তো লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে রপ্তানি করা হয়।

জোফ্রির জেনারেল ম্যানেজার ফেলিপে গঞ্জালেজ জানান, পোশাক আমদানির সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, ‘এই খাতটিই এই অঞ্চলের নারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে। এখানকার প্রায় ১০ শতাংশ নারী টেক্সটাইল খাতের সঙ্গে যুক্ত।’

তিনি আরও বলেন, ‘পোশাকের গুণগত মান অনুযায়ী সেগুলো বাছাই করে আলাদা করার কাজে এই নারীরা সহায়তা করেন। এটি খুব বেশি উচ্চ-দক্ষতার কাজ নয়, ফলে বিশেষ কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই সাধারণ মানুষের জন্য এখানে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

সবচেয়ে নিম্নমানের পোশাকগুলোর গন্তব্য হয় ‘লা কুয়েব্রাডিলা’ নামক একটি বিশাল উন্মুক্ত বাজারে। এটি ইকুয়িকি থেকে পাহাড়ের ওপর আধঘণ্টার পথ আলতো হোসপিসিও শহরের কাছে অবস্থিত এবং এটিও জোফ্রি শুল্কমুক্ত অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

সেখানে সারি সারি তাঁবু বা প্যান্ডেলের নিচে প্লাস্টিকের শিটের ওপর পোশাকের বিশাল স্তূপ সাজিয়ে রাখা হয়। দোকানদারেরা টি-শার্ট থেকে শুরু করে জিনস-ফ্রক সবই বিক্রি করেন। দামও বেশ সস্তা, মাত্র ৫০০ চিলিয়ান পেসো থেকে বিক্রি শুরু হয়। সস্তায় কেনাকাটা করতে পর্যটক ও স্থানীয়রা বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে এখানে ভিড় জমান।

পোশাকের এই ব্যবসা স্থানীয় অর্থনীতিতে চাকা সচল রাখলেও বড় সমস্যা দেখা দেয় যখন অনেক পোশাক অবিক্রীত থেকে যায়। সেগুলো স্থানীয় সিটি কর্পোরেশনের ল্যান্ডফিলে (ময়লা ফেলার স্থান) ফেলা যায় না, কারণ ওই জায়গাগুলো শুধু গৃহস্থালি বর্জ্যের জন্য নির্ধারিত, বাণিজ্যিক আমদানির জন্য নয়।

চিলি প্রতি বছর ১ লাখ ২৩ হাজার টন ব্যবহৃত পোশাক আমদানি করে। ছবি: এএফপি
চিলি প্রতি বছর ১ লাখ ২৩ হাজার টন ব্যবহৃত পোশাক আমদানি করে। ছবি: এএফপি

নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের উচিত এই অবিক্রীত পোশাকগুলো হয় অন্য দেশে রপ্তানি করা, অথবা শুল্কমুক্ত অঞ্চলের বাইরে চিলির অন্য কোথাও বিক্রির জন্য কর প্রদান করা, অথবা কোনো অনুমোদিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা।

কিন্তু এই প্রতিটি বিকল্পই বেশ ব্যয়বহুল। তাই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী খরচ বাঁচাতে পোশাকগুলো অবৈধভাবে পুড়িয়ে ফেলেন অথবা শহরের পার্শ্ববর্তী আটাকামা মরুভূমিতে ফেলে দিয়ে আসেন। সর্বোচ্চ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৩৯ হাজার টন কাপড় এভাবে অবৈধভাবে মরুভূমিতে স্তূপ করা হচ্ছে।

আলতো হোসপিসিও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য এটি এক বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত মিগুয়েল পাইনেনাহুয়েল বলেন, এই অবৈধ বর্জ্য নিক্ষেপ নজরদারি করা বা বন্ধ করা খুবই কঠিন।

তিনি বলেন, ‘আলতো হোসপিসিও মরুভূমি ও পাহাড় দিয়ে ঘেরা, যেখানে লরি বা ট্রাকে করে কাপড় ফেলে আসা খুব সহজ। আমাদের কাউন্সিল থেকে টহল গাড়ি ও ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করার চেষ্টা করা হয় যাতে অপরাধীদের শনাক্ত করে জরিমানা করা যায়।’

তবে তিনি আক্ষেপ করে স্বীকার করেন, ‘এত বেশি ট্রাক এখানে কাপড় ফেলছে যে সব কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আমাদের পর্যাপ্ত জনবল বা সম্পদও নেই।’

অবশ্য এই সংকটের মাঝে বর্জ্য পোশাককে ব্যবসায়িক সুযোগে রূপান্তরের একটি আশার আলো দেখা দিয়েছে।

ইকুয়িকি শহরে ‘সেন্ট্রো টেকনোলজিকো ডি ইকোনমিয়া সার্কুলার’ (CircularTec) এর নির্বাহী পরিচালক লুইস মার্টিনেজ এই নিয়ে কাজ করছেন। এটি চিলির একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যারা বর্জ্য ফেলে না দিয়ে সম্পদের পুনর্ব্যবহার বা সার্কুলার ইকোনমি নিয়ে কাজ করে। সম্প্রতি মার্টিনেজ একটি প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছেন যেখানে অবিক্রীত পোশাকগুলোকে কীভাবে নতুন রূপ দিয়ে ব্যবহার করা যায় তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না আটাকামা মরুভূমি কাপড় ফেলে রাখার পাহাড় দেখার পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাক।’

মার্টিনেজ পরিত্যক্ত পোশাকের নতুন ব্যবহারের জন্য তৈরি হতে থাকা একটি কারখানার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এবং আমাদের ধারণা অনুযায়ী এটি অবিক্রীত পোশাকের একটি বড় অংশ প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম হবে।’

আলতো হোসপিসিও থেকে ২০ মিনিটের ড্রাইভ দূরে উত্তপ্ত ও বাতাসমুখর মরুভূমির বুকে বেকির কনকুর নামের এক ব্যবসায়ী এই কারখানাটি নির্মাণ করছেন। আদতে তুরস্কের নাগরিক হলেও ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে চিলিতে কাজ করছেন তিনি। এই অঞ্চলে টেক্সটাইল আমদানিকারকদের মধ্যে তিনি অন্যতম বড় ব্যবসায়ী। প্রতি মাসে তার প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ কনটেইনার কাপড় আমদানি করে।

তিনি জানান, পরিত্যক্ত পোশাকের এই সমস্যার একটি সমাধান চাই এবং এই কারখানাটি সেই লক্ষ্যে সহায়ক হবে বলে আশা করেন তিনি।

আগামী কয়েক মাসের মধ্যে কারখানাটি পূর্ণোদ্যমে চালু হলে এর সক্ষমতা কেমন হবে, তার বর্ণনা দেন তিনি। বেকির বলেন, “আমরা যে কারখানাটি তৈরি করছি সেখানে পানি বা কোনো কেমিক্যালের প্রয়োজন হবে না। আমরা এমন কিছু মেশিন ব্যবহার করব, যা কাপড়গুলোকে আঁশে (fibre) পরিণত করবে এবং তারপর সেগুলো থেকে ‘ফেল্ট’ (এক ধরনের পুরু কাপড়) তৈরি হবে। এই ফেল্টগুলো ম্যাট্রেস বা তোশক, আসবাবপত্র, গাড়ির ভেতরকার অংশ এবং ইনসুলেশন বা তাপ নিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হবে।”

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করছি, দিনে ২০ টন কাপড় প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা আমাদের থাকবে।’

তিনি স্বীকার করেন যে, এই উদ্যোগ নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো চিলির বর্তমান আইনের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া।

গত জুলাই মাসে টেক্সটাইল বা পোশাক খাতকে চিলির বিদ্যমান ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপন্সিবিলিটি’ (Rep) আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, যেসব কোম্পানি পণ্য বিক্রি করে, সেই পণ্যের আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পর সেটির কী হবে, তার দায়ভারও সেই কোম্পানিকেই নিতে হবে।

পোশাক খাতের জন্য এর অর্থ হলো, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, খুচরা বিক্রেতা এবং আমদানিকারকদের ভবিষ্যতে এই বর্জ্য পোশাক সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার, রিসাইকেল বা যথাযথভাবে ধ্বংস করার খরচ ও ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। এই দায়িত্ব বা খরচ এখনকার মতো সিটি কাউন্সিল বা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপানো যাবে না।

সরকার বর্তমানে পোশাক খাতের জন্য এই আইনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা তৈরির কাজ করছে।

বেকিরের কাছে এটি এক বড় ব্যবসায়িক সম্ভাবনা। এই নতুন কারখানায় তিনি ৭০ লাখ ডলার (৫২ লাখ পাউন্ড) বিনিয়োগ করেছেন। তিনি আশা করছেন, চিলির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এবং ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে পরিত্যক্ত পোশাক সংগ্রহের দায়িত্ব নিয়ে তিনি এই বিনিয়োগ তুলে আনতে পারবেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন যাঁরা

যেসব শর্তে ইতিবাচক সাড়া পেলে ইসলামাবাদে আসতে রাজি ইরান

আ.লীগ নেতারা চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত ছিলেন, মন্ত্রীরাও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেতেন না: আব্দুল মোমেন

সিটি ও আন্তজেলা বাসে ২২ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর আলোচনা, সিদ্ধান্ত কাল

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল চ্যালেঞ্জ করে রিট

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত