Ajker Patrika

দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার নিয়োগ নিয়ে যা বলছেন ভারতীয় সাংবাদিক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার নিয়োগ নিয়ে যা বলছেন ভারতীয় সাংবাদিক
দীনেশ ত্রিবেদী। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার খবর প্রকাশ করেছে হিন্দুস্তান টাইমস। সাধারণত, এসব ক্ষেত্রে পেশাদার কূটনীতিকদের নিয়োগ দেওয়া হলেও এবারে ব্যাতিক্রম হয়েছে। দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগের বিষয়ে মূল্যায়ন প্রকাশ করেছেন ভারতীয় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পিকে বালাচন্দ্রন।

বালাচন্দ্রন তাঁর মূল্যায়নে লিখেছেন, ভারতে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে (৭৫) বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার খবর ভারতে বেশ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এসব পদে সাধারণত পেশাদার কূটনীতিক নিয়োগ দেওয়া হলেও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়েছে। বাংলাদেশেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

ভারতে এই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পেছনে বড় কারণ ত্রিবেদীর দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ রাজনৈতিক জীবন। রাজনীতিক হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁকে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্তও নিয়ে গেছে। পেশাদার কূটনীতিকের বদলে অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে তিনি হাইকমিশনার পদে বৃহত্তর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং বেশি নমনীয়তা নিয়ে আসবেন এমনটাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সাধারণত কূটনীতিকেরা যেখানে আমলাতান্ত্রিক নিয়মকানুনে বাঁধা থাকেন, সেখানে ত্রিবেদী তুলনামূলকভাবে বাস্তববাদী ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পন্থা নিতে পারেন। এতে করে সম্পর্ক গড়ে তোলা, গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের প্রভাবিত করা এবং জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামলানো তাঁর জন্য সহজ হতে পারে।

তাঁর রাজনৈতিক প্রবৃত্তি ও প্রজ্ঞা তাঁকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীলভাবে বোঝার সুযোগ দেবে। অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতার বাধা না থাকায় তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ও অংশীদারদের সঙ্গে আরও খোলামেলা যোগাযোগ করতে পারবেন। কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে সাধারণত স্বাগতিক দেশের প্রতিনিধিরা বিদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সতর্ক থাকেন এবং তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান থাকেন। কিন্তু রাজনীতিকদের সঙ্গে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি খোলামেলা ও স্পষ্টভাবে কথা বলেন। ফলে ত্রিবেদী পেশাদার কূটনীতিকের তুলনায় আরও নির্ভরযোগ্য ও খোলামেলা তথ্য পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

ত্রিবেদীর রাজনৈতিক পথচলা বেশ পরিবর্তনশীল। সমালোচকেরা তাকে ‘রঙ বদলানো’ রাজনীতিক হিসেবে দেখলেও এই অভিযোজন ক্ষমতাই তাঁকে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত যোগাযোগ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে বলেও মনে করেন কিছু বিশ্লেষক।

তিনি ১৯৮০-এর দশকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। পরে ১৯৯০ সালে তিনি জনতা দলে যোগ দেন এবং ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত গুজরাট থেকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে নবগঠিত অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং দলটির প্রথম সাধারণ সম্পাদক হন। ২০০৯ সালে তিনি ব্যারাকপুর থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হন এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে মমতা ব্যানার্জি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হতে রেলমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিলে ত্রিবেদী পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় রেলমন্ত্রী হন।

তবে ২০১২ সালের মার্চে যাত্রীভাড়া বাড়ানো নিয়ে ব্যানার্জির সঙ্গে প্রকাশ্য মতবিরোধের জেরে প্রথম রেল বাজেট পেশের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করেন। ২০১৯ সালে তিনি ব্যারাকপুর থেকে লোকসভা নির্বাচনে পরাজিত হন। পরে তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে রাজ্যসভায় মনোনীত করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আসন ও দল—উভয়ই ছেড়ে দিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) যোগ যোগ দেন। সব মিলিয়ে, ত্রিবেদী প্রায় এক দশক কংগ্রেসে, ৮ বছর জনতা দলে এবং দুই দশকের বেশি সময় তৃণমূল কংগ্রেসে কাটানোর পর নাটকীয়ভাবে বিজেপিতে যোগ দেন।

ঢাকায় তাঁর নিয়োগ এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছে। নোবেলজয়ী মোহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়। ১৮ মাস পর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় ক্ষমতায় ফিরে এলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ শুরু করে নয়াদিল্লি।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তারেক রহমানের মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আনুষ্ঠানিকভাবে রহমানকে নয়াদিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

সর্বশেষ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দুই দিনের সফরে নয়াদিল্লি যান। বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর এটিই ছিল প্রথম মন্ত্রী পর্যায়ের যোগাযোগ। তিনি জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং মরিশাসে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়ান ওশেন কনফারেন্সে অংশ নেন।

যদিও সম্পর্কের বাহ্যিক চিত্র কিছুটা উন্নত হয়েছে, কিন্তু মূল দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোতে এখনও তেমন অগ্রগতি নেই। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে নদীর পানির ন্যায্য বণ্টন, ভারতের সঙ্গে স্থলপথ বাণিজ্যে আরও প্রবেশাধিকার এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ—যাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের প্রধান উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে সংযোগ প্রকল্প জোরদার করা, সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতা, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আশঙ্কা এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা।

এই বিষয়গুলো অত্যন্ত জটিল ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। ত্রিবেদীর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিকের কাছেও এর সহজ সমাধান নাও থাকতে পারে—যদিও তাঁর ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অস্টিনের এমবিএ ডিগ্রিসহ শক্তিশালী শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে। তবে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সম্পর্ক গড়ে তোলার দক্ষতা প্রতিবন্ধকতা কমাতে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা—উভয়েরই গুজরাটি পটভূমি এবং বিজেপির সদস্যপদ—একটি বড় সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি মোদির চিন্তাভাবনা ভালোভাবে বুঝতে পারবেন এবং প্রয়োজনে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন, যা পেশাদার কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক স্তর পেরিয়ে করা কঠিন।

তবে ত্রিবেদীর এই রাজনৈতিক নমনীয়তা যেমন শক্তি, তেমনি ঝুঁকিও। তাঁর মূল্যায়ন ও সুপারিশ মোদি সরকারের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, যার কিছু অংশ অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এতে করে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নীতিতে অসঙ্গতি দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।

শেষ পর্যন্ত, ঢাকায় ত্রিবেদীর সাফল্য নির্ভর করবে তাঁর রাজনৈতিক বাস্তবতা ও কূটনৈতিক ধারাবাহিকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে, বিশেষ দক্ষতাগুলো কাজে লাগিয়ে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করার সক্ষমতার মধ্যে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন যাঁরা

যেসব শর্তে ইতিবাচক সাড়া পেলে ইসলামাবাদে আসতে রাজি ইরান

আ.লীগ নেতারা চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত ছিলেন, মন্ত্রীরাও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেতেন না: আব্দুল মোমেন

সিটি ও আন্তজেলা বাসে ২২ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর আলোচনা, সিদ্ধান্ত কাল

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল চ্যালেঞ্জ করে রিট

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত