Ajker Patrika

এক দিনের জন্য স্বাধীন রাজ্য হলো এস্তোনিয়ার একটি গ্রাম

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ১৮
এক দিনের জন্য স্বাধীন রাজ্য হলো এস্তোনিয়ার একটি গ্রাম
এবারের বার্ষিক সেতো রাজ্য দিবস উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী সেতো পোশাক পরিহিত নারীরা নৃত্য পরিবেশন করছেন। ছবি: সংগৃহীত

এস্তোনিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গ্রাম বছরে একবারের জন্য রূপ নেয় এক প্রতীকী রাজ্যে। এমনকি সেখানে প্রবেশের জন্য দেওয়া হয় ভিসা, চালু থাকে নিজস্ব প্রতীকী মুদ্রা, এমনকি আয়োজন করা হয় সামরিক কুচকাওয়াজের আদলে একটি প্রদর্শনীও। তবে এই রাজ্যের মূল উদ্দেশ্য শাসন নয়, বরং নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা।

সোমবার (৩ আগস্ট) ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, এই আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু সেতো জনগোষ্ঠী। গত শনিবার দক্ষিণ-পূর্ব এস্তোনিয়ার মিকিতামায়ে গ্রামে সেতোদের ‘কিংডম ডে’ বা রাজ্য দিবসের আয়োজন বসেছিল। উৎসবের মাঠে অ্যাকর্ডিয়নের সুরে ৮০ বছর বয়সী মাইমে কাপতেনকে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নাচতে দেখা যায়। তাঁর গলায় ঝুলছিল রুপার চেইন ও মুদ্রা, যার ঝনঝন শব্দ সেতো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সেতোরা কয়েক শতাব্দী ধরে এস্তোনিয়া ও রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাস করে আসছেন। তাদের কখনো বাস্তব কোনো রাজ্য ছিল না। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এস্তোনিয়া-রাশিয়া সীমান্ত তাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমিকে বিভক্ত করে দেয়। সীমান্তের দুই পাশে থাকা পরিবার ও স্বজনদের একে অপরের সঙ্গে দেখা করা কঠিন হয়ে পড়ে; এমনকি আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে বা পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করতেও তাদের ভিসার প্রয়োজন হতো।

এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই ১৯৯৪ সালে শুরু হয় প্রতীকী ‘সেতো রাজ্য’ আয়োজন। এর লক্ষ্য ছিল বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীকে একত্র করা, তাদের সংস্কৃতির প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং সেতো ভাষা সংরক্ষণ করা।

এস্তোনিয়ার ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সেতো ভাষা বলতে পারেন বলে জানিয়েছেন। তবে ভাষাবিদদের ধারণা, দৈনন্দিন জীবনে এই ভাষা ব্যবহার করেন মাত্র কয়েক হাজার মানুষ। সেতো ভাষা এস্তোনীয় ভাষার ঘনিষ্ঠ হলেও সেতোরা এটিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে বিবেচনা করেন।

প্রতিবছর উৎসবের সময় নির্বাচিত হন সেতো সম্প্রদায়ের নতুন একজন প্রতিনিধি—‘উলেমসুতস্কা’। তিনি লোকবিশ্বাসের দেবতা ও সেতোদের পৌরাণিক রাজা পেকোর পক্ষ থেকে জনগণের কাছে বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করেন। এবার লোকজ পোশাক নির্মাতা ইংরিত কালা উলেমসুতস্কা নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে সেতো সংস্কৃতির প্রচার এবং ভাষা সংরক্ষণ।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন ‘লেলো’ গান। এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই সেতো গায়কি ইউনেসকোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে। একজন নারী গানের প্রথম পঙ্‌ক্তি শুরু করেন, পরে দলগত কণ্ঠে যুক্ত হয় শেষাংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মৌখিকভাবে এই গানগুলো টিকে আছে।

তবে সেতো সংস্কৃতি ও ভাষা সংরক্ষণে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পরিবারে ভাষার ব্যবহার কমে গেলে স্কুলে শেখানো ভাষা যথেষ্ট কার্যকর হয় না বলে মনে করেন এই সম্প্রদায়ের নেতারা। তরুণ প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে কাজ করছেন ২৩ বছর বয়সী মারিয়া গ্রুনবার্গ। তাঁর স্বপ্ন, সেতো গান ও ভাষা যেন শুধু প্রবীণদের ঐতিহ্য হয়ে না থাকে, বরং সব প্রজন্মের মানুষের সম্পদ হয়ে ওঠে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত