Ajker Patrika

বাল্টিকে সামরিক ‘উসকানির’ প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া, চালাতে পারে ‘হাইব্রিড হামলা’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বাল্টিকে সামরিক ‘উসকানির’ প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া, চালাতে পারে ‘হাইব্রিড হামলা’
ইউক্রেনের আভদিভকা অঞ্চলে রুশ সেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে ট্যাংকের গোলা ছুড়ছে ইউক্রেনীয় সেনারা। ছবি: এএফপি

ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে থাকা দুটি দেশ সতর্ক করেছে, রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চল বা পোল্যান্ডে সম্ভাব্য সামরিক ‘উসকানিমূলক পদক্ষেপ’ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা, ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলায় রাশিয়ার অভ্যন্তরে চাপ বাড়তে থাকায় ক্রেমলিন নতুন ধরনের কৌশল নিতে পারে, যা পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ঐক্য ও প্রতিক্রিয়াকে পরীক্ষা করার প্রচেষ্টা হয়ে উঠতে পারে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, গত সোমবার লাটভিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এক বিবৃতিতে জানায়—তারা এমন ইঙ্গিত পেয়েছে যে রাশিয়া বাল্টিক দেশগুলো বা পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে সামরিক উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এটি পূর্ণমাত্রার কোনো হামলার পর্যায়ে পৌঁছাবে না বলেও তারা মনে করছে।

ন্যাটোর আরেক সদস্য দেশের এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক সূত্রও গত সপ্তাহে একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়েছেন। তাঁর দাবি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাল্টিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কোনো পরিকল্পনা করছেন। ওই সূত্রের মতে, ইউক্রেনে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চাপে রাশিয়া এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ও ন্যাটোর প্রতিরোধ সক্ষমতা পরীক্ষা করতে চাইতে পারেন। বিশেষ করে ন্যাটোর ছোট সদস্য দেশ এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়াকে লক্ষ্য করে সীমিত পরিসরে উত্তেজনা সৃষ্টি করে পরিস্থিতির মোড় ঘোরানোর চেষ্টা হতে পারে।

লাটভিয়ার গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, রাশিয়ার পক্ষে এখনই দ্বিতীয় কোনো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধফ্রন্ট খোলা সম্ভব নয়। তবে তারা ‘হাইব্রিড হামলা’ বিবেচনা করতে পারে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন ব্যবহার কিংবা এমন অন্যান্য পদক্ষেপ থাকতে পারে, যার মূল উদ্দেশ্য হবে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া। সেই বার্তা হতে পারে—ইউক্রেনকে সমর্থন বন্ধ করুন, অন্যথায় নিজেদের ভূখণ্ডেও চাপের মুখে পড়তে হবে।

যদিও সতর্কবার্তাগুলোর মধ্যে মিল রয়েছে, তবু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ও যুক্তরাজ্যের এমআই ৬ যেভাবে প্রকাশ্যে বিস্তারিত সতর্কবার্তা দিয়েছিল, এবার সে ধরনের তথ্য সামনে আসেনি। তবে এই সতর্কতা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অগ্রগতি থমকে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধক্ষেত্রে অচলাবস্থা কাটাতে কিংবা নিজেদের পক্ষে নতুন সুবিধা তৈরি করতে ক্রেমলিন বিকল্প কৌশল নিতে পারে কি না।

ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের রাশিয়া বিশেষজ্ঞ কিয়ার গাইলস বলেন, মস্কো বর্তমান পরিস্থিতির গতিপথ ভেঙে দেওয়ার উপায় খুঁজবে। সেটি সংঘাতকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে অথবা ভিন্ন কোথাও নতুন উত্তেজনা তৈরির মাধ্যমে হতে পারে। তাঁর ভাষায়, রাশিয়া নীরবে পরাজয় মেনে নেবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

এদিকে, রাশিয়ার সীমাবদ্ধতার আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বেলারুশে। ইউক্রেন হামলার হুমকি দেওয়ার পর দেশটিতে স্থাপিত ড্রোন রিলে স্টেশনগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গত শুক্রবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বেলারুশকে এক সপ্তাহ সময় দিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, এসব সরঞ্জাম রাশিয়ার হামলায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এক টেলিগ্রাম চ্যানেলের তথ্য অনুযায়ী, বেলারুশের ব্রেস্ট ও গোমেল অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ মোবাইল অপারেটরদের রিপিটার অপসারণের নির্দেশ দেয়। আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, এগুলো গ্রাউস পাখির বাসা তৈরির পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল।

এ মাসে তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটোর বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে জোটটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বুধবার ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় মিত্ররা নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে বিমান হামলা চালাতে না দেওয়ায় তিনি হতাশ হয়েছেন।

ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের নাশকতা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড ও জার্মানিতে ডিএইচএলের পার্সেলের ভেতরে অগ্নিবোমা স্থাপনের ঘটনা। গত সেপ্টেম্বর মাসে ১৯টি রুশ ছদ্মবেশী ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। এরপর ন্যাটো যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা চালায় এবং পোল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের তিনটি প্রদেশের বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিতে বলা হয়।

অন্যদিকে ইউক্রেন ধীরে ধীরে নিজস্ব দীর্ঘ-পাল্লার হামলা সক্ষমতা তৈরি করেছে, যা রাশিয়ার অভ্যন্তরে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। গত সপ্তাহে প্রায় ২০০টি ড্রোন মস্কোর বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানে। একটি তেল শোধনাগারে হামলার পর রাজধানীর কিছু এলাকায় কালো তেল ঝরে পড়ার ঘটনাও ঘটে।

এক পশ্চিমা সামরিক সূত্র বলেন, যুদ্ধ যখন মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের আকাশসীমার কাছাকাছি বাস্তব চাপ তৈরি করছে, তখন পুতিন যদি নিজেকে চাপে মনে করেন, তাহলে রাশিয়া আরও আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তাঁর ভাষায়, এটি ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এ ধরনের উদ্বেগ এর আগেও দেখা গিয়েছিল। ২০২২ সালের শরতে খারকিভ অঞ্চলে রুশ বাহিনীর ধারাবাহিক বিপর্যয়ের পর পশ্চিমা দেশগুলো আশঙ্কা করেছিল, মস্কো নিজেদের অবস্থান রক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পথেও যেতে পারে। যদিও বাস্তবে সে ধরনের মোতায়েনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং বছরের শেষ দিকে যুদ্ধরেখা স্থিতিশীল হয়ে যায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত