Ajker Patrika

রামমন্দিরের দানবাক্সে চুরি: অভিযোগের তির বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দিকে, গ্রেপ্তার ৮

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ১৪: ০৭
রামমন্দিরের দানবাক্সে চুরি: অভিযোগের তির বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দিকে, গ্রেপ্তার ৮
রাম মন্দিরের দানবাক্সের বিপুল টাকা চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদানের প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাত কোটি রুপি আত্মসাতের অভিযোগে আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রামমন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের সাবেক গাড়িচালকও রয়েছেন।

চলতি মাসের শুরুতে এই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রথম সামনে আসার পর উত্তর প্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক এটিকে ‘মিথ্যা প্রচার’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে ঘটনার নাটকীয় মোড় নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ এই আট অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।

এদিকে, বিরোধী দলগুলো এই গ্রেপ্তারকে একটি ‘আইওয়াশ’ বা চোখে ধুলা দেওয়ার চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, ট্রাস্টের শীর্ষ কর্তাদের আড়াল করতেই কেবল নিচের দিকের কর্মীদের বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।

৮ জুন উত্তর প্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক এই বিতর্ক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘যারা শ্রী রামমন্দির নিয়ে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে, তারা একটি মিথ্যা গল্প বা ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করছে। রাজ্যের মানুষ এই ধরনের রাজনীতি বোঝে।’

একইভাবে মন্দির পরিচালনাকারী স্বাধীন সংস্থা ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’-এর সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ও কোনো ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করে জানান, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই) এবং ট্রাস্টের প্রতিনিধিরা নিয়মিত অডিট বা হিসাব নিরীক্ষা করেন এবং সেখানে কোনো গরমিল পাওয়া যায়নি।

কিন্তু বিতর্কের তীব্রতা বাড়তে থাকায় ১৩ জুন ট্রাস্টের অনুরোধেই উত্তর প্রদেশ সরকার একটি ‘বিশেষ তদন্ত দল’ (এসআইটি) গঠন করে।

২৩ জুন এসআইটি সরকারের কাছে তাদের প্রাথমিক ও গোপনীয় প্রতিবেদন জমা দেয়। এসআইটি সদস্য বিজয় বিশ্বাস পন্ত সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা সরকারের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবের (স্বরাষ্ট্র) কাছে আমাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এর খুঁটিনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গোপনীয় হওয়ায় এই মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা সম্ভব নয়।’

এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দুই দিনের মাথায় পুলিশ এই আটজনকে গ্রেপ্তার করে। জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত সবাই অযোধ্যাতেই ছিলেন এবং তাঁদের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করার প্রক্রিয়া চলছে।

কে এই ‘তিন্নু যাদব’?

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা সরাসরি মন্দিরে আসা নগদ টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী গণনার কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—

১. রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিন্নু যাদব: এই বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত মুখ। তিনি রামমন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়ের সাবেক ব্যক্তিগত গাড়িচালক এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) ‘কারসেবকপুরম’-এর কর্মী হিসেবে অনুদান গণনার দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, দানবাক্সের মূল চাবিগুলো তিন্নুর কাছেই থাকত এবং ট্রাস্টের শীর্ষ কর্তাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারীভাবে কাজ করতেন। তবে তিন্নু জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘হিংসুটে মানুষের ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেছেন।

২. রামশঙ্কর মিশ্র ওরফে রবি মিশ্র: টাকা গণনার দায়িত্বে থাকা এই প্রবীণ কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি পুরো জালিয়াতির অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী। তিনি তাঁর ছেলে ও জামাতাকেও এই টাকা গণনার কাজে যুক্ত করেছিলেন।

৩. অনুকল্প মিশ্র: রামশঙ্কর মিশ্রের ছেলে এবং রামমন্দির ট্রাস্টের অন্যতম ট্রাস্টি অনিল মিশ্রের নিকটাত্মীয়। তিনিও টাকা গণনার কাজ করতেন।

৪. লবকুশ মিশ্র: রামশঙ্কর মিশ্রের জামাতা। অভিযোগ রয়েছে, চুরি করা অর্থ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ও পাচারের মূল দায়িত্ব ছিল লবকুশের ওপর। প্রাথমিক তদন্তে তাঁর বাড়ি থেকে নগদ অর্থ উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

৫. অবিনাশ শুক্লা: মন্দিরের একজন পরিচারক (অ্যাটেনডেন্ট)। জালিয়াতি চক্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সদস্যের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ইতিমধ্যে পাঁচ লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়েছে।

৬. মনীষ যাদব: তিন্নু যাদবের ভাগনে। চুরির টাকার একটি বড় অংশ তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ।

৭. সুভাষ শ্রীবাস্তব: একজন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। টাকা গণনা করার জন্য নিয়োজিত কর্মীদের তদারকি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

৮. করুণেশ পাণ্ডে: মন্দিরে আসা অনুদানের রসিদ বা স্লিপ জালিয়াতি করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এদিকে পুলিশি পদক্ষেপের পরেও বিতর্ক থামেনি। প্রধান বিরোধী দলগুলোর নেতারা এই এফআইআর এবং গ্রেপ্তারকে একটি লোকদেখানো নাটক বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই তদন্তের মাধ্যমে ট্রাস্টের মূল নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ কর্মকর্তা যেমন সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায় এবং ট্রাস্টি অনিল মিশ্রের ওপর কোনো ধরনের দায় বা জবাবদিহি নির্ধারণ করা হয়নি।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্বোধনের পর থেকেই রামমন্দিরে বিপুল পরিমাণ অনুদান আসছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী:

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আয়: প্রায় ৩২৭ কোটি রুপি।

সরাসরি অনুদান: ১৫৩ কোটি রুপি।

ব্যাংক সুদ বাবদ আয়: ১৭৩ কোটি রুপি।

দৈনিক দর্শনার্থী: ৭০,০০০ থেকে ৮০,০০০ জন (ছুটির দিনে যা ২ থেকে ৩ গুণ বৃদ্ধি পায়)।

অর্থ গণনার জন্য স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াকে (এসবিআই) দায়িত্ব দিয়েছিল ট্রাস্ট। ব্যাংকটি আবার এই কাজের জন্য একটি বেসরকারি সিকিউরিটি এজেন্সিকে নিযুক্ত করে। প্রতিদিন চারটি বড় দানবাক্সের টাকা গণনার জন্য ১৪ জনের একটি দল কাজ করে, যার মধ্যে ১১ জন ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং ৩ জন ট্রাস্টের সদস্য থাকেন।

মন্দিরের ক্যাম্প অফিস ইন চার্জ প্রকাশ গুপ্ত সংবাদ সংস্থা আইএএনএসকে জানিয়েছেন, কাউন্টারে সরাসরি রসিদের মাধ্যমে যে অনুদান নেওয়া হয়, সেখানে কোনো গরমিল পাওয়া যায়নি। মূলত দানবাক্সগুলোতে ভক্তদের সরাসরি ফেলা টাকা গণনার সময়ই এই বিশাল চুরির ঘটনা ঘটেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত